আন্তর্জাতিক অ্যাথলেটিক্সে বাংলাদেশের পদক স্বপ্ন: বিজ্ঞান ও অবকাঠামোর দূরত্ব ঘুচবে কবে? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

আন্তর্জাতিক অ্যাথলেটিক্সে বাংলাদেশের পদক স্বপ্ন: বিজ্ঞান ও অবকাঠামোর দূরত্ব ঘুচবে কবে?

রায়হান রশীদ  avatar   
রায়হান রশীদ
আন্তর্জাতিক অ্যাথলেটিক্সে বাংলাদেশের পদক স্বপ্ন: বিজ্ঞান ও অবকাঠামোর দূরত্ব ঘুচবে কবে?
আন্তর্জাতিক অ্যাথলেটিক্সে বাংলাদেশের পদক স্বপ্ন: বিজ্ঞান ও অবকাঠামোর দূরত্ব ঘুচবে কবে?
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি ফ্রান্সের প্যারিসে ২০২৩ সালের বিশ্ব অ্যাথলেটিক্স চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ এবং কোনো পদক অর্জনে ব্যর্থতা আবারও দেশের ক্রীড়ামহলে গভীর আলোচন...

সম্প্রতি ফ্রান্সের প্যারিসে ২০২৩ সালের বিশ্ব অ্যাথলেটিক্স চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ এবং কোনো পদক অর্জনে ব্যর্থতা আবারও দেশের ক্রীড়ামহলে গভীর আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে, ১০০ মিটার স্প্রিন্টে বাংলাদেশের দ্রুততম মানব ইমরাউল ইসলামের প্রাথমিক রাউন্ডেই বিদায়, যেখানে তার ব্যক্তিগত সেরা সময়ও বিশ্বমানের কাছাকাছি ছিল না, তা আন্তর্জাতিক অ্যাথলেটিক্সের মঞ্চে বাংলাদেশের অবস্থানকে স্পষ্ট করে তোলে। যদিও বাংলাদেশের অ্যাথলেটিক্স ফেডারেশন নিয়মিতভাবে স্থানীয় প্রতিযোগিতা আয়োজন করে এবং প্রতিভা অন্বেষণের চেষ্টা করে, কিন্তু বৈশ্বিক মানদণ্ডের সঙ্গে আমাদের অ্যাথলেটদের পারফরম্যান্সের ব্যবধান প্রতি বছরই বাড়ছে। এই ব্যবধান কেবল ব্যক্তিগত প্রতিভার অভাবের কারণে নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক প্রশিক্ষণ, আধুনিক অবকাঠামো এবং দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগের সুদূরপ্রসারী অভাব।

বাংলাদেশের ক্রীড়া বাজেট এবং অ্যাথলেটিক্সের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থের দিকে তাকালে দেখা যায়, এটি বৈশ্বিক মানদণ্ডের তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশ সরকার প্রতি বছর যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ক্রীড়া খাতের উন্নয়নে একটি নির্দিষ্ট বাজেট বরাদ্দ করে, যার একটি ক্ষুদ্র অংশ অ্যাথলেটিক্সের জন্য নির্ধারিত থাকে। এই বরাদ্দ মূলত স্থানীয় প্রতিযোগিতা আয়োজন, ফেডারেশনের দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনা এবং কিছু সরঞ্জাম ক্রয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। অত্যাধুনিক প্রশিক্ষণ ল্যাব, স্পোর্টস সায়েন্স সেন্টার, পুষ্টিবিদ, মনোবিজ্ঞানী এবং উচ্চ প্রশিক্ষিত বিদেশী কোচের মতো গুরুত্বপূর্ণ উপাদানগুলোতে বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় শূন্য। ফলে, আমাদের অ্যাথলেটরা এখনো ঐতিহ্যবাহী এবং অপ্রচলিত পদ্ধতির উপর নির্ভরশীল, যা আধুনিক অ্যাথলেটিক্সের তীব্র প্রতিযোগিতায় তাদের পিছিয়ে রাখছে। ওয়ার্ল্ড ব্যাংক (World Bank) এবং এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (ADB) সহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো যদিও বাংলাদেশের বিভিন্ন অবকাঠামোগত উন্নয়নে সহায়তা করে থাকে, কিন্তু সরাসরি ক্রীড়া অবকাঠামো বা বিজ্ঞানভিত্তিক অ্যাথলেটিক্স কর্মসূচিতে তাদের বিনিয়োগের কোনো উল্লেখযোগ্য নজির নেই। তাদের সহায়তা সাধারণত শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা বিদ্যুৎ খাতের মতো মৌলিক চাহিদা পূরণে কেন্দ্রীভূত। এই প্রেক্ষাপটে, অ্যাথলেটিক্সের মতো একটি বিজ্ঞাননির্ভর খেলায় সাফল্য অর্জনের জন্য যে ধরনের বিশেষায়িত আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রয়োজন, তা বাংলাদেশে অনুপস্থিত।

শুধুমাত্র আর্থিক সীমাবদ্ধতাই নয়, বরং আন্তর্জাতিক অ্যাথলেটিক্সে সফলতার জন্য প্রয়োজনীয় আধুনিক অবকাঠামোর অভাবও বাংলাদেশের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। দেশে হাতেগোনা কয়েকটি আধুনিক ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ড থাকলেও, সেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ এবং নিয়মিত ব্যবহার নিশ্চিত করা একটি বড় সমস্যা। বেশিরভাগ ট্র্যাকই আন্তর্জাতিক মানের নয় এবং সেখানে প্রশিক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় আধুনিক সরঞ্জাম যেমন – উচ্চমানের টাইমিং সিস্টেম, ভিডিও অ্যানালাইসিস টুলস, শক্তি ও সহনশীলতা পরিমাপক যন্ত্রপাতির অনুপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। উদাহরণস্বরূপ, উন্নত দেশগুলোতে স্পোর্টস সায়েন্স ইনস্টিটিউটগুলো অ্যাথলেটদের বায়োমেকানিক্স, ফিজিওলজি এবং রিকভারি নিয়ে নিবিড় গবেষণা করে, যা তাদের পারফরম্যান্সকে সূক্ষ্মভাবে উন্নত করতে সাহায্য করে। বাংলাদেশে এই ধরনের কোনো সমন্বিত প্রতিষ্ঠান নেই। এমনকি অ্যাথলেটদের জন্য মানসম্মত আবাসিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং পুষ্টিকর খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও ঘাটতি রয়েছে। বাংলাদেশ অ্যাথলেটিক্স ফেডারেশন প্রায়শই বিদেশি কোচের প্রয়োজনীয়তার কথা বললেও, পর্যাপ্ত তহবিল এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অভাবে তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় না। ফলে, প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও অনেক অ্যাথলেট সঠিক দিকনির্দেশনা ও সুযোগের অভাবে আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছাতে পারে না।

সূচক ২০২০-২১ অর্থবছর ২০২১-২২ অর্থবছর ২০২২-২৩ অর্থবছর ২০২৩-২৪ অর্থবছর (প্রস্তাবিত)
যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের বাজেট (কোটি টাকা) ১১২৬.০২ ১১৪৮.৮৫ ১১৮০.৯৯ ১২২৯.০০
মোট বাজেটে ক্রীড়া খাতের অংশ (%) ০.২০ ০.১৯ ০.১৮ ০.১৭
অ্যাথলেটিক্স ফেডারেশনের বার্ষিক বরাদ্দ (আনুমানিক কোটি টাকা) ১.৫০ ১.৬০ ১.৭০ ১.৮০
আন্তর্জাতিক মানের ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ডের সংখ্যা ৩ ৩ ৪ ৪

উৎস: বাংলাদেশ অর্থ মন্ত্রণালয়, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ অ্যাথলেটিক্স ফেডারেশন।

সুপারিশ

  • যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়কে একটি 'জাতীয় ক্রীড়া বিজ্ঞান ও গবেষণা ইনস্টিটিউট' প্রতিষ্ঠা করার জন্য ২০২৫ সালের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি করতে হবে, যেখানে বায়োমেকানিক্স, ফিজিওলজি, স্পোর্টস নিউট্রিশন এবং সাইকোলজির মতো শাখা থাকবে। ওয়ার্ল্ড ব্যাংক বা এডিবি-এর সাথে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে এই ইনস্টিটিউটের জন্য প্রাথমিক তহবিল ও প্রযুক্তিগত সহায়তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিতে হবে।
  • বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক 'জাতীয় ক্রীড়া নীতি ২০২৪' (প্রস্তাবিত) প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে অ্যাথলেটিক্সের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়ন রোডম্যাপ অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এই নীতিতে তৃণমূল পর্যায় থেকে প্রতিভা অন্বেষণ, বিজ্ঞানভিত্তিক প্রশিক্ষণ পদ্ধতি, আন্তর্জাতিক মানের কোচ নিয়োগ এবং অ্যাথলেটদের জন্য আর্থিক প্রণোদনার সুনির্দিষ্ট বিধান থাকতে হবে।
  • বাংলাদেশ অ্যাথলেটিক্স ফেডারেশনকে দেশের সকল বিভাগীয় শহরে কমপক্ষে একটি করে আন্তর্জাতিক মানের ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ড কমপ্লেক্স নির্মাণের জন্য একটি 'অ্যাথলেটিক্স অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প' হাতে নিতে হবে, যার জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে প্রতি বছর বাজেট থেকে সুনির্দিষ্ট বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে এবং বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার জন্য বিশেষ কর সুবিধা প্রদানের আইন প্রণয়ন করতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: রায়হান রশীদ

রায়হান রশীদ 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: অলিম্পিক ও আন্তর্জাতিক অ্যাথলেটিক্স। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Không có bình luận nào được tìm thấy


News Card Generator