তিস্তা চুক্তি: অধরা পানিবণ্টন ও দ্বিপাক্ষিক কূটনীতির ভবিষ্যৎ পরিমাপ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

তিস্তা চুক্তি: অধরা পানিবণ্টন ও দ্বিপাক্ষিক কূটনীতির ভবিষ্যৎ পরিমাপ

সায়েম মালিক  avatar   
সায়েম মালিক
তিস্তা চুক্তি: অধরা পানিবণ্টন ও দ্বিপাক্ষিক কূটনীতির ভবিষ্যৎ পরিমাপ
তিস্তা চুক্তি: অধরা পানিবণ্টন ও দ্বিপাক্ষিক কূটনীতির ভবিষ্যৎ পরিমাপ
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ যৌথ নদী কমিশনের (Joint Rivers Commission) বৈঠকে তিস্তা নদীর পানি বণ্টন চুক্তি নিয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট অগ্রগ...

সম্প্রতি, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ যৌথ নদী কমিশনের (Joint Rivers Commission) বৈঠকে তিস্তা নদীর পানি বণ্টন চুক্তি নিয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট অগ্রগতি না হওয়ায় বাংলাদেশের কৃষি ও পরিবেশ খাতে উদ্বেগ পুনরায় বৃদ্ধি পেয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে তিস্তার নিম্ন অববাহিকায় পানির প্রবাহ আশঙ্কাজনক হারে কমে যাওয়ায় রংপুর, নীলফামারী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা জেলার প্রায় ৭ লাখ হেক্টর আবাদি জমি সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যা দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলছে।

তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে প্রায় এক দশক ধরে আলোচনা চললেও, বিশেষত ২০১১ সালের একটি খসড়া চুক্তির পর থেকে, পশ্চিমবঙ্গের আপত্তির কারণে এটি আলোর মুখ দেখেনি। এই দীর্ঘসূত্রিতা বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদনে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) এর তথ্যমতে, তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্পের আওতাধীন প্রায় ১.১১ লাখ হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা প্রদানের কথা থাকলেও, শুষ্ক মৌসুমে পর্যাপ্ত পানি না পাওয়ায় প্রায় ৬০-৭০% জমিতে সেচ দেওয়া সম্ভব হয় না। এর ফলে, বোরো ধান, আলু, ভুট্টা ও গমের মতো প্রধান ফসল উৎপাদনে ব্যাপক ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) এবং বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI) তিস্তা অববাহিকার জন্য খরা-সহনশীল ও স্বল্প-পানিতে উৎপাদনশীল ফসলের জাত উদ্ভাবনে নিরন্তর গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু ব্যাপক সেচের বিকল্প হিসেবে এসব জাতের প্রসার এখনও সীমিত। এই অঞ্চলের কৃষকরা বাধ্য হচ্ছেন গভীর নলকূপের উপর নির্ভরশীল হতে, যা ভূগর্ভস্থ পানির স্তরের উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে এবং কৃষি উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে, ফলে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের জীবিকা হুমকির মুখে পড়ছে।

শুধু কৃষিকাজই নয়, তিস্তার পানি প্রবাহে অস্বাভাবিক হ্রাস পরিবেশগত ভারসাম্যকেও মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত করছে। পরিবেশ মন্ত্রণালয় কর্তৃক পরিচালিত বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে যে, শুষ্ক মৌসুমে তিস্তার মূল চ্যানেলে পানির পরিমাণ কমে যাওয়ায় নদীর বাস্তুতন্ত্রে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। মিঠাপানির মাছের প্রজনন ও বিচরণ ক্ষেত্রগুলো সংকুচিত হচ্ছে, অনেক প্রজাতির স্থানীয় মাছ বিলুপ্তির পথে। নদীর চর জেগে উঠছে, যা মরুকরণের লক্ষণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই পরিবর্তনগুলি শুধুমাত্র নদীকেন্দ্রিক জীববৈচিত্র্যকেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে না, বরং নদীর উপর নির্ভরশীল স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রাকেও প্রভাবিত করছে, যারা মাছ ধরা, নৌ-পরিবহন এবং নদীর অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদের উপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC) এই অঞ্চলের সামগ্রিক কৃষি-পরিবেশগত ঝুঁকি মূল্যায়নে কাজ করছে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় সমন্বিত কৌশল প্রণয়নের উপর জোর দিচ্ছে, যেখানে আন্তঃসীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনার বিষয়টি অপরিহার্য।

বছর তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্পের সেচ আওতায় মোট জমি (হেক্টর) শুষ্ক মৌসুমে সেচকৃত জমি (হেক্টর) সেচ সুবিধার অভাবে ক্ষতিগ্রস্ত জমির শতাংশ বোরো ধানের সম্ভাব্য উৎপাদন হ্রাস (টন)
২০২০-২১ ১,১১,৪০০ ৪৫,০০০ ৫৯.৬% ১,৩৫,০০০
২০২১-২২ ১,১১,৪০০ ৪২,৫০০ ৬১.৮% ১,৪০,০০০
২০২২-২৩ ১,১১,৪০০ ৪০,০০০ ৬৪.০% ১,৪৫,০০০

উৎস: কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের (BWDB) আংশিক তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে বিশ্লেষিত।

সুপারিশ

  • ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে বিদ্যমান যৌথ নদী কমিশনের (Joint Rivers Commission) আওতায় একটি স্থায়ী ও কার্যকর 'তিস্তা নদী অববাহিকা ব্যবস্থাপনা কমিটি' গঠন করা হোক। এই কমিটি নির্দিষ্ট সময় অন্তর নদীর পানি প্রবাহের তথ্য বিনিময়, শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিতকরণ এবং উভয় দেশের কৃষি ও পরিবেশগত চাহিদা পূরণে একটি বিজ্ঞানভিত্তিক ও সমতাপূর্ণ বণ্টন মডেল তৈরির জন্য কাজ করবে, যা নদীর জলবিজ্ঞান (hydrology) এবং বাস্তুতন্ত্রের উপর ভিত্তি করে একটি নির্দিষ্ট প্রটোকল অনুসরণ করবে।
  • কৃষি মন্ত্রণালয় এবং পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় যৌথভাবে তিস্তা অববাহিকায় ভূগর্ভস্থ পানির উপর চাপ কমাতে একটি সমন্বিত 'বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও উপরিভাগস্থ জলাধার উন্নয়ন প্রকল্প' হাতে নিক। এই প্রকল্পের মাধ্যমে DAE, BARI এবং BRRI-এর সহযোগিতায় স্থানীয় কৃষকদের জন্য বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের কৌশল, স্বল্প-সেচ পদ্ধতির ব্যবহার (যেমন ড্রিপ ইরিগেশন) এবং খরা-সহনশীল ফসলের জাতের ব্যাপক প্রচলন নিশ্চিত করা হবে। এর জন্য 'জাতীয় পানি নীতি ১৯৯৯' এর ধারা ৩.৬ (কৃষিতে পানির ব্যবহার) এবং ধারা ৩.৯ (ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবস্থাপনা) এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন অপরিহার্য।
  • পরিবেশ মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট গবেষণা প্রতিষ্ঠান, যেমন BARC, তিস্তা নদীর ইকোসিস্টেমের উপর পানি স্বল্পতার দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব নিরূপণে একটি বিস্তারিত 'পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা (Environmental Impact Assessment – EIA)' পরিচালনা করুক। এই সমীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে নদী পুনরুদ্ধার (river restoration) এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা হোক, যা নদীর স্বাস্থ্য এবং পরিবেশগত স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়তা করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: সায়েম মালিক

সায়েম মালিক 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: পানি সম্পদ ও আন্তর্জাতিক নদী ব্যবস্থাপনা। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

コメントがありません


News Card Generator