স্থায়ীত্ব ও শৈলী: বাংলাদেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের হাত ধরে টেকসই ফ্যাশনের নতুন দিগন্ত | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

স্থায়ীত্ব ও শৈলী: বাংলাদেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের হাত ধরে টেকসই ফ্যাশনের নতুন দিগন্ত

নাবিলা পারভীন  avatar   
নাবিলা পারভীন
স্থায়ীত্ব ও শৈলী: বাংলাদেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের হাত ধরে টেকসই ফ্যাশনের নতুন দিগন্ত
স্থায়ীত্ব ও শৈলী: বাংলাদেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের হাত ধরে টেকসই ফ্যাশনের নতুন দিগন্ত
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে ০.৬৩% সামান্য বৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে, যা বিশ্ব অর্থনীতির মন্দা এবং ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা...

সম্প্রতি, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে ০.৬৩% সামান্য বৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে, যা বিশ্ব অর্থনীতির মন্দা এবং ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার মাঝেও একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত বহন করে। তবে, এই পরিসংখ্যানের গভীরে রয়েছে একটি নতুন প্রবণতা, যা দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (SME) হাত ধরে টেকসই ফ্যাশনের দিকে ধাবিত হচ্ছে। বিশেষত, ইকো-ফ্যাশন এবং স্লো-ফ্যাশন আন্দোলনের উত্থান স্থানীয় বাজারে এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের মধ্যে নতুন চাহিদা তৈরি করছে। এর ফলে, ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্প, প্রাকৃতিক তন্তু ও পুনর্ব্যবহৃত উপকরণ ব্যবহার করে পোশাক উৎপাদনে এক নতুন মাত্রা যোগ হচ্ছে, যা কেবল পরিবেশবান্ধব নয়, বরং শৈল্পিক মূল্যবোধেও সমৃদ্ধ। এই পরিবর্তনের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে দেশের অসংখ্য SME, যারা দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্ব ফ্যাশন বাজারে নিজেদের স্বতন্ত্রতা প্রতিষ্ঠায় ব্রতী।

বাংলাদেশের পোশাক শিল্প মূলত বৃহৎ রপ্তানিমুখী কারখানাগুলোর ওপর নির্ভরশীল হলেও, টেকসই ফ্যাশনের এই নতুন দিগন্ত উন্মোচনে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। ঐতিহ্যবাহী জামদানি, মসলিন, খাদি, এবং প্রাকৃতিক রং ও নকশার ব্যবহার করে তারা এমন সব পণ্য তৈরি করছেন যা একদিকে যেমন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে ধারণ করছে, তেমনি অন্যদিকে পরিবেশগত প্রভাব কমাতেও সাহায্য করছে। যেমন, রাজশাহীর সিল্ক বা টাঙ্গাইলের তাঁত শিল্পকে আধুনিক ডিজাইনের সাথে মিশিয়ে নতুন আঙ্গিকে উপস্থাপন করা হচ্ছে। এসব উদ্যোগ কেবল স্থানীয় কারিগরদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে না, বরং একটি নৈতিক সাপ্লাই চেইন গড়ে তুলতেও সহায়তা করছে যেখানে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় শ্রমিকদের অধিকার ও ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা হচ্ছে। বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (BGMEA) এবং বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (BKMEA) যদিও মূলত বৃহৎ শিল্পকে প্রতিনিধিত্ব করে, তবে তাদের প্ল্যাটফর্মগুলো এখন SME-দের জন্য টেকসই অনুশীলন এবং আন্তর্জাতিক মান সম্পর্কে সচেতনতা তৈরিতে ভূমিকা রাখছে। এই উদ্যোক্তারা প্রায়শই স্থানীয় কাঁচামাল যেমন পাট, বাঁশ বা অর্গানিক তুলা ব্যবহার করেন, যা পরিবেশের উপর কার্বন ফুটপ্রিন্ট হ্রাস করে এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় অবদান রাখে।

টেকসই ফ্যাশনের ধারণা কেবল পরিবেশগত প্রভাব কমানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি সামাজিক ন্যায়বিচার এবং অর্থনৈতিক সমতাও নিশ্চিত করে। DIFE (কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর) কর্তৃক শ্রম অধিকার এবং কর্মপরিবেশের মান পর্যবেক্ষণ SME-দের মধ্যেও প্রসারিত হচ্ছে, যদিও বৃহৎ শিল্পের তুলনায় তাদের ওপর নজরদারি কিছুটা কম। অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তাদের উৎপাদিত পণ্যে "ফেয়ার ট্রেড" বা "জৈব প্রমাণীকরণ" এর মতো আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেশন অর্জনের চেষ্টা করছেন, যা তাদের পণ্যকে বিশ্ব বাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (EPB) যদিও প্রধানত বৃহৎ রপ্তানিকারকদের সহায়তা করে, তবে তারা এখন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য আন্তর্জাতিক মেলায় অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে, যেখানে তারা তাদের টেকসই পণ্যগুলো প্রদর্শন করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হস্তনির্মিত গহনা বা পোশাকের ক্ষেত্রে, পুনর্ব্যবহৃত উপকরণ বা প্রাকৃতিক রঞ্জক ব্যবহার করে পরিবেশবান্ধব পণ্য তৈরি করা হচ্ছে, যা শহুরে তরুণদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করছে। এই উদ্যোগগুলো কেবল নতুন বাজার তৈরি করছে না, বরং ভোক্তাদের মধ্যে টেকসই জীবনধারা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধিতেও সহায়ক ভূমিকা পালন করছে।

সূচক ২০২১-২২ অর্থবছর ২০২২-২৩ অর্থবছর ২০২৩-২৪ অর্থবছর (জুলাই-ডিসেম্বর) মন্তব্য
মোট পোশাক রপ্তানি (বিলিয়ন মার্কিন ডলার) ৪৫.৭০ ৪৭.০০ ২৫.৪৬ ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক চাহিদা এবং প্রতিযোগিতামূলক বাজার
টেকসই পোশাক রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি (%) +১২.৫% (আনুমানিক) +১৫.০% (আনুমানিক) +১০.০% (আনুমানিক) SME-দের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি
জৈব/পুনর্ব্যবহারযোগ্য কাঁচামাল ব্যবহারকারী SME-এর সংখ্যা (আনুমানিক) ২,৫০০ ৩,২০০ ৩,৮০০ পরিবেশবান্ধব উৎপাদনের দিকে ঝোঁক
কর্মসংস্থান সৃষ্টি (SME ফ্যাশন খাতে, আনুমানিক) ১,৫০,০০০ ১,৮০,০০০ ২,০০,০০০ গ্রামাঞ্চলে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি

উৎস: BGMEA, EPB এবং স্থানীয় শিল্প সমীক্ষা (আনুমানিক তথ্য)

সুপারিশ

  • শিল্প মন্ত্রণালয় এবং SME ফাউন্ডেশনের যৌথ উদ্যোগে একটি বিশেষ 'টেকসই ফ্যাশন তহবিল' গঠন করা উচিত, যা ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি এবং উপকরণ ক্রয়ে সুদমুক্ত ঋণ বা ভর্তুকি প্রদান করবে। এই তহবিল থেকে DIFE-এর মানদণ্ড অনুযায়ী কর্মপরিবেশ উন্নত করার জন্যও অনুদান দেওয়া যেতে পারে।
  • রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (EPB) এবং BGMEA-কে সম্মিলিতভাবে একটি 'টেকসই ফ্যাশন রপ্তানি উন্নয়ন সেল' প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যার মাধ্যমে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের আন্তর্জাতিক বাজার গবেষণা, সার্টিফিকেশন প্রক্রিয়া (যেমন GOTS, Oeko-Tex), এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় অংশগ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় লজিস্টিক ও আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হবে।
  • জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) এবং BKMEA-এর সহযোগিতায়, টেকসই ফ্যাশন ডিজাইন, প্রাকৃতিক রঞ্জনবিদ্যা এবং পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণ প্রক্রিয়াকরণের উপর বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ কর্মসূচির সূচনা করা উচিত, যা দেশের ফ্যাশন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বাধ্যতামূলক কোর্স হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হবে এবং SME-দের জন্য কারিগরদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: নাবিলা পারভীন

নাবিলা পারভীন 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: ফ্যাশন, লাইফস্টাইল ও টেকসই পোশাক। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Geen reacties gevonden


News Card Generator