সম্প্রতি, বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্যানুসারে, ২০২৩ সালের ডিসেম্বর শেষে দেশের ব্যাংক খাতের মোট খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪৫ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা, যা বিতরণকৃত ঋণের ৯.০৯ শতাংশ। এই বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং এর পুনরুদ্ধারে অর্থঋণ আদালতের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষত, অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩ (সংশোধিত ২০১০) এর অধীনে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা এবং নিষ্পত্তির হার বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মামলা জট ও দীর্ঘসূত্রিতা ঋণ পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়াকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অফ ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (BIBM) এর এক সমীক্ষায় উঠে এসেছে যে, অর্থঋণ আদালতে বিচারাধীন মামলাগুলোর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে ঝুলে আছে, যার ফলে একদিকে যেমন ব্যাংকের মূলধন আটকে থাকছে, তেমনি অন্যদিকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই পরিস্থিতি কেবল ব্যাংকগুলোর তারল্য সংকটই তৈরি করছে না, বরং নতুন বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারাকেও শ্লথ করে দিচ্ছে।
খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধারে অর্থঋণ আদালতের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠার অন্যতম প্রধান কারণ হলো আইনি সীমাবদ্ধতা এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার ধীরগতি। বিদ্যমান অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩ অনুযায়ী, মামলা দায়ের থেকে শুরু করে রায় কার্যকর করা পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরে দীর্ঘসূত্রিতার সুযোগ রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, আপিল করার সুযোগ, বারবার সময় আবেদন, এবং উচ্চ আদালতে মামলা স্থানান্তরের প্রক্রিয়াগুলো প্রায়শই ঋণ খেলাপিদের দ্বারা অপব্যবহার করা হয়, যা মামলার নিষ্পত্তিকে বিলম্বিত করে। এছাড়া, কিছু ক্ষেত্রে, আদালত কর্তৃক জারি করা ডিক্রি কার্যকর করার ক্ষেত্রেও জটিলতা দেখা যায়। অনেক সময় খেলাপিদের নামে পর্যাপ্ত স্থাবর সম্পত্তি না থাকা, বা থাকলেও সেগুলোর প্রকৃত মূল্য নির্ধারণে জটিলতা, এবং নিলাম প্রক্রিয়ায় ক্রেতার অভাবে ডিক্রি কার্যকর করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। সরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে এই সমস্যা আরও প্রকট, কারণ তাদের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ও সংখ্যা বেসরকারি ব্যাংকগুলোর তুলনায় বেশি এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে অনেক সময় আইনি পদক্ষেপ গ্রহণেও বাধার সম্মুখীন হতে হয়। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ এই সমস্যা সমাধানে বিভিন্ন সময়ে পদক্ষেপ নিলেও, আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে ঋণ খেলাপিরা পার পেয়ে যাচ্ছে, যা সামগ্রিকভাবে বিচার ব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতা তৈরি করছে।
অর্থঋণ আদালত আইনের সীমাবদ্ধতা শুধু বিচারিক প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং আইনের কিছু ধারা খেলাপিদের পক্ষে চলে যায়। যেমন, কিছু ক্ষেত্রে ঋণের বিপরীতে প্রদত্ত জামানতের মূল্য কম থাকা বা জামানতের সঠিক মূল্যায়ন না হওয়ার কারণে ব্যাংকগুলো তাদের পাওনা সম্পূর্ণভাবে আদায় করতে পারে না। এছাড়া, একই ঋণ খেলাপি একাধিক ব্যাংকের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে থাকলে এবং প্রতিটি ব্যাংকের মামলা আলাদাভাবে পরিচালিত হলে, তা সামগ্রিক ঋণ পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তোলে। একটি সমন্বিত তথ্যভান্ডার বা একক বিচারিক প্রক্রিয়ার অভাবে বিভিন্ন ব্যাংক একই খেলাপি ঋণগ্রহীতার বিরুদ্ধে ভিন্ন ভিন্ন আদালতে মামলা পরিচালনা করে, যা সম্পদ শনাক্তকরণ ও পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে অদক্ষতা সৃষ্টি করে। ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে মামলার তদারকি এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সরবরাহেও কখনও কখনও দুর্বলতা দেখা যায়, যা বিচারিক প্রক্রিয়ার গতি কমিয়ে দেয়। BB (বাংলাদেশ ব্যাংক) বিভিন্ন সময়ে সার্কুলার জারির মাধ্যমে ব্যাংকগুলোকে খেলাপি ঋণ আদায়ে আরও সক্রিয় হওয়ার নির্দেশ দিলেও, মাঠ পর্যায়ে এর সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন প্রায়শই দেখা যায় না, যা অর্থঋণ আদালতের ওপর চাপ বৃদ্ধি করে এবং সামগ্রিক পুনরুদ্ধারের হারকে নিম্নমুখী রাখে।
| সাল | অর্থঋণ আদালতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা (ডিসেম্বর পর্যন্ত) | পুনরুদ্ধারকৃত অর্থের পরিমাণ (কোটি টাকা) | মোট খেলাপি ঋণের শতাংশ |
|---|---|---|---|
| ২০২১ | ৭২,৩৪০ | ৪,৭২০ | ৮.৩৪% |
| ২০২২ | ৭৪,০৯৯ | ৫,৯১০ | ৯.১৬% |
| ২০২৩ | ৭৫,৮৭৫ | ৬,৮৫০ | ৯.০৯% |
উৎস: বাংলাদেশ ব্যাংক (BB) এবং BIBM এর প্রতিবেদন
সুপারিশ
- অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩ এর ধারা ১৮, ২০ এবং ২১ সংশোধন করে আপিল এবং উচ্চ আদালতে মামলা স্থানান্তরের সুযোগ সীমিত করা এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার সময়সীমা কঠোরভাবে নির্ধারণ করা। একইসাথে, রায় কার্যকর করার জন্য ডিক্রি জারির প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত ও কার্যকর করতে বিদ্যমান বিধিমালা সংশোধন করে বাধ্যতামূলক সময়সীমা অন্তর্ভুক্ত করা, যাতে ডিক্রি প্রাপ্তির পর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সম্পত্তি নিলাম বা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।
- বাংলাদেশ ব্যাংক (BB) এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ কর্তৃক একটি কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার (Central Credit Information Bureau - CIB এর উন্নত সংস্করণ) প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে সকল খেলাপি ঋণগ্রহীতার সম্পূর্ণ তথ্য, তাদের জামানতের বিবরণ এবং বিভিন্ন ব্যাংকে তাদের ঋণের অবস্থা সম্পর্কিত তথ্য রিয়েল-টাইমে উপলব্ধ থাকবে। এটি একই খেলাপি ঋণগ্রহীতার বিরুদ্ধে একাধিক মামলার সমন্বিত নিষ্পত্তিতে সহায়তা করবে এবং সরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকসহ সকল ব্যাংককে দ্রুত সম্পদ শনাক্ত ও পুনরুদ্ধারে সক্ষম করবে।
- অর্থঋণ আদালতের বিচারকদের জন্য বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আয়োজন করা এবং বিচারকের সংখ্যা বৃদ্ধি করা। বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিস কমিশন (BJS) এর মাধ্যমে নিয়মিতভাবে অর্থঋণ আদালতের বিচারক নিয়োগ নিশ্চিত করা এবং BIBM এর সহযোগিতায় ব্যাংক ও আর্থিক খাতের জটিল বিষয়াদি সম্পর্কে বিচারকদের জ্ঞান বৃদ্ধি করা, যাতে তারা দ্রুত ও কার্যকরভাবে মামলা নিষ্পত্তি করতে পারেন এবং আইনি ফাঁকফোকর ব্যবহার করে ঋণ খেলাপিদের সুবিধা নেওয়ার সুযোগ বন্ধ হয়।