ফিটনেস ও আধুনিক জীবনধারা: ডিজিটাল স্ক্রিনের আসক্তি ও শিশুদের শারীরিক স্থবিরতা, সমাধান কোথায়? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

ফিটনেস ও আধুনিক জীবনধারা: ডিজিটাল স্ক্রিনের আসক্তি ও শিশুদের শারীরিক স্থবিরতা, সমাধান কোথায়?

রনি চৌধুরী  avatar   
রনি চৌধুরী
ফিটনেস ও আধুনিক জীবনধারা: ডিজিটাল স্ক্রিনের আসক্তি ও শিশুদের শারীরিক স্থবিরতা, সমাধান কোথায়?
ফিটনেস ও আধুনিক জীবনধারা: ডিজিটাল স্ক্রিনের আসক্তি ও শিশুদের শারীরিক স্থবিরতা, সমাধান কোথায়?
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং ইউনিসেফের যৌথ উদ্যোগে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বাংলাদেশে ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে প্রায় ৪০% প্র...

সম্প্রতি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং ইউনিসেফের যৌথ উদ্যোগে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বাংলাদেশে ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে প্রায় ৪০% প্রতিদিন ২ ঘণ্টার বেশি সময় ডিজিটাল স্ক্রিনে ব্যয় করে, যা তাদের শারীরিক কার্যকলাপের মারাত্মক ঘাটতি তৈরি করছে। এই প্রবণতা, যা কেবল শহরাঞ্চলেই সীমাবদ্ধ নয়, এখন গ্রামীণ এলাকাতেও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, শিশুদের ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্য ও ফিটনেসের উপর এক গুরুতর হুমকি সৃষ্টি করছে। আধুনিক জীবনযাত্রার অনুষঙ্গ হিসেবে ডিজিটাল প্রযুক্তির অপরিহার্যতা অনস্বীকার্য হলেও, এর অপরিমিত ব্যবহার শিশুদের মধ্যে স্থূলতা, দৃষ্টিশক্তির সমস্যা এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতার মতো নতুন স্বাস্থ্য সংকটের জন্ম দিচ্ছে।

ডিজিটাল স্ক্রিনের প্রতি এই ক্রমবর্ধমান আসক্তি শিশুদের প্রথাগত খেলাধুলা এবং বাইরের শারীরিক কার্যকলাপ থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। একসময় যেখানে শিশুরা পাড়া-মহল্লায় ক্রিকেট, ফুটবল বা গোল্লাছুটের মতো খেলায় মেতে থাকত, আজ সেখানে তাদের অধিকাংশ সময় কাটছে স্মার্টফোন, ট্যাবলেট বা কম্পিউটারের সামনে। এর ফলে তাদের পেশী ও হাড়ের সঠিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদী শারীরিক স্থবিরতা এবং শৈশবের স্থূলতার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত সাম্প্রতিক একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, গত এক দশকে দেশের শিশুদের মধ্যে টাইপ-২ ডায়াবেটিস এবং উচ্চ রক্তচাপের মতো অসংক্রামক রোগের হার উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যার একটি বড় কারণ হিসেবে শারীরিক নিষ্ক্রিয়তাকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই পরিবর্তনগুলি কেবল ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য নয়, বরং জাতীয় জনস্বাস্থ্যেও এক বিশাল চাপ সৃষ্টি করছে, যা ভবিষ্যতের কর্মক্ষম জনশক্তির উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

এই সমস্যাটি কেবল শিশুদের শারীরিক স্বাস্থ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক প্রভাবও সুদূরপ্রসারী। অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম শিশুদের মধ্যে মনোযোগের অভাব, ঘুমের ব্যাঘাত, আগ্রাসী আচরণ এবং সামাজিক দক্ষতার দুর্বলতা তৈরি করতে পারে। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (ADB) তাদের একটি নীতি নির্ধারণী গবেষণাপত্রে উল্লেখ করেছে যে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে ডিজিটাল ডিভাইসের সহজলভ্যতা এবং বাবা-মায়েদের কর্মব্যস্ততা শিশুদের মধ্যে স্ক্রিন নির্ভরতা বাড়াতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সরকারের সম্মিলিত প্রচেষ্টা অপরিহার্য। শিশুদের জন্য শারীরিক কার্যকলাপের সুযোগ বৃদ্ধি, ডিজিটাল স্ক্রিন ব্যবহারের সময়সীমা নির্ধারণ এবং স্বাস্থ্যকর জীবনধারার প্রতি উদ্বুদ্ধকরণ এখন সময়ের দাবি।

বিষয় ২০১৫ সালের তথ্য ২০২৩ সালের তথ্য উৎস
৫-১৭ বছর বয়সী শিশুদের গড় দৈনিক স্ক্রিন টাইম (২ ঘণ্টার বেশি) ২২% ৪০% WHO/UNICEF যৌথ প্রতিবেদন
৫-১২ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে অতিরিক্ত ওজন/স্থূলতার হার ১২.৫% ১৮.৭% স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ
প্রাথমিক বিদ্যালয়গামী শিশুদের মধ্যে দৈনিক কমপক্ষে ৬০ মিনিট শারীরিক কার্যকলাপের অভাব ৬৮% ৭৫% World Bank (বাংলাদেশ সংক্রান্ত প্রতিবেদন)
১৩-১৭ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে ঘুমের ব্যাঘাতের হার (সপ্তাহে ৩ দিনের বেশি) ১৫% ২৫% ADB (দক্ষিণ এশিয়া আঞ্চলিক সমীক্ষা)

উৎস: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), ইউনিসেফ, বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়, World Bank, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (ADB)

সুপারিশ

  • বাংলাদেশ সরকার, বিশেষ করে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়কে যৌথভাবে 'জাতীয় শিশু শারীরিক সুস্থতা নীতি' প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে, যেখানে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দৈনিক ন্যূনতম এক ঘণ্টা শারীরিক কার্যকলাপ বাধ্যতামূলক করা হবে এবং এর জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও প্রশিক্ষিত শিক্ষক নিয়োগের ব্যবস্থা থাকবে।
  • স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়কে World Bank এবং ADB-এর সহযোগিতায় দেশব্যাপী 'ডিজিটাল স্ক্রিন সচেতনতা ও নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি' চালু করতে হবে, যা বাবা-মা এবং শিশুদের মধ্যে স্ক্রিন আসক্তির বিপদ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করবে এবং একটি নির্দিষ্ট বয়সসীমার জন্য স্ক্রিন ব্যবহারের সর্বোচ্চ সময়সীমা নির্ধারণের জন্য আইনগত কাঠামো তৈরির উদ্যোগ নেবে।
  • বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (BTRC) এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগকে যৌথভাবে এমন একটি প্রযুক্তিগত সমাধান উদ্ভাবন করতে হবে যা শিশুদের জন্য ইন্টারনেটের নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করবে এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোতে অপ্রয়োজনীয় স্ক্রিন টাইম কমাতে সাহায্য করবে, যেমন - শিক্ষামূলক অ্যাপের বাইরে বিনোদনমূলক অ্যাপের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা আরোপ করা বা প্যারেন্টাল কন্ট্রোল ফাংশন সহজলভ্য করা।

✍️ নিবন্ধ লেখক: রনি চৌধুরী

রনি চৌধুরী 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: ফিটনেস ও আধুনিক জীবনধারা। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Nema komentara


News Card Generator