ভারত-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা: বঙ্গোপসাগরের তলদেশে লুকানো ভূ-রাজনৈতিক চাল | আই নিউজ বিডি

ভারত-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা: বঙ্গোপসাগরের তলদেশে লুকানো ভূ-রাজনৈতিক চাল

শাহেদ করিম  avatar   
শাহেদ করিম
ভারত-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা: বঙ্গোপসাগরের তলদেশে লুকানো ভূ-রাজনৈতিক চাল
ভারত-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা: বঙ্গোপসাগরের তলদেশে লুকানো ভূ-রাজনৈতিক চাল
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত গুরুত্ব এবং এই অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক ও অর্থনৈতিক উপস্থিতির ওপর গভীর উদ্বেগ প...

সম্প্রতি, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত গুরুত্ব এবং এই অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক ও অর্থনৈতিক উপস্থিতির ওপর গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বিশেষ করে, চীনের 'বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ' (BRI) এর অংশ হিসেবে মিয়ানমারের কিয়াউকফিউ বন্দর উন্নয়ন প্রকল্প এবং শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা বন্দরের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণের ঘটনাগুলো নয়াদিল্লির ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এই প্রকল্পগুলো বঙ্গোপসাগরের উপকূলীয় রাষ্ট্রগুলোর ওপর চীনের প্রভাব বিস্তারের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়, যা ভারতীয় স্বার্থের জন্য এক নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। একই সময়ে, থাইল্যান্ডের ক্রা ক্যানাল প্রকল্পের জন্য চীনের সম্ভাব্য বিনিয়োগের খবরও এই অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদী ক্ষমতার ভারসাম্যের বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছে, যদিও এটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এই ধরনের উদ্যোগগুলো কেবল বাণিজ্যিক নয়, বরং সামরিক ও কৌশলগত দিক থেকেও বঙ্গোপসাগরকে ভারত-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতার এক নতুন কেন্দ্রে পরিণত করছে।

বঙ্গোপসাগর, যা 'সাগরীয় সিল্ক রুট'-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, কেবল বাণিজ্যিক পথ হিসেবে নয়, বরং সামরিক কৌশলগত দিক থেকেও ভারত ও চীনের জন্য অপরিহার্য। চীনের 'স্ট্রিং অফ পার্লস' কৌশল, যার মধ্যে রয়েছে পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ এবং মিয়ানমারের বন্দরগুলো, ভারতের চারপাশে একটি সামুদ্রিক বলয় তৈরি করার ইঙ্গিত দেয়। ভারতের 'মালাবার' নৌ-মহড়া, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জাপান এবং অস্ট্রেলিয়াকে অন্তর্ভুক্ত করে, চীনের এই কৌশলকে প্রতিহত করার একটি প্রচেষ্টা। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৯ সালে, ভারতীয় নৌবাহিনী আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের কাছে তাদের সামরিক উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে, যা বঙ্গোপসাগরে চীনা সাবমেরিনের গতিবিধি পর্যবেক্ষণের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি নেভি (PLAN) নিয়মিতভাবে বঙ্গোপসাগরে তাদের সাবমেরিন মোতায়েন করে, যা ভারতের জন্য সরাসরি নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করে। অপরদিকে, ভারত তার সাগরমালা প্রকল্প এবং আন্দামান ও নিকোবর কমান্ডকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে এই অঞ্চলে তার প্রভাব অক্ষুণ্ণ রাখার চেষ্টা করছে। BIMSTEC (Bay of Bengal Initiative for Multi-Sectoral Technical and Economic Cooperation) এর মাধ্যমে আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার করা ভারতের অন্যতম লক্ষ্য। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৮ সালে BIMSTEC দেশগুলোর মধ্যে প্রথম যৌথ সামরিক মহড়া (MILEX-18) অনুষ্ঠিত হয়, যা এই অঞ্চলের নিরাপত্তা কাঠামোকে শক্তিশালী করার একটি পদক্ষেপ ছিল। তবে, এই উদ্যোগগুলো চীনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও সামরিক সক্ষমতার বিপরীতে কতটা কার্যকর হবে তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।

চীনের 'ঋণ ফাঁদ কূটনীতি' (Debt-Trap Diplomacy) বঙ্গোপসাগরীয় দেশগুলোতে গভীর প্রভাব ফেলছে। শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা বন্দরের ক্ষেত্রে যা ঘটেছে, তা অন্যান্য দেশগুলোর জন্য একটি সতর্কবার্তা। হাম্বানটোটা বন্দর নির্মাণে চীনের এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছিল শ্রীলঙ্কা, যা পরিশোধ করতে না পারায় ৯৯ বছরের জন্য বন্দরটি চীনের কাছে ইজারা দিতে বাধ্য হয়। এই ঘটনা আঞ্চলিক দেশগুলোর সার্বভৌমত্বের ওপর চীনের প্রভাবের এক স্পষ্ট উদাহরণ। মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মতো দেশগুলোও চীনের BRI প্রকল্পের আওতায় বন্দর ও অবকাঠামো উন্নয়নে বিপুল পরিমাণ চীনা ঋণ গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশের কক্সবাজারের সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্পটি প্রথমে চীনের অর্থায়নে হওয়ার কথা থাকলেও, ভূ-রাজনৈতিক সংবেদনশীলতার কারণে পরে তা বাতিল করা হয়। বর্তমানে, মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্পে জাপান ও ভারতের বিনিয়োগ দেখা যাচ্ছে, যা চীনের বিকল্প হিসেবে আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদারের ইঙ্গিত দেয়। UN Peacekeeping মিশনে দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর অংশগ্রহণ, বিশেষ করে বাংলাদেশ ও নেপালের, এই অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তাদের আন্তর্জাতিক গুরুত্ব প্রমাণ করে। যদিও UN Peacekeeping সরাসরি ভারত-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতার অংশ নয়, তবে এই দেশগুলোর আন্তর্জাতিক মঞ্চে উত্থান এবং তাদের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নের সক্ষমতা আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্যকে প্রভাবিত করে। সার্ক (SAARC) এর নিষ্ক্রিয়তা এই অঞ্চলে চীনের প্রভাব বিস্তারের একটি কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়, কারণ সার্কের দুর্বলতা আঞ্চলিক দেশগুলোকে চীনের দিকে ঝুঁকে পড়তে উৎসাহিত করেছে। ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একাধিকবার সার্ককে পুনরুজ্জীবিত করার ওপর জোর দিয়েছে, কিন্তু পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের চলমান উত্তেজনার কারণে এটি প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়েছে।

প্রতিষ্ঠানের নাম ভূমিকা/সিদ্ধান্ত তারিখ/সাল প্রভাব/ফলাফল (সংক্ষেপে)
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বঙ্গোপসাগরে চীনের সামরিক উপস্থিতির ওপর উদ্বেগ প্রকাশ ২০২৩ ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা বৃদ্ধি, আঞ্চলিক দেশগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি
BIMSTEC প্রথম যৌথ সামরিক মহড়া (MILEX-18) আয়োজন ২০১৮ আঞ্চলিক নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার, চীনের প্রভাব মোকাবেলার প্রচেষ্টা
UN Peacekeeping (বাংলাদেশ) বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় সৈন্য সরবরাহকারী দেশ ২০২২ (তথ্য অনুযায়ী) বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি বৃদ্ধি, স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতিতে সহায়ক
সার্ক ১৯তম সার্ক শীর্ষ সম্মেলন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ২০১৬ আঞ্চলিক সহযোগিতা স্থবির, চীনের প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি
শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা বন্দর ৯৯ বছরের জন্য চীনের কাছে ইজারা ২০১৭ চীনের 'ঋণ ফাঁদ কূটনীতি'র উদাহরণ, আঞ্চলিক সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন

উৎস: বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি, UN Peacekeeping ডেটা এবং একাডেমিক জার্নাল।

সুপারিশ

  • ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অবশ্যই বঙ্গোপসাগরীয় দেশগুলোর সাথে কৌশলগত সংলাপ ও যৌথ সামরিক মহড়া আরও বাড়াতে হবে, বিশেষ করে ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া এবং ফিলিপাইনের মতো দেশগুলোর সঙ্গে 'অ্যাক্ট ইস্ট' নীতিকে কার্যকরভাবে প্রয়োগ করে একটি শক্তিশালী সামুদ্রিক নিরাপত্তা কাঠামো তৈরি করতে হবে, যা চীনের 'স্ট্রিং অফ পার্লস' কৌশলকে প্রতিহত করতে সক্ষম হবে।
  • BIMSTEC-এর কার্যকারিতা বাড়াতে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে নিয়মিত উচ্চ-পর্যায়ের নিরাপত্তা বৈঠক আয়োজন এবং একটি সমন্বিত আঞ্চলিক দুর্যোগ প্রতিক্রিয়া বাহিনী (Regional Disaster Response Force) গঠনের জন্য তহবিল ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করতে হবে, যাতে আঞ্চলিক দেশগুলো চীনের অবকাঠামো উন্নয়ন প্রস্তাবের উপর এককভাবে নির্ভরশীল না হয়।
  • জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রম (UN Peacekeeping Operations) এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক মঞ্চে আঞ্চলিক দেশগুলোর, বিশেষ করে বাংলাদেশ ও নেপালের, শক্তিশালী ভূমিকা বজায় রাখতে তাদের সামরিক প্রশিক্ষণ ও সরঞ্জাম আপগ্রেডে সহায়তা প্রদান করতে হবে, এবং আঞ্চলিক কূটনীতিতে সার্ক-এর মতো নিষ্ক্রিয় ফোরামের বিকল্প হিসেবে BIMSTEC-কে আরও কার্যকর প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করার জন্য সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা উপস্থাপন করতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: শাহেদ করিম

শাহেদ করিম 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতি। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Walang nakitang komento


News Card Generator