জিনোমিক্স ও উন্নত চিকিৎসা প্রযুক্তি: বিরল রোগ নির্ণয়ে বাংলাদেশের সক্ষমতা ও আগামীর চ্যালেঞ্জ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

জিনোমিক্স ও উন্নত চিকিৎসা প্রযুক্তি: বিরল রোগ নির্ণয়ে বাংলাদেশের সক্ষমতা ও আগামীর চ্যালেঞ্জ

ড. আদনান সামি  avatar   
ড. আদনান সামি
জিনোমিক্স ও উন্নত চিকিৎসা প্রযুক্তি: বিরল রোগ নির্ণয়ে বাংলাদেশের সক্ষমতা ও আগামীর চ্যালেঞ্জ
জিনোমিক্স ও উন্নত চিকিৎসা প্রযুক্তি: বিরল রোগ নির্ণয়ে বাংলাদেশের সক্ষমতা ও আগামীর চ্যালেঞ্জ
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) কর্তৃক বিরল রোগ নির্ণয়ে জিনোমিক্স প্রযুক্তির ব্যবহার প্রসারে একটি পাইলট প্রকল্প অনুমোদনের ঘোষণা, বাংল...

সম্প্রতি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) কর্তৃক বিরল রোগ নির্ণয়ে জিনোমিক্স প্রযুক্তির ব্যবহার প্রসারে একটি পাইলট প্রকল্প অনুমোদনের ঘোষণা, বাংলাদেশের চিকিৎসা প্রযুক্তির ইতিহাসে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। এই প্রকল্প, যা প্রাথমিকভাবে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (BSMMU) নির্বাচিত কিছু বিভাগে বাস্তবায়িত হবে, বিরল জিনগত রোগ শনাক্তকরণে দেশীয় সক্ষমতা বাড়ানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এই উদ্যোগটি কেবল দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার আধুনিকীকরণই নয়, বরং দীর্ঘকাল ধরে অবহেলিত বিরল রোগের রোগীদের জন্য আশার আলো বয়ে আনবে।

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে, যেখানে সংক্রামক রোগ এবং অসংক্রামক ব্যাধিগুলির প্রাদুর্ভাব এখনো একটি বড় জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ, সেখানে বিরল রোগ প্রায়শই নির্ণয় ও চিকিৎসায় উপেক্ষিত থাকে। জিনোমিক্স প্রযুক্তি, বিশেষ করে নেক্সট-জেনারেশন সিকোয়েন্সিং (NGS) এবং হোল-এক্সোম সিকোয়েন্সিং (WES), এই রোগগুলির সুনির্দিষ্ট কারণ শনাক্ত করতে অত্যাবশ্যকীয় ভূমিকা পালন করে। বর্তমানে, রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (IEDCR) এবং জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIMH)-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলিতে কিছু সীমিত জিনোমিক গবেষণা ও রোগ শনাক্তকরণের সুবিধা থাকলেও, বিরল রোগের ব্যাপক ও নিয়মিত স্ক্রিনিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও প্রশিক্ষিত জনবলের অভাব প্রকট। ডিরেক্টরেট জেনারেল অফ হেলথ সার্ভিসেস (DGHS) এর অধীনে এই নতুন পাইলট প্রকল্পটি, বিশেষ করে জেনেটিক কাউন্সেলিং এবং ডেটা বিশ্লেষণের মতো জটিল ক্ষেত্রগুলিতে সক্ষমতা বৃদ্ধিতে মনোনিবেশ করবে, যা সঠিক রোগ নির্ণয় ও উপযুক্ত চিকিৎসা পরিকল্পনা প্রণয়নে অপরিহার্য। এটি স্থানীয় গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগের একটি সুস্পষ্ট ইঙ্গিত, যা ভবিষ্যতে দেশীয় জিনোমিক ডেটাবেস তৈরিতে সহায়ক হবে এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার দ্বার উন্মোচন করবে।

তবে, এই অগ্রগতির পথে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। উচ্চমানের জিনোমিক সিকোয়েন্সিং কিট ও রিএজেন্ট আমদানিতে বিদ্যমান আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (DGDA) এর অনুমোদন প্রক্রিয়া প্রায়শই সময়সাপেক্ষ। এছাড়া, জিনোমিক ডেটা বিশ্লেষণ ও ব্যাখ্যার জন্য বায়োইনফরমেটিক্স এবং জেনেটিক কাউন্সেলিংয়ে প্রশিক্ষিত বিশেষজ্ঞের অভাব একটি বড় বাধা। বর্তমানে, দেশের হাতে গোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান যেমন BSMMU এবং কিছু বেসরকারি গবেষণাগার সীমিত পরিসরে জিনোমিক পরীক্ষা পরিচালনা করলেও, এর ব্যয়বহুলতা এবং সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবায় এর অন্তর্ভুক্তি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। জিনোমিক ডেটার গোপনীয়তা এবং নৈতিক ব্যবহার সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়নও জরুরি, কারণ সংবেদনশীল জেনেটিক তথ্য অপব্যবহারের ঝুঁকি সবসময়ই বিদ্যমান। এই চ্যালেঞ্জগুলি মোকাবিলা করতে না পারলে, MOHFW-এর এই মহৎ উদ্যোগের পূর্ণ সুফল অর্জন কঠিন হবে এবং বিরল রোগ নির্ণয়ে বাংলাদেশের সক্ষমতা তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হতে পারে।

সূচক ২০২০ ২০২১ ২০২২ ২০২৩
জিনোমিক সিকোয়েন্সিং ল্যাবের সংখ্যা (সরকারি) ৩ ৪ ৪ ৫
বিরল রোগের জন্য জিনোমিক পরীক্ষা সম্পন্ন রোগীর সংখ্যা ১১০ ১৬৫ ২২০ ৩১০
জিনোমিক্স-এ প্রশিক্ষিত বিশেষজ্ঞের সংখ্যা (বায়োইনফরমেটিক্স সহ) ২৫ ৩২ ৪০ ৫২
জিনোমিক ডেটা সংরক্ষণের ক্ষমতা (টেরাবাইট) ৫ ৭ ১০ ১২

উৎস: DGHS, IEDCR, MOHFW-এর বার্ষিক প্রতিবেদন ও অভ্যন্তরীণ সমীক্ষা।

সুপারিশ

  • MOHFW কর্তৃক 'জাতীয় জিনোমিক্স নীতি' প্রণয়ন ও কার্যকর করা, যেখানে বিরল রোগ নির্ণয়, ডেটা গোপনীয়তা, জেনেটিক কাউন্সেলিং এবং গবেষণা তহবিল সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট নির্দেশিকা অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
  • DGDA-কে জিনোমিক সিকোয়েন্সিং কিট ও রিএজেন্ট আমদানির অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ ও দ্রুততর করার জন্য একটি 'ফাস্ট-ট্র্যাক' ব্যবস্থা চালু করতে হবে এবং স্থানীয়ভাবে এগুলির উৎপাদনকে উৎসাহিত করার জন্য নীতি সহায়তা প্রদান করতে হবে।
  • DGHS এবং NIMH যৌথভাবে একটি 'বিরল রোগ ডেটাবেস ও রেফারেল সেন্টার' প্রতিষ্ঠা করবে, যা দেশের সমস্ত বিরল রোগের ডেটা সংগ্রহ, বিশ্লেষণ এবং রোগীদের বিশেষজ্ঞ পরামর্শ ও উন্নত চিকিৎসার জন্য সঠিক প্রতিষ্ঠানে রেফার করার জন্য একটি কেন্দ্রীয় প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ড. আদনান সামি

ড. আদনান সামি 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: জিনোমিক্স ও উন্নত চিকিৎসা প্রযুক্তি। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Ingen kommentarer fundet


News Card Generator