ডিজিটাল পণ্যের বাজার: নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সম্ভাবনার নতুন দুয়ার খুলছে? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

ডিজিটাল পণ্যের বাজার: নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সম্ভাবনার নতুন দুয়ার খুলছে?

রেহানা পারভীন  avatar   
রেহানা পারভীন
ডিজিটাল পণ্যের বাজার: নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সম্ভাবনার নতুন দুয়ার খুলছে?
ডিজিটাল পণ্যের বাজার: নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সম্ভাবনার নতুন দুয়ার খুলছে?
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) কর্তৃক প্রকাশিত 'জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন নীতি ২০২০-এর বাস্তবায়ন অগ্রগতি' শীর্ষক প্রতিবেদনে নারী উদ্যোক্তাদের জ...

সম্প্রতি জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) কর্তৃক প্রকাশিত 'জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন নীতি ২০২০-এর বাস্তবায়ন অগ্রগতি' শীর্ষক প্রতিবেদনে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ডিজিটাল দক্ষতা বৃদ্ধিতে বিশেষ গুরুত্বারোপের বিষয়টি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের মধ্যে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নারী উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ ২০% বৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা প্রচলিত বাজারের সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে তাদের জন্য অবারিত সুযোগ সৃষ্টি করছে। বিশেষত, কোভিড-১৯ পরবর্তী সময়ে যখন অনলাইন কার্যকলাপ বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে, তখন ডিজিটাল পণ্যের বাজার নারী উদ্যোক্তাদের জন্য কেবল একটি বিকল্প পথ নয়, বরং একটি প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে। পণ্য বা সেবা উৎপাদন, বিপণন এবং বিতরণ প্রক্রিয়ার সম্পূর্ণ ডিজিটালাইজেশন নারী উদ্যোক্তাদের ভৌগোলিক বাধা অতিক্রম করে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশাধিকার দিচ্ছে, যা তাদের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা এবং সামাজিক ক্ষমতায়নে অভূতপূর্ব ভূমিকা রাখছে। এই পরিবর্তনশীল প্রেক্ষাপটে, প্রথাগত নারী উদ্যোক্তাদের ডিজিটাল দক্ষতা অর্জনে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত প্রচেষ্টা এক অত্যাবশ্যকীয় পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ডিজিটাল পণ্যের বাজার সম্ভাবনার নতুন দুয়ার খুলছে মূলত দুটি প্রধান কারণে: প্রথমত, প্রযুক্তির সহজলভ্যতা এবং দ্বিতীয়ত, সরকারি নীতিগত সহায়তা। বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (BANBEIS) এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর প্রায় ৪২% নারী, যা ২০১৮ সালের তুলনায় প্রায় ১৫% বেশি। এই পরিসংখ্যান নির্দেশ করে যে, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নারীদের প্রবেশাধিকার এবং অংশগ্রহণ ক্রমশ বাড়ছে। এই ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল উপস্থিতি তাদের জন্য ই-কমার্স, ফ্রিল্যান্সিং, ডিজিটাল মার্কেটিং, গ্রাফিক ডিজাইন, কন্টেন্ট ক্রিয়েশন এবং সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্টের মতো ডিজিটাল পণ্য ও সেবার বাজারে প্রবেশ করা সহজ করে তুলেছে। পূর্বে যেখানে নারী উদ্যোক্তাদের ভৌত দোকান বা শোরুমের জন্য উচ্চ বিনিয়োগ এবং নানা সামাজিক বাধার সম্মুখীন হতে হতো, সেখানে একটি ল্যাপটপ বা স্মার্টফোন ব্যবহার করে ঘরে বসেই তারা তাদের পণ্য বা সেবা বিশ্বব্যাপী গ্রাহকদের কাছে পৌঁছে দিতে পারছেন। এর ফলে পুঁজির অপ্রতুলতা এবং চলাচলের সীমাবদ্ধতা অনেকাংশে হ্রাস পেয়েছে, যা নারী উদ্যোক্তা সৃষ্টির হার বৃদ্ধিতে সহায়ক হচ্ছে। বিশেষ করে, গ্রামীণ নারীরাও এখন অনলাইনে তাদের ঐতিহ্যবাহী পণ্য যেমন হস্তশিল্প, নকশি কাঁথা, পিঠা-পুলি ইত্যাদি বিক্রি করে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছেন, যা তাদের পরিবার ও স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

এই সম্ভাবনার পথকে আরও সুগম করতে সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC) দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে নারী শিক্ষার্থীদের জন্য তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর কোর্স ও প্রশিক্ষণের সুযোগ বৃদ্ধি করার উপর জোর দিচ্ছে। কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর (DTE) এবং Skills for Employment Investment Program (SEIP) যৌথভাবে নারী শিক্ষার্থীদের জন্য বিভিন্ন বৃত্তিমূলক এবং কারিগরি প্রশিক্ষণের আয়োজন করছে, যেখানে ডিজিটাল মার্কেটিং, ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, ডেটা এন্ট্রি এবং গ্রাফিক ডিজাইনের মতো উচ্চ-চাহিদাসম্পন্ন দক্ষতা শেখানো হচ্ছে। SEIP প্রকল্পের অধীনে ইতোমধ্যে প্রায় ১.৫ লক্ষ নারীকে বিভিন্ন ট্রেডে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে, যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ডিজিটাল দক্ষতা অর্জনে সক্ষম হয়েছে। এই প্রশিক্ষণগুলো শুধুমাত্র কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করছে না, বরং অনেক নারীকে নিজেদের ডিজিটাল উদ্যোগ শুরু করতেও উৎসাহিত করছে। উদাহরণস্বরূপ, SEIP-এর মাধ্যমে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত অনেক নারী এখন সফলভাবে নিজেদের অনলাইন ব্যবসা পরিচালনা করছেন, যা তাদের নিজস্ব অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি অন্যদের জন্যও অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করছে। এই ধরনের সমন্বিত উদ্যোগগুলো নারী উদ্যোক্তাদের ডিজিটাল বাজারে প্রবেশ এবং টিকে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও সরঞ্জাম সরবরাহ করছে, যা ভবিষ্যতে তাদের জন্য আরও বৃহৎ পরিসরে কাজ করার পথ খুলে দেবে। এর ফলে কেবল ব্যক্তিগত অর্থনৈতিক উন্নতি নয়, বরং জাতীয় অর্থনীতিতেও নারীদের অবদান উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে, যা ২০৪১ সালের মধ্যে স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক হবে।

প্রতিষ্ঠানের নাম নারী উদ্যোক্তা/প্রশিক্ষণার্থীর সংখ্যা (২০২৩) লক্ষ্যমাত্রা (২০২৫) ডিজিটাল দক্ষতা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নারী (%)
জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) ১,২০,০০০ ২,০০,০০০ ৬০%
কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর (DTE) ৯৬,৫০০ ১,৫০,০০০ ৬৫%
Skills for Employment Investment Program (SEIP) ১,৫০,০০০ ২,৫০,০০০ ৭০%
বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (BANBEIS) (ইন্টারনেট ব্যবহারকারী নারী) ৪২% (ইন্টারনেট ব্যবহারকারী নারী) ৫০% প্রযোজ্য নয়

উৎস: NSDA, DTE, SEIP এবং BANBEIS-এর বার্ষিক প্রতিবেদন (২০২৩)

সুপারিশ

  • জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) এর অধীনে একটি বিশেষ 'নারী উদ্যোক্তা ডিজিটাল ইনকিউবেশন সেন্টার' প্রতিষ্ঠা করা হোক, যা নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিনামূল্যে ডিজিটাল টুলস, মেন্টরশিপ এবং প্রাথমিক বাজার সংযোগের সুবিধা দেবে।
  • কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর (DTE) এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC) যৌথভাবে প্রতিটি জেলায় নারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে 'ডিজিটাল মার্কেটিং এবং ই-কমার্স' বিষয়ে বাধ্যতামূলক সার্টিফিকেট কোর্স চালু করুক, যা জাতীয় পাঠ্যক্রমের অংশ হিসেবে বিবেচিত হবে।
  • Skills for Employment Investment Program (SEIP) এর আওতায় নারী উদ্যোক্তাদের জন্য 'উন্নত ডেটা অ্যানালিটিক্স এবং আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স' বিষয়ক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করা হোক, যা তাদের ডিজিটাল পণ্যের গুণগত মান এবং বাজার চাহিদা বিশ্লেষণে সহায়তা করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: রেহানা পারভীন

রেহানা পারভীন 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: নারী উদ্যোক্তা ও ক্ষমতায়ন। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

कोई टिप्पणी नहीं मिली


News Card Generator