ঘরোয়া ক্রিকেটের আয়েশি বাজেট: পাইপলাইন শুকিয়ে যাচ্ছে কেন? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

ঘরোয়া ক্রিকেটের আয়েশি বাজেট: পাইপলাইন শুকিয়ে যাচ্ছে কেন?

নাবিল কায়সার  avatar   
নাবিল কায়সার
ঘরোয়া ক্রিকেটের আয়েশি বাজেট: পাইপলাইন শুকিয়ে যাচ্ছে কেন?
ঘরোয়া ক্রিকেটের আয়েশি বাজেট: পাইপলাইন শুকিয়ে যাচ্ছে কেন?
ছবি: সংগৃহীত
২০২২-২৩ অর্থবছরে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) বার্ষিক বাজেট ছিল প্রায় ২৬৫ কোটি টাকা, যা প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় অনেক বেশি। এই বিপুল পরিমাণ বাজেটের একট...

ঘরোয়া ক্রিকেটের আয়েশি বাজেট: পাইপলাইন শুকিয়ে যাচ্ছে কেন?

২০২২-২৩ অর্থবছরে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) বার্ষিক বাজেট ছিল প্রায় ২৬৫ কোটি টাকা, যা প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় অনেক বেশি। এই বিপুল পরিমাণ বাজেটের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ব্যয় হয় ঘরোয়া ক্রিকেটের পেছনে, বিশেষ করে ফ্র্যাঞ্চাইজি-ভিত্তিক টুর্নামেন্ট যেমন বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল) এবং ঢাকা প্রিমিয়ার ডিভিশন ক্রিকেট লিগ (ডিপিএল)-এর জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনে। বিপিএলের প্রতিটি আসরে প্লেয়ার্স ড্রাফট, বিদেশি খেলোয়াড়দের মোটা অঙ্কের পারিশ্রমিক, দলগুলোর লজিস্টিকস এবং উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পেছনে যে অর্থ ব্যয় হয়, তা প্রায়শই আলোচনার জন্ম দেয়। অথচ, ঠিক একই সময়ে, দেশের তৃণমূল পর্যায়ের ক্রিকেট অবকাঠামো, একাডেমি এবং বয়সভিত্তিক টুর্নামেন্টগুলোর জন্য বরাদ্দকৃত বাজেট এবং সেগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ সরকারের সার্বিক ক্রীড়া নীতিমালায় যেখানে তৃণমূল থেকে প্রতিভা অন্বেষণ ও পরিচর্যার উপর জোর দেওয়া হয়, সেখানে বিসিবির অর্থায়নের এই ভারসাম্যহীনতা জাতীয় দলের জন্য প্রতিভাবান খেলোয়াড়ের 'পাইপলাইন' শুকিয়ে যাওয়ার মূল কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে কিনা, তা গভীরভাবে বিশ্লেষণের দাবি রাখে।

বিসিবির এই ‘আয়েশি বাজেট’ বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে তহবিল বণ্টনের ধরন। বিপিএল বা ডিপিএল-এর মতো আকর্ষণীয় টুর্নামেন্টগুলো কর্পোরেট স্পন্সরশিপ এবং টেলিভিশন স্বত্ব থেকে মোটা অঙ্কের রাজস্ব আয় করে, যা বিসিবির কোষাগারকে সমৃদ্ধ করে। কিন্তু এই রাজস্বের কত শতাংশ তৃণমূলের উন্নয়নে ব্যয় হচ্ছে, তা স্বচ্ছতার সঙ্গে জনসমক্ষে আসে না। উদাহরণস্বরূপ, যখন বিপিএলের একটি ফ্র্যাঞ্চাইজি বিদেশি তারকাদের পেছনে কোটি কোটি টাকা খরচ করে, তখন জেলা পর্যায়ের কোনো একাডেমি হয়তো সামান্য ক্রিকেট সরঞ্জাম বা প্রশিক্ষকের বেতন বাবদ পর্যাপ্ত তহবিল পায় না। এই বৈষম্য কেবল আর্থিক নয়, মানসিকও। তরুণ ক্রিকেটাররা, যারা জাতীয় দলের স্বপ্ন দেখে, তারা দেখে যে বড় লিগগুলোতে সুযোগ পাওয়া মানেই রাতারাতি আর্থিক সচ্ছলতা। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর জন্য যে দীর্ঘমেয়াদী, কাঠামোগত প্রশিক্ষণের প্রয়োজন, তার জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা গ্রামীণ বা মফস্বল এলাকায় অপ্রতুল। ফলে, অনেক সম্ভাবনাময় প্রতিভা আর্থিক টানাপোড়েন বা সঠিক দিকনির্দেশনার অভাবে মাঝপথেই ঝরে যায়। এই প্রবণতা দেশের ক্রিকেটীয় ভবিষ্যতের জন্য এক অশনি সংকেত।

তহবিল বণ্টনের এই অসামঞ্জস্যের আরেকটি দিক হলো বয়সভিত্তিক ক্রিকেট। অনূর্ধ্ব-১৪, অনূর্ধ্ব-১৬ এবং অনূর্ধ্ব-১৮ টুর্নামেন্টগুলো একটি দেশের ক্রিকেট পাইপলাইনের মেরুদণ্ড। কিন্তু এই টুর্নামেন্টগুলোর মান, নিয়মিত আয়োজন এবং অংশগ্রহণকারী খেলোয়াড়দের সুযোগ-সুবিধা প্রায়শই প্রশ্নবিদ্ধ হয়। পর্যাপ্ত সংখ্যক ম্যাচ খেলার সুযোগ না পাওয়া, মানসম্মত পিচ ও অনুশীলনের অভাব এবং অভিজ্ঞ কোচের স্বল্পতা এই স্তরগুলোতে প্রকট। World Bank এবং ADB-এর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ক্রীড়া অবকাঠামো উন্নয়নে যে বিশেষ ঋণ বা অনুদান প্রকল্পগুলো দিয়ে থাকে, সেগুলোর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশ সরকার ক্রীড়া খাতের উন্নয়নে নানা সময়ে বরাদ্দ দিলেও, সেই অর্থ বিসিবির মাধ্যমে তৃণমূল পর্যন্ত পৌঁছাতে গিয়ে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, দুর্নীতি এবং সঠিক পরিকল্পনা ও তদারকির অভাবে তার কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। ফলস্বরূপ, জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ভিত্তি তৈরি হচ্ছে না, এবং সীমিত সংখ্যক খেলোয়াড় যারা উঠে আসছে, তাদের অধিকাংশই শহরাঞ্চলের একাডেমি বা ব্যক্তিগত পৃষ্ঠপোষকতার ওপর নির্ভরশীল।

খাত ২০২২-২৩ বাজেট (কোটি টাকা) ২০২৩-২৪ বাজেট (কোটি টাকা) পরিবর্তন (%) টীকা
আন্তর্জাতিক ম্যাচ ও দল পরিচালনা ৯২.৫০ ১০৫.০০ +১৩.৫১% জাতীয় দলের ম্যাচ ফি, বেতন, বিদেশ সফর
ঘরোয়া ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ (BPL, DPL) ৭৮.০০ ৮৫.৫০ +৯.৬২% উদ্বোধনী অনুষ্ঠান, প্লেয়ার্স পারিশ্রমিক, লজিস্টিকস
বয়সভিত্তিক ক্রিকেট (অনূর্ধ্ব-১৪, ১৬, ১৮) ১৩.২০ ১৪.৫০ +৯.৮৫% টুর্নামেন্ট আয়োজন, প্রশিক্ষণ
জেলা ও বিভাগীয় ক্রিকেট উন্নয়ন ১১.৩০ ১১.৮০ +৪.৪২% জেলা লিগ, একাডেমি সহায়তা
ক্রিকেট একাডেমি ও প্রশিক্ষণ ৮.০০ ৮.৫০ +৬.২৫% জাতীয় ক্রিকেট একাডেমি, কোচিং স্টাফ
অন্যান্য (প্রশাসনিক, অবকাঠামো) ৬২.০০ ৬৯.০০ +১১.২৯% বিসিবি কার্যালয়, মাঠ রক্ষণাবেক্ষণ
মোট বাজেট ২৬৫.০০ ২৯৪.৩০ +১১.০৬%

উৎস: বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) বার্ষিক প্রতিবেদন ও বাজেট সারসংক্ষেপ (আর্থিক বছর ২০২২-২৩ ও ২০২৩-২৪)

সুপারিশ

  • যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ সরকারের মাধ্যমে একটি স্বাধীন কমিটি গঠন করে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) বার্ষিক বাজেট এবং তহবিল বণ্টনের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। এই কমিটি বিসিবির আর্থিক নিরীক্ষা (Financial Audit) পরিচালনা করবে এবং প্রতি বছর একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করবে, যেখানে তৃণমূল থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত প্রতিটি খাতে ব্যয়ের চিত্র স্পষ্ট থাকবে।
  • বিসিবিকে অবিলম্বে একটি 'পাইপলাইন ডেভেলপমেন্ট ফান্ড' (Pipeline Development Fund) প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যেখানে তাদের মোট বার্ষিক আয়ের কমপক্ষে ২০% অর্থ সরাসরি বয়সভিত্তিক ক্রিকেট, জেলা ও বিভাগীয় লিগ এবং গ্রামীণ একাডেমিগুলোর উন্নয়নে বরাদ্দ করা হবে। এই ফান্ডের অর্থায়নে World Bank বা ADB-এর ক্রীড়া উন্নয়ন সংক্রান্ত প্রকল্পগুলোকেও যুক্ত করার জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে উদ্যোগ নিতে হবে।
  • জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ আইন, ১৯৭৪-এর অধীনে বিসিবির কার্যক্রমকে আরও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের জন্য একটি যুগোপযোগী নীতিমালা প্রণয়ন ও প্রয়োগ করতে হবে, যা নিশ্চিত করবে যে ঘরোয়া ক্রিকেটের মানোন্নয়ন এবং প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের পরিচর্যায় সুষম বিনিয়োগ হচ্ছে। এই নীতিমালায় তৃণমূল থেকে উঠে আসা খেলোয়াড়দের জন্য একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক কেন্দ্রীয় চুক্তি (Central Contract) এবং স্কলারশিপের ব্যবস্থা রাখা বাধ্যতামূলক করতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: নাবিল কায়সার

নাবিল কায়সার 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: বাংলাদেশ ক্রিকেট ও পাইপলাইন ফিন্যান্স। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

نظری یافت نشد


News Card Generator