ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন থেকে সাইবার নিরাপত্তা আইনে রূপান্তর: প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ ও নাগরিকের অধিকার | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন থেকে সাইবার নিরাপত্তা আইনে রূপান্তর: প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ ও নাগরিকের অধিকার

অ্যাডভোকেট ফারজানা  avatar   
অ্যাডভোকেট ফারজানা
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন থেকে সাইবার নিরাপত্তা আইনে রূপান্তর: প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ ও নাগরিকের অধিকার
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন থেকে সাইবার নিরাপত্তা আইনে রূপান্তর: প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ ও নাগরিকের অধিকার
ছবি: সংগৃহীত
গত বছর (২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাস) বহুল আলোচিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন (ডিএসএ) বাতিল করে সাইবার নিরাপত্তা আইন (সিএসএ) কার্যকর করার বাংলাদেশ সরকারের সিদ্ধান্ত এ...

গত বছর (২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাস) বহুল আলোচিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন (ডিএসএ) বাতিল করে সাইবার নিরাপত্তা আইন (সিএসএ) কার্যকর করার বাংলাদেশ সরকারের সিদ্ধান্ত একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক নতুন আইনের গেজেট প্রকাশের পর থেকে ডিজিটাল পরিসরে নাগরিকদের অধিকার সুরক্ষা ও সাইবার অপরাধ দমনে এর কার্যকারিতা নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে। এই পরিবর্তন কেবল আইনের নামবদল নয়, বরং এর উদ্দেশ্য ও প্রয়োগে একটি মৌলিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়, যা প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ এবং নাগরিকের মৌলিক অধিকারের মধ্যে ভারসাম্য আনার একটি প্রচেষ্টার অংশ।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮, তার প্রবর্তনের পর থেকেই বাক স্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার উপর এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক সমালোচিত হয়েছিল। বিশেষ করে, এই আইনের ধারা ২৫ (মানহানি), ধারা ২৮ (ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত), ধারা ২৯ (মানহানিকর তথ্য প্রকাশ), এবং ধারা ৩১ (আইনশৃঙ্খলা অবনতি) এর অপব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো এবং গণমাধ্যম কর্মীরা নিয়মিতভাবে এই ধারাগুলোর অধীনে দায়ের করা মামলার সংখ্যা বৃদ্ধি এবং এর ফলে সাংবাদিক ও সমালোচকদের হয়রানির বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছিল। এই প্রেক্ষাপটে, বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিক অংশীদার এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনার পর আইনটির সংশোধনীর প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে। ওয়ার্ল্ড ব্যাংক এবং এডিবি'র মতো সংস্থাগুলো ডিজিটাল গভর্নেন্স ও সাইবার নিরাপত্তা অবকাঠামো উন্নয়নে সহায়তার পাশাপাশি আইনের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার উপর জোর দিয়েছিল। ফলশ্রুতিতে, সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৩-এ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, মানহানির ধারা ২৯-কে জামিনযোগ্য ধারায় রূপান্তর এবং কারাদণ্ডের পরিবর্তে মূলত আর্থিক দণ্ডের বিধান রাখা। এছাড়াও, কিছু ধারায় কারাদণ্ডের মেয়াদ কমানো হয়েছে, যা আইনের কঠোরতা হ্রাসের একটি ইঙ্গিত দেয়।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন থেকে সাইবার নিরাপত্তা আইনে রূপান্তরের পর প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জগুলো আরও প্রকট হয়েছে। নতুন আইন কার্যকর হওয়ার পর, সাইবার অপরাধ তদন্তে পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিট এবং বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশন (বিটিআরসি)-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি করা অপরিহার্য। সাইবার অপরাধের ধরন প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে, যেখানে ফিশিং, র‍্যানসমওয়্যার, ডেটা ব্রিচ, পরিচয় চুরি এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বিদ্বেষমূলক প্রচারণার মতো অপরাধগুলো ক্রমশ জটিল হচ্ছে। এসব অপরাধ শনাক্ত, প্রতিরোধ এবং তদন্তের জন্য উন্নত সাইবার ফরেনসিক টুলস, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ভিত্তিক বিশ্লেষণ পদ্ধতি এবং বিশেষজ্ঞ প্রশিক্ষিত জনবলের অভাব একটি বড় চ্যালেঞ্জ। উদাহরণস্বরূপ, ডেটা এনক্রিপশন এবং ডার্ক ওয়েবে সংঘটিত অপরাধ ট্র্যাক করার জন্য অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলির সাথে কার্যকর সমন্বয় স্থাপন করা অত্যন্ত জরুরি। বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল (বিসিসি) এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগকে এই প্রযুক্তিগত অবকাঠামো এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে আরও বিনিয়োগ করতে হবে, যাতে নতুন আইনের উদ্দেশ্য সফলভাবে বাস্তবায়ন করা যায়।

নাগরিকের অধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে, সাইবার নিরাপত্তা আইন ডিএসএ'র তুলনায় কিছু ক্ষেত্রে অগ্রগতি দেখালেও, সম্পূর্ণভাবে উদ্বেগমুক্ত নয়। যদিও ধারা ২৯ (মানহানি) জামিনযোগ্য করা হয়েছে, তবুও অন্যান্য কিছু ধারা, যেমন ধারা ২১ (মুক্তিযুদ্ধ, জাতির পিতা, জাতীয় সঙ্গীত বা জাতীয় পতাকার বিরুদ্ধে অপপ্রচার), ধারা ২৭ (সাইবার সন্ত্রাস), এবং ধারা ৪২ (তাৎক্ষণিক তল্লাশি ও জব্দ করার ক্ষমতা), এখনও সমালোচনার মুখে রয়েছে। এই ধারাগুলোর প্রয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যাতে সাংবাদিক, গবেষক এবং সাধারণ নাগরিকরা তাদের মত প্রকাশের স্বাধীনতায় কোনো ধরনের বাধা অনুভব না করেন। বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রণীত এই আইনটি একদিকে যেমন সাইবার স্পেসে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে চায়, অন্যদিকে তেমনি সংবিধান প্রদত্ত মৌলিক অধিকার, বিশেষ করে বাক স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার সুরক্ষিত রাখতে চায়। এই ভারসাম্য বজায় রাখা একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া, যার জন্য প্রয়োজন আইনের সঠিক প্রয়োগ, বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি।

পরিসংখ্যানের ধরন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন (ডিএসএ) সাইবার নিরাপত্তা আইন (সিএসএ) (প্রাথমিক প্রভাব) উৎস
মোট মামলার সংখ্যা (২০১৮-২০২২) ৭,০০০+ পর্যালোচনাধীন পুলিশ সদর দপ্তর, বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা
সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলার সংখ্যা (২০২০-২০২২) ৪০০+ উল্লেখযোগ্য হ্রাস (প্রথম ৬ মাসে) গণমাধ্যম প্রতিবেদন, আর্টিকেল ১৪
গ্রেফতারের সংখ্যা (২০১৮-২০২২) ৩,০০০+ পর্যালোচনাধীন পুলিশ সদর দপ্তর
মানহানি (ধারা ২৯) সংক্রান্ত মামলা (২০১৮-২০২২) মোট মামলার প্রায় ২৫% জামিনযোগ্য হওয়ায় মামলা কমেছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)
বিচার নিষ্পত্তির হার (২০১৮-২০২২) ১০% এর কম আইন মন্ত্রণালয় কর্তৃক অগ্রাধিকার আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়

উৎস: বাংলাদেশ পুলিশ সদর দপ্তর, আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক), আর্টিকেল ১৪, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদন।

সুপারিশ

  • সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৩-এর অধীনে তদন্তকারী কর্মকর্তাদের জন্য বাংলাদেশ পুলিশ সাইবার ক্রাইম ইউনিট এবং বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল (বিসিসি) কর্তৃক নিয়মিত ও উন্নত প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আয়োজন করতে হবে, যেখানে সাইবার ফরেনসিক, ডেটা বিশ্লেষণ এবং ডিজিটাল প্রমাণ সংগ্রহের আধুনিক পদ্ধতি অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
  • তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগকে সাইবার নিরাপত্তা অবকাঠামো উন্নয়নে ওয়ার্ল্ড ব্যাংক এবং এডিবি'র সহায়তায় একটি সুনির্দিষ্ট প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে, যার আওতায় অত্যাধুনিক সাইবার ল্যাব স্থাপন এবং সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের জন্য আন্তর্জাতিক মানের সার্টিফিকেশন কোর্স চালু করা হবে।
  • আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে সাইবার নিরাপত্তা আইন প্রয়োগের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য একটি স্বাধীন পর্যবেক্ষণ কমিটি গঠন করতে হবে, যা নিয়মিতভাবে আইনের অপব্যবহারের অভিযোগগুলো পর্যালোচনা করবে এবং গণমাধ্যম ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: অ্যাডভোকেট ফারজানা

অ্যাডভোকেট ফারজানা 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: সাইবার অপরাধ ও ডিজিটাল আইন। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

No se encontraron comentarios


News Card Generator