প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: উৎপাদনকারীর দায়বদ্ধতা নাকি ভোক্তার অসচেতনতা? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: উৎপাদনকারীর দায়বদ্ধতা নাকি ভোক্তার অসচেতনতা?

তৌহিদুর রহমান  avatar   
তৌহিদুর রহমান
প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: উৎপাদনকারীর দায়বদ্ধতা নাকি ভোক্তার অসচেতনতা?
প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: উৎপাদনকারীর দায়বদ্ধতা নাকি ভোক্তার অসচেতনতা?
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রতি বছর মাথাপিছু প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপাদন ২০০৫ সালের ৩...

সম্প্রতি, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রতি বছর মাথাপিছু প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপাদন ২০০৫ সালের ৩ কেজি থেকে বেড়ে ২০২০ সালে ৯ কেজিতে দাঁড়িয়েছে, যা বিশ্বব্যাংকের ২০১৯ সালের একটি প্রতিবেদনকেও ছাড়িয়ে গেছে। এই উদ্বেগজনক বৃদ্ধি দেশের প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বল চিত্র তুলে ধরেছে এবং এটি উৎপাদনকারী শিল্প ও ভোক্তাদের দায়িত্ব নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিশেষত, রাজধানী ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ প্রধান শহরগুলিতে প্লাস্টিক বর্জ্যের প্রায় ৮৫%ই অপরিশোধিত অবস্থায় পরিবেশে মিশে যাচ্ছে, যা নদী, মাটি ও সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার এই সংকটময় পরিস্থিতিতে উৎপাদনকারীর দায়বদ্ধতা (Extended Producer Responsibility - EPR) একটি বহুল আলোচিত সমাধান হিসেবে উঠে এসেছে। যদিও বাংলাদেশ সরকার ২০১৮ সালের প্লাস্টিক পণ্য (মোড়কজাতকরণ) বিধিমালা এবং ২০১৯ সালের পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা (সংশোধন) এর মাধ্যমে প্লাস্টিক বর্জ্য কমানোর কিছু উদ্যোগ নিয়েছে, তবে EPR নীতি এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। শিল্প মালিকরা প্রায়শই যুক্তি দেন যে, পণ্য ব্যবহারের পর তার বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব মূলত ভোক্তার। কিন্তু বিশ্বব্যাপী, বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং প্রতিবেশী ভারতের মতো দেশগুলিতে, EPR নীতি প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় একটি কার্যকর মডেল হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। এই নীতি অনুযায়ী, পণ্য উৎপাদনকারীকে তাদের পণ্যের সম্পূর্ণ জীবনচক্রের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য আর্থিক বা ভৌতভাবে দায়বদ্ধ করা হয়। উদাহরণস্বরূপ, ভারতে ২০২৪ সালের মধ্যে উৎপাদিত প্লাস্টিকের অন্তত ৫০% রিসাইক্লিং নিশ্চিত করার জন্য উৎপাদনকারীদের উপর কঠোর লক্ষ্যমাত্রা আরোপ করা হয়েছে, যা কেন্দ্রীয় দূষণ নিয়ন্ত্রণ বোর্ড (CPCB) দ্বারা তত্ত্বাবধান করা হয়। বাংলাদেশের প্লাস্টিক ও প্যাকেজিং শিল্পে, যেখানে প্রায় ৩০০০-এর বেশি প্রতিষ্ঠান বছরে প্রায় ১০ লক্ষ টন প্লাস্টিক পণ্য উৎপাদন করে, EPR বাস্তবায়ন একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ হলেও এটি পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় অপরিহার্য। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (ADB) তাদের বিভিন্ন প্রতিবেদনে উন্নয়নশীল দেশগুলিতে EPR বাস্তবায়নের জন্য নীতি সহায়তা এবং আর্থিক প্রণোদনার উপর জোর দিয়েছে, যা বাংলাদেশের জন্য একটি অনুসরণীয় মডেল হতে পারে।

অন্যদিকে, প্লাস্টিক বর্জ্য বৃদ্ধির পেছনে ভোক্তার অসচেতনতাও একটি বড় কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের শহরাঞ্চলে গড়ে প্রতি পরিবারে প্রতিদিন প্রায় ৫০০ গ্রামের বেশি প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপন্ন হয়, যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক (Single-Use Plastic - SUP)। এই SUP-এর ব্যবহার কমানো এবং প্লাস্টিক বর্জ্যকে সঠিকভাবে আলাদা করে ফেলার অভ্যাস গড়ে তোলা অপরিহার্য। পরিবেশ অধিদপ্তর এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (LGED) বিভিন্ন সময়ে জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি পরিচালনা করলেও, তার প্রভাব শহর ছাড়িয়ে গ্রাম পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি। World Bank-এর এক সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, কার্যকর বর্জ্য পৃথকীকরণ ও পুনর্ব্যবহার ব্যবস্থার অভাবে অনেক ভোক্তার মধ্যেও প্লাস্টিক বর্জ্য যত্রতত্র ফেলার প্রবণতা দেখা যায়। এছাড়া, বাজারে সহজলভ্যতা এবং দামের দিক থেকে সাশ্রয়ী হওয়ায় প্লাস্টিকের ব্যবহার বাড়ছে, বিকল্প পণ্যের উচ্চমূল্য অনেক সময় ভোক্তাদের নিরুৎসাহিত করে। এই প্রেক্ষাপটে, বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক ২০২১ সালে গৃহীত 'প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নীতিমালা'তে জনসচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি প্লাস্টিক বিকল্প পণ্যের উৎপাদন ও সহজলভ্যতার উপর জোর দেওয়া হয়েছে, যা বাস্তবায়নে আরও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। ভোক্তা পর্যায়ে প্লাস্টিক দূষণের ভয়াবহতা সম্পর্কে সঠিক তথ্য পৌঁছে দেওয়া এবং পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক পণ্যের প্রতি তাদের আকৃষ্ট করা ছাড়া এই সমস্যা থেকে উত্তরণ কঠিন।

সূচক ২০০৫ ২০১০ ২০১৫ ২০২০
মাথাপিছু প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপাদন (কেজি/বছর) ৩ ৫ ৭ ৯
প্লাস্টিক বর্জ্য পুনর্ব্যবহার হার (%) ১০% ১৫% ১৮% ২০%
একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার বৃদ্ধি (%) - +১০% +১৫% +২০%

উৎস: বিশ্বব্যাংক (২০১৯), পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় (২০২২)

সুপারিশ

  • পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়কে অবিলম্বে 'প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নীতিমালা ২০২১'-এর আওতায় Extended Producer Responsibility (EPR) বাস্তবায়নের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট আইনি কাঠামো তৈরি করতে হবে, যেখানে প্রতিটি প্লাস্টিক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে তাদের পণ্যের বর্জ্য সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা ও সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হবে।
  • স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের অধীনে সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভাগুলোকে প্লাস্টিক বর্জ্য পৃথকীকরণের জন্য কার্যকর অবকাঠামো (যেমন: দ্বৈত বর্জ্য বিন) স্থাপন এবং নিয়মিত সংগ্রহ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে, পাশাপাশি প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহারকারী শিল্পগুলোকে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন (BSCIC) এর মাধ্যমে প্রণোদনা ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করতে হবে।
  • বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক গণমাধ্যম ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ব্যবহার করে প্লাস্টিক দূষণের ক্ষতিকর প্রভাব এবং সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব সম্পর্কে ব্যাপক জনসচেতনতামূলক প্রচারাভিযান চালাতে হবে, যেখানে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের বিকল্প পণ্যের ব্যবহার উৎসাহিত করা হবে এবং প্লাস্টিক পণ্য (মোড়কজাতকরণ) বিধিমালা ২০১৮-এর লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: তৌহিদুর রহমান

তৌহিদুর রহমান 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: প্লাস্টিক ও প্যাকেজিং ইন্ডাস্ট্রি। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

没有找到评论


News Card Generator