ইস্পাত উৎপাদনে বিদ্যুৎ সংকট: চুল্লির উত্তাপ আর অর্থনীতির শীতলতা | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

ইস্পাত উৎপাদনে বিদ্যুৎ সংকট: চুল্লির উত্তাপ আর অর্থনীতির শীতলতা

আলতাফ হোসেন  avatar   
আলতাফ হোসেন
ইস্পাত উৎপাদনে বিদ্যুৎ সংকট: চুল্লির উত্তাপ আর অর্থনীতির শীতলতা
ইস্পাত উৎপাদনে বিদ্যুৎ সংকট: চুল্লির উত্তাপ আর অর্থনীতির শীতলতা
ছবি: সংগৃহীত
গত মার্চ মাসে দেশের শীর্ষস্থানীয় ইস্পাত উৎপাদক প্রতিষ্ঠান বিএসআরএম (বাংলাদেশ স্টিল রি-রোলিং মিলস) তাদের বার্ষিক উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা থেকে প্রায় ১৫% পিছিয়ে পড়ে...

গত মার্চ মাসে দেশের শীর্ষস্থানীয় ইস্পাত উৎপাদক প্রতিষ্ঠান বিএসআরএম (বাংলাদেশ স্টিল রি-রোলিং মিলস) তাদের বার্ষিক উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা থেকে প্রায় ১৫% পিছিয়ে পড়েছিল, যার প্রধান কারণ ছিল নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের ঘাটতি। শিল্প মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের ইস্পাত ও রি-রোলিং মিলগুলো গত অর্থবছরে তাদের মোট উৎপাদন ক্ষমতার প্রায় ৩০-৪০% অব্যবহৃত রাখতে বাধ্য হয়েছে, যার সিংহভাগ কারণ বিদ্যুৎ সংকট। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) থেকে শিল্প খাতে সরবরাহকৃত বিদ্যুতের চাপ সামাল দিতে গিয়ে প্রায়শই লোডশেডিংয়ের মুখে পড়ছে ইস্পাত কারখানাগুলো, যা কেবল উৎপাদন ব্যাহত করছে না, বরং চুল্লি শীতল হয়ে যাওয়ার কারণে যন্ত্রপাতির দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির ঝুঁকিও বাড়াচ্ছে।

বিদ্যুৎ সংকটের এই ধারাবাহিকতা ইস্পাত খাতের প্রবৃদ্ধি এবং সামগ্রিক অর্থনীতির উপর গভীর প্রভাব ফেলছে। আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দামের ঊর্ধ্বগতি এবং স্থানীয়ভাবে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সরবরাহ অনিশ্চয়তা বাংলাদেশের ইস্পাত শিল্পকে এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে। বিশেষত, আর্ক ফার্নেস (Electric Arc Furnace - EAF) ভিত্তিক ইস্পাত উৎপাদন প্রক্রিয়ায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ অপরিহার্য। একটি আধুনিক ইস্পাত চুল্লি একবার চালু হলে তা নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় বজায় রাখা অত্যাবশ্যক; বিদ্যুৎ সরবরাহ বিঘ্নিত হলে চুল্লির অভ্যন্তরীণ ধাতু শীতল হয়ে জমে যেতে পারে, যা পুনরায় চালু করতে ব্যাপক শক্তি ও সময় ব্যয় হয় এবং যন্ত্রপাতির আয়ু কমিয়ে দেয়। বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএসএমএ)-এর তথ্যমতে, গত ছয় মাসে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে ইস্পাত কারখানায় উৎপাদন ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার বেশি, যা দেশের অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের গতিকেও শ্লথ করে দিচ্ছে। সরকার মেগা প্রকল্পগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় ইস্পাতের সরবরাহ নিশ্চিত করতে হিমশিম খাচ্ছে, কারণ স্থানীয় উৎপাদকরা পর্যাপ্ত পরিমাণে সরবরাহ দিতে পারছে না।

এই সংকট কেবল উৎপাদন ব্যাহত করছে না, বরং বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের উপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। World Bank-এর এক সাম্প্রতিক সমীক্ষা অনুযায়ী, বিদ্যুৎ সরবরাহ অনিশ্চয়তার কারণে বাংলাদেশের ভারী শিল্পে নতুন বিনিয়োগের হার গত দুই বছরে প্রায় ১০% কমেছে। বিদেশী বিনিয়োগকারীরা, যারা বাংলাদেশে ভারী শিল্প স্থাপনে আগ্রহী, তারা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের অভাবকে একটি বড় ঝুঁকির কারণ হিসেবে দেখছেন। অন্যদিকে, বিদ্যমান কারখানাগুলো তাদের উৎপাদন সক্ষমতা পূর্ণাঙ্গভাবে ব্যবহার করতে না পারায় নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ব্যর্থ হচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে ছাঁটাইয়ের ঘটনাও ঘটছে। বিশেষ করে, মাঝারি ও ছোট আকারের ইস্পাত কারখানাগুলো এই সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, কারণ তাদের নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন বা ব্যাকআপ ব্যবস্থার সক্ষমতা সীমিত। ADB (Asian Development Bank)-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, জ্বালানি মিশ্রণে নবায়নযোগ্য শক্তির অংশ বৃদ্ধি না করা এবং গ্যাস আমদানির উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এই বিদ্যুৎ সংকটের অন্যতম মূল কারণ। আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাসের উচ্চমূল্য এবং ডলার সংকটের কারণে এলএনজি আমদানি ব্যাহত হওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চলতে পারছে না, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিল্প খাতে।

অর্থবছর ইস্পাত উৎপাদনে বিদ্যুতের চাহিদা (মেগাওয়াট) বিদ্যুৎ সরবরাহ (মেগাওয়াট) ঘাটতি (%) উৎপাদন ক্ষমতা ব্যবহার (%)
২০২১-২২ ১২৫০ ১১৮০ ৫.৬ ৮৫
২০২২-২৩ ১৩৫০ ১২০০ ১১.১ ৭৮
২০২৩-২৪ (প্রক্ষেপিত) ১৪৫০ ১২২০ ১৫.৮ ৬৫

উৎস: বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও শিল্প মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ সরকার।

সুপারিশ

  • বিদ্যুৎ বিভাগ এবং শিল্প মন্ত্রণালয়কে সমন্বিতভাবে একটি 'শিল্প বিদ্যুৎ সরবরাহ অগ্রাধিকার নীতি' প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে ইস্পাত ও অন্যান্য ভারী শিল্পের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে একটি ডেডিকেটেড গ্রিড লাইন বা উচ্চ অগ্রাধিকার সম্পন্ন সরবরাহ ব্যবস্থা চালু করা হবে, প্রয়োজনে শিল্প এলাকার জন্য পৃথক ট্যারিফ কাঠামো বিবেচনা করা যেতে পারে।
  • বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (BPDB) এবং পেট্রোবাংলাকে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি সরবরাহ পরিকল্পনা পুনর্বিন্যাস করতে হবে, যেখানে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন বৃদ্ধি এবং নবায়নযোগ্য উৎস (যেমন সোলার পার্ক) থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিনিয়োগের জন্য 'নবায়নযোগ্য শক্তি নীতি ২০০৮' (সংশোধিত) এর অধীনে বিশেষ প্রণোদনা ও দ্রুত অনুমোদন প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে।
  • বাংলাদেশ সরকার World Bank এবং ADB-এর সহায়তায় ইস্পাত খাতের জন্য একটি 'বিশেষায়িত জ্বালানি দক্ষতা তহবিল' গঠন করতে পারে, যা কার্বন ফুটপ্রিন্ট কমানো এবং বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী প্রযুক্তি (যেমন: Induction Furnace) গ্রহণে ইস্পাত কারখানাগুলোকে স্বল্প সুদে ঋণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করবে, যা দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ চাহিদা কমাতে সাহায্য করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: আলতাফ হোসেন

আলতাফ হোসেন 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: ভারী শিল্প, ইস্পাত ও সিমেন্ট। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator