কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় আইন প্রয়োগের দুর্বলতা: শ্রমিক অধিকার কি আজও অধরা? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় আইন প্রয়োগের দুর্বলতা: শ্রমিক অধিকার কি আজও অধরা?

অ্যাডভোকেট তানিয়া  avatar   
অ্যাডভোকেট তানিয়া
কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় আইন প্রয়োগের দুর্বলতা: শ্রমিক অধিকার কি আজও অধরা?
কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় আইন প্রয়োগের দুর্বলতা: শ্রমিক অধিকার কি আজও অধরা?
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, পোশাক শিল্পের একটি শীর্ষস্থানীয় কারখানায় এক শ্রমিকের আত্মহত্যার ঘটনা এবং তার পরপরই বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অফ লেবার স্টাডিজ (BILS)-এর একটি গবেষণা প্র...

সম্প্রতি, পোশাক শিল্পের একটি শীর্ষস্থানীয় কারখানায় এক শ্রমিকের আত্মহত্যার ঘটনা এবং তার পরপরই বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অফ লেবার স্টাডিজ (BILS)-এর একটি গবেষণা প্রতিবেদনে প্রকাশিত তথ্য, যেখানে দেখা গেছে যে প্রায় ৭০% শ্রমিক কর্মক্ষেত্রে মানসিক চাপের শিকার, কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বিদ্যমান আইন প্রয়োগের দুর্বলতা এবং শ্রমিক অধিকারের প্রশ্নটিকে নতুন করে সামনে এনেছে। এই ঘটনা শুধু একটি বিচ্ছিন্ন চিত্র নয়, বরং দেশের বৃহৎ শ্রমশক্তির একটি গভীরতর সংকটকে নির্দেশ করে, যেখানে শারীরিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি আজও বহুলাংশে উপেক্ষিত। শ্রম আইন ২০০৬ (সংশোধিত ২০১৮) এবং জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য আইন ২০১৭-এর মতো আইনি কাঠামো থাকা সত্ত্বেও, কর্মক্ষেত্রের বাস্তবতায় এর প্রতিফলন কতটা, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য একটি জটিল বিষয়, যা উৎপাদনশীলতা, শ্রমিক কল্যাণ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে সরাসরি প্রভাব ফেলে। কর্মঘণ্টার চাপ, পারিশ্রমিকের অপর্যাপ্ততা, কর্মপরিবেশের অস্বাস্থ্যকর দিক, এবং সহকর্মী বা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন - এই সবগুলিই মানসিক চাপ সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIMH)-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর প্রায় ১৬.১% কোনো না কোনো মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন, যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ কর্মজীবীরা। অথচ, শ্রম আইন ২০০৬-এর ধারা ৪৬ এবং ৪৭-এ কর্মপরিবেশের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা বলা হলেও, মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার সুস্পষ্ট ও কার্যকর বিধান অনুপস্থিত। যদিও জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য আইন ২০১৭ মানসিক স্বাস্থ্য সেবাকে একটি মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং মানসিক অসুস্থতার শিকার ব্যক্তিদের প্রতি বৈষম্য নিষিদ্ধ করেছে, কিন্তু কর্মক্ষেত্রে এর প্রয়োগের জন্য সুনির্দিষ্ট বিধিমালা বা নির্দেশিকা এখনও তৈরি হয়নি। এর ফলে, নিয়োগকর্তাদের উপর মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার দায়িত্ব পালনের জন্য কোনো স্পষ্ট বাধ্যবাধকতা তৈরি হচ্ছে না, যা শ্রমিকদের মানসিক স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে ফেলছে।

আইন প্রয়োগের এই দুর্বলতা কেবল আইনি কাঠামোর অভাব নয়, বরং সচেতনতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতারও অভাবকে নির্দেশ করে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) মানসিক স্বাস্থ্য সেবার প্রসারে কাজ করলেও, কর্মক্ষেত্রে এর সম্প্রসারণে সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি সীমিত। শিল্প সম্পর্ক অধিদপ্তর (DIFE) এবং কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (DIFE)-এর পরিদর্শকরা সাধারণত শারীরিক নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যবিধি পরিদর্শনে সীমাবদ্ধ থাকেন। মানসিক স্বাস্থ্য পরিদর্শনের জন্য তাদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ বা ক্ষমতা নেই। ফলস্বরূপ, কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্যগত সমস্যাগুলো প্রায়শই অনাবিষ্কৃত থেকে যায় এবং শ্রমিকরা প্রয়োজনীয় সহায়তা থেকে বঞ্চিত হন। উদাহরণস্বরূপ, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA) মানসিক স্বাস্থ্য চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় ঔষধের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করলেও, কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য পরিচর্যার জন্য প্রাথমিক স্ক্রিনিং, কাউন্সেলিং বা রেফারেল ব্যবস্থার অভাব শ্রমিকদের জন্য প্রতিকূল পরিস্থিতি তৈরি করে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার গুরুত্ব বারবার তুলে ধরলেও, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। ইনস্টিটিউট অফ এপিডেমিওলজি, ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড রিসার্চ (IEDCR) বিভিন্ন রোগের প্রাদুর্ভাব নিয়ে কাজ করলেও, কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য সংকটের ডেটা সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ তাদের অগ্রাধিকারের তালিকায় সেভাবে আসেনি, যা নীতি প্রণয়নের জন্য অপরিহার্য।

সূচক ২০১৮ ২০১৯ ২০২০ ২০২১ ২০২২
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIMH) থেকে কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তার জন্য রেফারেল (শতাংশ) ০.২% ০.৩% ০.৫% ০.৬% ০.৭%
শ্রমিকদের মধ্যে মানসিক চাপ/ক্লান্তির কারণে কর্মদিবস হারানো (আনুমানিক) ১.৫ মিলিয়ন ১.৭ মিলিয়ন ২.১ মিলিয়ন ২.৫ মিলিয়ন ২.৮ মিলিয়ন
কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (DIFE) কর্তৃক মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কিত নির্দেশিকা জারি ০ ০ ০ ১ (প্রাথমিক) ০
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) এর অধীনে কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য কর্মসূচির জন্য বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি (শতাংশ) - - ৫% ৩% ৪%

উৎস: জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIMH), শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) থেকে সংগৃহীত ডেটার উপর ভিত্তি করে আনুমানিক হিসাব।

সুপারিশ

  • শ্রম আইন ২০০৬ (সংশোধিত ২০১৮)-এর ধারা ৪৬ এবং ৪৭-এর সাথে সামঞ্জস্য রেখে কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য সুনির্দিষ্ট বিধিমালা তৈরি করা এবং কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (DIFE)-কে এর কার্যকর প্রয়োগের জন্য প্রশিক্ষিত জনবল ও ক্ষমতা প্রদান করা। এই বিধিতে নিয়োগকর্তাদের জন্য বাধ্যতামূলকভাবে মানসিক স্বাস্থ্য মূল্যায়ন, কাউন্সেলিং সেবা এবং মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তার জন্য রেফারেল সিস্টেম অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে।
  • জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য আইন ২০১৭-এর অধীনে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS)-কে যৌথভাবে কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত একটি জাতীয় কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে কর্মজীবীদের জন্য প্রাথমিক মানসিক স্বাস্থ্য স্ক্রিনিং, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ মেন্টাল হেলথ (NIMH)-এর মাধ্যমে বিশেষায়িত সহায়তা প্রাপ্তির সুযোগ থাকবে।
  • ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA)-কে মানসিক স্বাস্থ্য চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় ঔষধের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি, কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ঔষধ ও অন্যান্য চিকিৎসা সামগ্রীর মান নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নির্দেশিকা জারি করতে হবে, যাতে কার্যকর ও নিরাপদ সেবা নিশ্চিত করা যায়।

✍️ নিবন্ধ লেখক: অ্যাডভোকেট তানিয়া

অ্যাডভোকেট তানিয়া 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য ও শ্রম আইন। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

לא נמצאו הערות


News Card Generator