বাংলাদেশের ক্রীড়া পুষ্টি: বিজ্ঞানসম্মত খাদ্যাভ্যাস বনাম পারফরম্যান্সের প্রতিবন্ধকতা | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

বাংলাদেশের ক্রীড়া পুষ্টি: বিজ্ঞানসম্মত খাদ্যাভ্যাস বনাম পারফরম্যান্সের প্রতিবন্ধকতা

ড. আসিফ রায়হান  avatar   
ড. আসিফ রায়হান
বাংলাদেশের ক্রীড়া পুষ্টি: বিজ্ঞানসম্মত খাদ্যাভ্যাস বনাম পারফরম্যান্সের প্রতিবন্ধকতা
বাংলাদেশের ক্রীড়া পুষ্টি: বিজ্ঞানসম্মত খাদ্যাভ্যাস বনাম পারফরম্যান্সের প্রতিবন্ধকতা
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত 'জাতীয় ক্রীড়া নীতিমালা ২০২২'-এর খসড়ায় ক্রীড়াবিদদের পুষ্টি ও স্বাস্থ্যসেবাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হ...

সম্প্রতি যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত 'জাতীয় ক্রীড়া নীতিমালা ২০২২'-এর খসড়ায় ক্রীড়াবিদদের পুষ্টি ও স্বাস্থ্যসেবাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও, এর বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি এখনো সীমিত। বিশেষ করে, বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (বিকেএসপি) এবং জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি) পরিচালিত প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোতে পুষ্টিবিদদের পদায়ন ও আধুনিক ডায়েটারি প্রোটোকল অনুসরণ একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। যেখানে আন্তর্জাতিক মানের ক্রীড়াবিদ তৈরিতে বিজ্ঞানসম্মত পুষ্টি অপরিহার্য, সেখানে বাংলাদেশের অধিকাংশ উঠতি ও প্রতিষ্ঠিত ক্রীড়াবিদ এখনো প্রথাগত খাদ্যাভ্যাস এবং পর্যাপ্ত পুষ্টি জ্ঞানের অভাবে ভোগেন, যা তাদের পারফরম্যান্সকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। উদাহরণস্বরূপ, গত বছর এশিয়ান গেমসে অংশগ্রহণকারী বেশ কিছু বাংলাদেশি অ্যাথলেটের পারফরম্যান্স বিশ্লেষণে দেখা গেছে, তাদের শারীরিক সক্ষমতার দুর্বলতার একটি বড় কারণ ছিল অপর্যাপ্ত পুষ্টিগত প্রস্তুতি, যা কোচ ও ক্রীড়া বিজ্ঞানীদের রিপোর্টেও উঠে এসেছে।

বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে পুষ্টিবিজ্ঞানের প্রয়োগ এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। বেশিরভাগ ক্রীড়াবিদ, বিশেষত মফস্বল ও গ্রামীণ অঞ্চল থেকে আসা খেলোয়াড়রা, তাদের ব্যক্তিগত পুষ্টি চাহিদা সম্পর্কে অজ্ঞ। প্রথাগতভাবে ভাত-মাছ-মাংস ভিত্তিক খাদ্যাভ্যাসই তাদের দৈনন্দিন রুটিনের অংশ, যেখানে মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টস, কার্বোহাইড্রেট লোডিং, প্রোটিন রিকভারি এবং হাইড্রেশন ম্যানেজমেন্টের মতো অত্যাবশ্যকীয় বিষয়গুলো উপেক্ষিত থাকে। আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে যেখানে প্রতিটি ডিসিপ্লিনের জন্য সুনির্দিষ্ট পুষ্টি পরিকল্পনা থাকে, সেখানে বাংলাদেশে এখনো অধিকাংশ ফেডারেশন ও অ্যাসোসিয়েশনের নিজস্ব পুষ্টিবিদ বা ক্রীড়া বিজ্ঞানী নেই। ফলস্বরূপ, খেলোয়াড়রা প্রায়শই অপুষ্টিজনিত সমস্যায় ভোগে, যা আঘাতের ঝুঁকি বাড়ায়, দ্রুত ক্লান্তি আনে এবং সর্বোচ্চ পারফরম্যান্স প্রদানে বাধা সৃষ্টি করে। এমনকি, জাতীয় দলের অনেক খেলোয়াড়কেও দেখা যায় ব্যক্তিগত উদ্যোগে ডায়েটিশিয়ানের সাহায্য নিতে, যা একটি সুসংগঠিত ক্রীড়া ব্যবস্থার দুর্বলতাকেই প্রকট করে তোলে। বিশ্ব ব্যাংক (World Bank) এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB)-এর যৌথ এক সমীক্ষায় বাংলাদেশের মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রে ক্রীড়া ও শারীরিক শিক্ষার দুর্বলতাকে একটি অন্যতম প্রতিবন্ধক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যেখানে পুষ্টিহীনতা একটি প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

এই সমস্যা কেবল ক্রীড়াবিদদের ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি সামগ্রিকভাবে দেশের ক্রীড়া অর্থনীতির উপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। একজন অসুস্থ বা কম পারফরম্যান্স করা ক্রীড়াবিদ খেলার মাঠে যেমন দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে ব্যর্থ হন, তেমনি তার দীর্ঘমেয়াদী ক্যারিয়ারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর ফলে ক্রীড়া পণ্যের বাজার, স্পন্সরশিপ এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা থেকে অর্জিত অর্থের প্রবাহও সীমিত হয়ে পড়ে। বাংলাদেশ সরকার যদিও ক্রীড়া খাতের উন্নয়নে বাজেট বরাদ্দ বাড়িয়েছে, তবে পুষ্টি ও ক্রীড়া বিজ্ঞানের মতো মৌলিক ক্ষেত্রগুলোতে বিনিয়োগ এখনো যথেষ্ট নয়। উদাহরণস্বরূপ, জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের বার্ষিক বাজেটের একটি ক্ষুদ্র অংশই ক্রীড়া বিজ্ঞান ও পুষ্টি গবেষণায় ব্যয় হয়, যা উন্নত দেশগুলোর তুলনায় নগণ্য। পুষ্টিবিদদের স্বল্পতা এবং ক্রীড়া বিজ্ঞান গবেষণার অভাব নতুন প্রজন্মকে আধুনিক ক্রীড়া পুষ্টি সম্পর্কে জানতে দিচ্ছে না। অনেক সময় স্থানীয় কোচরাও পুষ্টি সম্পর্কে ভুল ধারণা দেন, যা খেলোয়াড়দের স্বাস্থ্যের জন্য আরও ক্ষতিকর হয়ে ওঠে। এই ঘাটতি পূরণে আন্তর্জাতিক সংস্থা, যেমন World Anti-Doping Agency (WADA)-এর পুষ্টি নির্দেশিকা এবং প্রোটোকলগুলো বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অভিযোজিত করে প্রয়োগ করা জরুরি। বিশেষত, সাপ্লিমেন্টেশনের ক্ষেত্রে সঠিক নির্দেশনা ও ডোপিং-মুক্ত পুষ্টি নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

বছর যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় কর্তৃক পুষ্টি খাতে বরাদ্দ (কোটি টাকা) মোট ক্রীড়া বাজেট (%) বিকেএসপি-তে পূর্ণকালীন পুষ্টিবিদ সংখ্যা জাতীয় দলসমূহে পুষ্টিবিদদের নিয়মিত উপস্থিতি (%)
২০২০-২১ ১.৫ ০.২% ১ ২৫%
২০২১-২২ ১.৮ ০.২% ১ ৩০%
২০২২-২৩ ২.২ ০.২% ১ ৩৫%

উৎস: যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (বিকেএসপি), এবং বাংলাদেশ সরকার-এর বার্ষিক বাজেট প্রতিবেদন।

সুপারিশ

  • যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়-কে অবিলম্বে 'জাতীয় ক্রীড়া নীতিমালা ২০২২' এর আওতায় একটি 'জাতীয় ক্রীড়া পুষ্টি নির্দেশিকা' প্রণয়ন করতে হবে, যা World Bank এবং ADB-এর সহায়তায় পরিচালিত গবেষণার ভিত্তিতে তৈরি হবে এবং প্রতিটি ক্রীড়া ফেডারেশন ও বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (বিকেএসপি) এর জন্য বাধ্যতামূলক করা হবে।
  • বাংলাদেশ সরকার-এর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়-এর যৌথ উদ্যোগে প্রতিটি জেলা ক্রীড়া সংস্থা এবং জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি) পরিচালিত প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে কমপক্ষে একজন করে পূর্ণকালীন রেজিস্টার্ড পুষ্টিবিদ নিয়োগের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট 'ক্রীড়া পুষ্টিবিদ নিয়োগ প্রকল্প' চালু করতে হবে এবং এর জন্য প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে।
  • জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি) এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, যেমন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট-এর মধ্যে একটি যৌথ গবেষণা ও উন্নয়ন চুক্তি (R&D Agreement) স্বাক্ষর করতে হবে, যার মাধ্যমে ক্রীড়া পুষ্টি বিষয়ে উচ্চতর গবেষণা, প্রশিক্ষণ কর্মসূচী এবং ক্রীড়াবিদদের জন্য ব্যক্তিগতকৃত ডায়েট প্ল্যান তৈরির প্রযুক্তিগত সহায়তা নিশ্চিত করা হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ড. আসিফ রায়হান

ড. আসিফ রায়হান 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: স্পোর্টস সায়েন্স ও অ্যাথলিট পারফরম্যান্স। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Nessun commento trovato


News Card Generator