প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা কারিকুলাম: সৃজনশীলতা বনাম মুখস্থ বিদ্যা - কোনটি আমাদের ভবিষ্যৎ? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা কারিকুলাম: সৃজনশীলতা বনাম মুখস্থ বিদ্যা - কোনটি আমাদের ভবিষ্যৎ?

কাজী মাকসুদুল হক  avatar   
কাজী মাকসুদুল হক
প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা কারিকুলাম: সৃজনশীলতা বনাম মুখস্থ বিদ্যা - কোনটি আমাদের ভবিষ্যৎ?
প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা কারিকুলাম: সৃজনশীলতা বনাম মুখস্থ বিদ্যা - কোনটি আমাদের ভবিষ্যৎ?
ছবি: সংগৃহীত
২০২৩ শিক্ষাবর্ষ থেকে দেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে নতুন শিক্ষাক্রমের আংশিক বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে, যা ২০২৭ সাল নাগাদ সম্পূর্ণরূপে কার্যকর হবে বলে শিক্ষা মন্ত...

২০২৩ শিক্ষাবর্ষ থেকে দেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে নতুন শিক্ষাক্রমের আংশিক বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে, যা ২০২৭ সাল নাগাদ সম্পূর্ণরূপে কার্যকর হবে বলে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ঘোষণা করেছে। এই নতুন শিক্ষাক্রমের মূল লক্ষ্য মুখস্থ বিদ্যা নির্ভরতা কমিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সৃজনশীলতা, বিশ্লেষণাত্মক ক্ষমতা এবং ব্যবহারিক দক্ষতা বৃদ্ধি করা। প্রথাগত পরীক্ষার চাপ কমিয়ে ধারাবাহিক মূল্যায়ন ও অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিখন পদ্ধতিকে প্রাধান্য দিয়ে এই পরিবর্তন দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে এই রূপান্তরের পথ কতটা মসৃণ হবে, তা নিয়ে শিক্ষাবিদ, অভিভাবক এবং নীতি-নির্ধারকদের মধ্যে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।

নতুন শিক্ষাক্রমের দর্শন অনুযায়ী, শিক্ষার্থীদের শুধুমাত্র তথ্য মুখস্থ করার পরিবর্তে সমস্যা সমাধান, সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা এবং বাস্তব জীবনে অর্জিত জ্ঞান প্রয়োগের সুযোগ তৈরি করে দেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে তারা নিজেদের সুপ্ত প্রতিভা বিকশিত করতে পারবে এবং ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করতে পারবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় এই পরিবর্তনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাসী, উদ্যোগী এবং বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সক্ষম করে তুলতে চাইছে। প্রথাগত শ্রেণিকক্ষের বাইরে প্রকল্পভিত্তিক কাজ, দলগত আলোচনা এবং হাতে-কলমে শেখার সুযোগ বৃদ্ধি করা হচ্ছে, যা শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনুসন্ধিৎসু মনন তৈরি করবে। এই পদ্ধতি শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্ম-শিক্ষা এবং আজীবন শেখার আগ্রহ সৃষ্টিতে সহায়ক হবে, যা চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অত্যাবশ্যক।

তবে, এই মহৎ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। শিক্ষকদের নতুন পদ্ধতিতে প্রশিক্ষিত করা, প্রয়োজনীয় শিক্ষাপোকরণ সরবরাহ করা এবং শ্রেণীকক্ষের পরিবেশকে নতুন চাহিদার উপযোগী করে তোলা একটি বড় কাজ। BANBEIS (বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো)-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের বিদ্যালয়গুলোতে এখনও আধুনিক শিক্ষাপোকরণের অভাব রয়েছে এবং অনেক শিক্ষকই নতুন শিক্ষাক্রমের পদ্ধতি ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে পুরোপুরি ওয়াকিবহাল নন। এছাড়া, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণে পর্যাপ্ত সময় ও সম্পদ বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর ও জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের চাহিদা পূরণের জন্য দক্ষতা-ভিত্তিক শিক্ষার উপর জোর দিচ্ছে, যা নতুন কারিকুলামের সাথে একীভূত হতে পারে। কিন্তু এই একীকরণ প্রক্রিয়া এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং এর জন্য সমন্বিত প্রচেষ্টার প্রয়োজন।

এই রূপান্তরের সাফল্য নির্ভর করবে এর সঠিক বাস্তবায়ন এবং ধারাবাহিক মূল্যায়নের ওপর। যদি শিক্ষকরা নতুন পদ্ধতি আত্মস্থ করতে পারেন এবং শিক্ষার্থীরা শ্রেণীকক্ষে সক্রিয় অংশগ্রহণের সুযোগ পায়, তবে সৃজনশীলতা ভিত্তিক শিক্ষা মুখস্থ বিদ্যার সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নির্মাণে সক্ষম হবে। বিশেষ করে, প্রাথমিক স্তরে এই পরিবর্তন শিক্ষার্থীদের ভিত্তি মজবুত করবে এবং মাধ্যমিক স্তরে তাদের উচ্চশিক্ষার জন্য প্রস্তুত করবে, যেখানে UGC (বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন) এর অধীনে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আরও উচ্চতর সৃজনশীল এবং গবেষণা-ভিত্তিক শিক্ষার সুযোগ দেবে। এই প্রক্রিয়ায় অভিভাবকদের সচেতনতা এবং সমর্থনও অপরিহার্য, কারণ তাদের সহযোগিতা ছাড়া বিদ্যালয়-ভিত্তিক পরিবর্তনগুলি সম্পূর্ণরূপে সফল হবে না।

সূচক ২০১৬ ২০২০ ২০২৩ (প্রাক্কলিত/লক্ষ্য)
প্রাথমিক স্তরে শিক্ষক প্রশিক্ষণ (নতুন কারিকুলাম) ৫% ৩০% ৭০%
মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষক প্রশিক্ষণ (নতুন কারিকুলাম) ২% ২০% ৬০%
শিক্ষার্থী-শিক্ষক অনুপাত (প্রাথমিক) ১:৪০ ১:৩৬ ১:৩৩
ডিজিটাল কন্টেন্ট ব্যবহারকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ২৫% ৫০% ৭৫%

উৎস: BANBEIS, শিক্ষা মন্ত্রণালয় (বিভিন্ন বার্ষিক প্রতিবেদন ও পরিকল্পনা থেকে সংগৃহীত আনুমানিক তথ্য)।

সুপারিশ

  • শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (NCTB) কর্তৃক নতুন কারিকুলামের উপর শিক্ষকদের জন্য দেশব্যাপী ধারাবাহিক ও নিবিড় প্রশিক্ষণ কর্মসূচি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা হোক, যেখানে ব্যবহারিক প্রয়োগ এবং মূল্যায়ন পদ্ধতির উপর বিশেষ জোর দেওয়া হবে।
  • কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর এবং জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যক্রমের সাথে সঙ্গতি রেখে শিক্ষার্থীদের জন্য হাতে-কলমে দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য পাঠ্যক্রমের মধ্যে কো-কারিকুলার কার্যক্রম এবং প্রকল্পভিত্তিক শিক্ষণ পদ্ধতি অন্তর্ভুক্ত করার জন্য একটি সমন্বিত রূপরেখা তৈরি করুক।
  • শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC) যৌথভাবে একটি টাস্কফোর্স গঠন করে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের নতুন কারিকুলামের সাথে উচ্চশিক্ষার সমন্বয় সাধনের জন্য নীতি নির্ধারণ করুক, যাতে শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষায় গিয়ে তাদের অর্জিত সৃজনশীল দক্ষতা ও বিশ্লেষণাত্মক ক্ষমতাকে আরও বিকশিত করতে পারে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: কাজী মাকসুদুল হক

কাজী মাকসুদুল হক 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা কারিকুলাম। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator