নেপথ্যের প্রতিযোগিতা: গ্লোবাল স্কলারশিপে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের পিছিয়ে থাকার কারণ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

নেপথ্যের প্রতিযোগিতা: গ্লোবাল স্কলারশিপে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের পিছিয়ে থাকার কারণ

সাবরিনা চৌধুরী  avatar   
সাবরিনা চৌধুরী
নেপথ্যের প্রতিযোগিতা: গ্লোবাল স্কলারশিপে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের পিছিয়ে থাকার কারণ
নেপথ্যের প্রতিযোগিতা: গ্লোবাল স্কলারশিপে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের পিছিয়ে থাকার কারণ
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি প্রকাশিত UNESCO-র 'Global Flow of Tertiary-Level Students' রিপোর্ট ২০২২ অনুযায়ী, উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থা...

সম্প্রতি প্রকাশিত UNESCO-র 'Global Flow of Tertiary-Level Students' রিপোর্ট ২০২২ অনুযায়ী, উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় এখনও বেশ পিছিয়ে। যেখানে ভারত, পাকিস্তান, এমনকি নেপালের শিক্ষার্থীদের বৈশ্বিক স্কলারশিপ প্রাপ্তির হার ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য এই সুযোগগুলো অধরা হয়েই থাকছে। এই প্রতিবেদনটি আমাদের জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থায় বিদ্যমান কিছু মৌলিক দুর্বলতার দিকে আঙুল তোলে, যা বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় আমাদের শিক্ষার্থীদের পিছিয়ে রাখছে। গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের স্কলারশিপ প্রাপ্তির হার, বিশেষ করে STEM (বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত) বিষয়ক উচ্চশিক্ষায়, পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম, যা দেশের ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান ও উদ্ভাবনী ক্ষমতার উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

এই পিছিয়ে পড়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা ও প্রকাশনার অভাব। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পাঠ্যক্রম এবং গবেষণা পদ্ধতি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সাথে অনেক ক্ষেত্রেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ইউজিসি (University Grants Commission) কর্তৃক প্রণীত গবেষণা নীতিমালায় আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশনার উপর জোর দেওয়া হলেও, তহবিল স্বল্পতা এবং প্রয়োজনীয় গবেষণাগার সুবিধার অভাবে অনেক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানই এই লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে। ফলস্বরূপ, শিক্ষার্থীরা মানসম্মত গবেষণা প্রস্তাবনা তৈরি করতে পারছে না, যা বৈশ্বিক স্কলারশিপ আবেদনে তাদের দুর্বল করে তুলছে। অনেক আন্তর্জাতিক স্কলারশিপের জন্য আবেদনকারীকে গবেষণা অভিজ্ঞতা এবং প্রকাশনা থাকতে হয়, যা আমাদের শিক্ষার্থীরা পর্যাপ্ত পরিমাণে দেখাতে পারে না। এছাড়া, ইংরেজি ভাষার দক্ষতাও একটি বড় বাধা। IELTS বা TOEFL-এর মতো আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ভাষা পরীক্ষায় ভালো স্কোর করতে না পারার কারণে অনেক সম্ভাবনাময় শিক্ষার্থী তাদের যোগ্যতা প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়, এমনকি তাদের একাডেমিক ফলাফল ভালো হলেও।

শিক্ষার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত তথ্য ও পরামর্শ সেবার অভাবও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবন্ধকতা। শিক্ষা মন্ত্রণালয় বা এর অধীনস্থ কোনো নির্দিষ্ট বিভাগ থেকে গ্লোবাল স্কলারশিপ সম্পর্কিত তথ্য ও আবেদনের প্রক্রিয়া নিয়ে সমন্বিত ও নিয়মিত প্রচারণার অভাব রয়েছে। NSDA (National Skills Development Authority) মূলত কারিগরি ও বৃত্তিমূলক দক্ষতার উপর জোর দিলেও, উচ্চশিক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক স্কলারশিপ বিষয়ক নির্দেশনা প্রদানে তাদের ভূমিকা সীমিত। কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর যদিও দেশের কারিগরি শিক্ষার মানোন্নয়নে কাজ করছে, কিন্তু তাদের আওতার বাইরে থাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক স্কলারশিপের সুযোগ সম্পর্কে অবগত করার কোনো সুনির্দিষ্ট উদ্যোগ নেই। অনেক শিক্ষার্থী স্কলারশিপের সুযোগ সম্পর্কে জানে না, বা জানলেও আবেদন প্রক্রিয়ার জটিলতা ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহে পর্যাপ্ত দিকনির্দেশনা পায় না, যার ফলে তারা শুরুতেই পিছিয়ে পড়ে।

বছর বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য যাওয়া বাংলাদেশি শিক্ষার্থী (আনুমানিক) বৈশ্বিক স্কলারশিপ প্রাপ্তি হার (আনুমানিক) দক্ষিণ এশিয়ার গড় স্কলারশিপ প্রাপ্তি হার (আনুমানিক)
২০১৮ ৪৫,০০০ ৫% ১০%
২০১৯ ৫০,০০০ ৫.৫% ১১%
২০২০ ৪০,০০০ (মহামারীর কারণে হ্রাস) ৪% ৮%
২০২১ ৫২,০০০ ৬% ১২%
২০২২ ৬০,০০০ ৬.৫% ১৩%

উৎস: UNESCO Global Flow of Tertiary-Level Students রিপোর্ট এবং IIE Open Doors রিপোর্ট-এর সম্মিলিত পর্যালোচনা ও BANBEIS পরিসংখ্যান।

সুপারিশ

  • শিক্ষা মন্ত্রণালয় একটি 'আন্তর্জাতিক স্কলারশিপ ও উচ্চশিক্ষা বিষয়ক জাতীয় টাস্কফোর্স' গঠন করবে, যা সারা দেশের শিক্ষার্থীদের জন্য স্কলারশিপের তথ্য সংগ্রহ, প্রচার এবং আবেদন প্রক্রিয়ায় সার্বিক সহায়তা প্রদানের জন্য একটি কেন্দ্রীয় পোর্টাল ও পরামর্শ কেন্দ্র স্থাপন করবে। এই টাস্কফোর্স ইউজিসি ও কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের সাথে সমন্বয় করে পাঠ্যক্রমের আন্তর্জাতিকীকরণ এবং ভাষা দক্ষতার মানোন্নয়নে কাজ করবে।
  • ইউজিসি-কে তাদের গবেষণা বাজেট উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করতে হবে এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশনার জন্য আর্থিক প্রণোদনা ও প্রয়োজনীয় গবেষণাগার সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। 'বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন আইন, ১৯৭৩' এর অধীনে গবেষণা ও উচ্চশিক্ষা সংক্রান্ত নীতিমালা সংশোধন করে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডকে অগ্রাধিকার দিতে হবে এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের জন্য আন্তর্জাতিক গবেষণামূলক প্রকল্পে অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করতে হবে।
  • NSDA-কে তাদের আওতা বাড়িয়ে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক স্কলারশিপ বিষয়ক দক্ষতা ও পরামর্শ প্রদানের জন্য বিশেষায়িত প্রোগ্রাম চালু করতে হবে। 'জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আইন, ২০১৮' এর ধারা ৯(ঙ) অনুযায়ী দক্ষতা উন্নয়নের পাশাপাশি উচ্চশিক্ষার আন্তর্জাতিকীকরণেও NSDA-র ভূমিকা স্পষ্ট করতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা কেবল কারিগরি শিক্ষায় নয়, গ্লোবাল স্কলারশিপের ক্ষেত্রেও প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা পায়।

✍️ নিবন্ধ লেখক: সাবরিনা চৌধুরী

সাবরিনা চৌধুরী 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: গ্লোবাল স্কলারশিপ ও উচ্চশিক্ষা। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator