গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) খাতে সরকারি অনুদান: বিনিয়োগ না দায়? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) খাতে সরকারি অনুদান: বিনিয়োগ না দায়?

ড. সায়মা হুদা  avatar   
ড. সায়মা হুদা
গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) খাতে সরকারি অনুদান: বিনিয়োগ না দায়?
গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) খাতে সরকারি অনুদান: বিনিয়োগ না দায়?
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি প্রকাশিত বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)-এর বার্ষিক প্রতিবেদন ২০২২ অনুযায়ী, বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে গবেষণা খাতে বরাদ্দকৃত অর্থের...

সম্প্রতি প্রকাশিত বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)-এর বার্ষিক প্রতিবেদন ২০২২ অনুযায়ী, বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে গবেষণা খাতে বরাদ্দকৃত অর্থের পরিমাণ মোট বাজেটের ১ শতাংশেরও কম, যেখানে উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতে এটি ২ থেকে ৪ শতাংশ পর্যন্ত হয়ে থাকে। এই পরিসংখ্যানটি আমাদের জাতীয় গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) খাতে সরকারি অনুদানের প্রকৃতি নিয়ে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে: এটি কি ভবিষ্যতের জন্য একটি অপরিহার্য বিনিয়োগ, নাকি বর্তমানে একটি অপ্রয়োজনীয় দায়? যখন আমাদের অর্থনীতি চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুত হচ্ছে, তখন এই খাতের স্বল্প বরাদ্দ এবং তার কার্যকারিতা নিয়ে গভীর বিশ্লেষণ অত্যাবশ্যক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই স্বল্প বরাদ্দ শুধু সংখ্যাগত অপ্রতুলতাই নয়, বরং এর বিতরণ ও প্রয়োগ পদ্ধতিতেও গুরুতর দুর্বলতা পরিলক্ষিত হয়। বাংলাদেশ ব্যুরো অফ এডুকেশনাল ইনফরমেশন অ্যান্ড স্ট্যাটিস্টিক্স (ব্যানবেইস) এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে গবেষণা ও উদ্ভাবনী কার্যক্রমে বিনিয়োগ আরও নগণ্য। কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর অধীনস্থ পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটগুলোতে আধুনিক ল্যাবরেটরি স্থাপন বা গবেষণা প্রকল্পে অর্থায়নের ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতার অভাব রয়েছে, যা দক্ষ জনবল তৈরির পথে বড় অন্তরায়। এই প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে পাশ করা শিক্ষার্থীরা প্রায়শই শিল্প খাতের চাহিদা অনুযায়ী অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে দক্ষ হতে পারছে না, কারণ তাদের পাঠ্যক্রম এবং গবেষণা সুযোগ উভয়ই পুরনো ধ্যানধারণা দ্বারা প্রভাবিত। ফলস্বরূপ, স্নাতক শেষ করে তারা চাকরির বাজারে প্রবেশ করতে হিমশিম খায়, যা একদিকে যেমন দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করছে, তেমনি অন্যদিকে শিল্প খাতের উৎপাদনশীলতা ও উদ্ভাবনী ক্ষমতাকে সীমিত করছে। এই ধারা চলতে থাকলে দেশের শিল্প খাত আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে এবং মেধা পাচার বেড়ে যাবে, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর হবে।

ন্যাশনাল স্কিলস ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (NSDA) এবং স্কিলস ফর এমপ্লয়মেন্ট ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রাম (SEIP) এর মতো সংস্থাগুলো যদিও দক্ষতা উন্নয়নে কাজ করছে, কিন্তু তাদের কার্যক্রমের মূল ফোকাস R&D-তে সরাসরি বিনিয়োগের পরিবর্তে প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে সীমাবদ্ধ। উদাহরণস্বরূপ, SEIP এর মাধ্যমে বিভিন্ন শিল্পে দক্ষ শ্রমিক তৈরির জন্য প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু এই প্রশিক্ষণগুলো প্রায়শই নতুন প্রযুক্তি বা উদ্ভাবনী প্রক্রিয়ার উপর ভিত্তি করে হয় না, যা গবেষণা ও উন্নয়নের সরাসরি ফল। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মৌলিক গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় ফান্ডিং অপ্রতুল থাকায় নতুন জ্ঞান সৃষ্টি ও তার বাণিজ্যিকীকরণের প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত ধীরগতিতে চলছে। গবেষণার ফলাফলগুলো শিল্প খাতের সঙ্গে কার্যকরভাবে সংযুক্ত হতে পারছে না, যার ফলে উদ্ভাবনগুলো পরীক্ষাগারেই সীমাবদ্ধ থাকছে এবং বাস্তবে প্রয়োগ হচ্ছে না। এই পরিস্থিতি ইঙ্গিত দেয় যে, সরকারি অনুদানকে যদি প্রকৃত অর্থে বিনিয়োগে রূপান্তরিত করতে হয়, তবে তা শুধু বরাদ্দ বৃদ্ধি করলেই হবে না, বরং এর সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, গবেষণা ফলাফলকে শিল্পে প্রয়োগের সুযোগ সৃষ্টি এবং উদ্ভাবনী ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার দিকেও মনোযোগ দিতে হবে। অন্যথায়, এই অনুদান কেবল একটি দায় হিসেবেই থেকে যাবে, যা কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে ব্যর্থ হবে।

খাত ২০২২-২৩ অর্থবছরে মোট বরাদ্দ (কোটি টাকা) R&D খাতে অনুদান (কোটি টাকা) মোট বরাদ্দের শতকরা হার (%)
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC) ১০৯৪৫.০০ ১০৫.০০ ০.৯৫
কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর (DTE) ৩২৪৬.৫০ ৪.৮০ ০.১৫
ন্যাশনাল স্কিলস ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (NSDA) ১৪৫.০০ ১.৫০ ১.০৩
স্কিলস ফর এমপ্লয়মেন্ট ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রাম (SEIP) ১০০২.০০ ৩.০০ ০.৩০

উৎস: UGC বার্ষিক প্রতিবেদন ২০২২, অর্থ মন্ত্রণালয় বাজেট ডকুমেন্ট ২০২৩-২৪, NSDA ও SEIP এর প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদন ২০২৩।

সুপারিশ

  • বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC)-এর মাধ্যমে R&D খাতে বরাদ্দকৃত অর্থকে উৎপাদনশীল খাতে সরাসরি বিনিয়োগের জন্য একটি 'গবেষণা বাণিজ্যিকীকরণ তহবিল' প্রতিষ্ঠা করা হোক, যেখানে গবেষণার ফলাফল পেটেন্ট ও শিল্পে প্রয়োগের জন্য আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে এবং এর জন্য একটি নির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে।
  • কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর (DTE) এবং ন্যাশনাল স্কিলস ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (NSDA) এর সমন্বয়ে একটি 'শিল্প-শিক্ষা সমন্বয় সেল' গঠন করা হোক, যা শিল্প খাতের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ চাহিদা চিহ্নিত করে কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর গবেষণা ও পাঠ্যক্রম প্রণয়নে সরাসরি প্রভাব ফেলবে এবং শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে যৌথ R&D প্রকল্প উৎসাহিত করবে, যার জন্য সরকারি প্রনোদনা প্রদান করা হবে।
  • স্কিলস ফর এমপ্লয়মেন্ট ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রাম (SEIP) এর আওতাধীন প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে উদ্ভাবন ও নতুন প্রযুক্তি বিকাশের জন্য একটি বাধ্যতামূলক R&D মডিউল যুক্ত করা হোক এবং এ খাতে বাজেট বৃদ্ধি করে সংশ্লিষ্ট শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের R&D ল্যাবে SEIP শিক্ষার্থীদের ইন্টার্নশিপের সুযোগ দিতে বাধ্য করা হোক, যার বিনিময়ে সরকার কর ছাড়ের মতো সুবিধা প্রদান করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ড. সায়মা হুদা

ড. সায়মা হুদা 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) খাত। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Không có bình luận nào được tìm thấy


News Card Generator