জাহাজ ভাঙা শিল্পের বিষাক্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: চ্যালেঞ্জ ও টেকসই সমাধানের খোঁজে | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

জাহাজ ভাঙা শিল্পের বিষাক্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: চ্যালেঞ্জ ও টেকসই সমাধানের খোঁজে

জাহাঙ্গীর আলম  avatar   
জাহাঙ্গীর আলম
জাহাজ ভাঙা শিল্পের বিষাক্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: চ্যালেঞ্জ ও টেকসই সমাধানের খোঁজে
জাহাজ ভাঙা শিল্পের বিষাক্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: চ্যালেঞ্জ ও টেকসই সমাধানের খোঁজে
ছবি: সংগৃহীত
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপকূলে প্রায়শই পুরাতন জাহাজ ভাঙার কার্যক্রম চলমান থাকে, যেখানে গত ২০২৩ সালের শেষ প্রান্তিকে ওয়ার্ল্ড ব্যাংক কর্তৃক প্রকাশিত এক প্রতিব...

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপকূলে প্রায়শই পুরাতন জাহাজ ভাঙার কার্যক্রম চলমান থাকে, যেখানে গত ২০২৩ সালের শেষ প্রান্তিকে ওয়ার্ল্ড ব্যাংক কর্তৃক প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের জাহাজ ভাঙা শিল্পে বিষাক্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং পরিবেশগত ঝুঁকির বিষয়টি পুনরায় সামনে এসেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রতি বছর প্রায় ২.৫ মিলিয়ন টন স্টিল রিকভারি হলেও, এর সাথে আনুমানিক ১.৫ মিলিয়ন টন বিপজ্জনক বর্জ্য যেমন অ্যাসবেস্টস, পলিক্লোরিনেটেড বাইফিনাইলস (PCBs), ভারী ধাতু এবং তেল মিশ্রিত স্ল্যাজ উৎপন্ন হচ্ছে, যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ অপরিশোধিত অবস্থাতেই পরিবেশে মিশে যাচ্ছে। এই বর্জ্য শুধু স্থানীয় জলজ ও স্থলজ প্রতিবেশের ক্ষতি করছে না, বরং শ্রমিকদের স্বাস্থ্যকেও মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলছে। বিশেষ করে, অ্যাসবেস্টস এবং ভারী ধাতুর সংস্পর্শে আসার কারণে দীর্ঘমেয়াদী শ্বাসতন্ত্রের রোগ ও ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ছে, যা দেশের শ্রম আইন এবং আন্তর্জাতিক পরিবেশ চুক্তির স্পষ্ট লঙ্ঘন।

এই শিল্পের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জগুলো বহুমুখী। প্রথমত, পুরাতন জাহাজগুলো আন্তর্জাতিক জলসীমা থেকে আসার সময়ই অ্যাসবেস্টস, তেল, গ্যাস, বিষাক্ত পেইন্ট এবং অন্যান্য বিপজ্জনক রাসায়নিক পদার্থে পূর্ণ থাকে। জাহাজ ভাঙার প্রক্রিয়ায় এই পদার্থগুলো ম্যানুয়ালি বিচ্ছিন্ন করা হয়, যেখানে আধুনিক প্রযুক্তি এবং পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাবে শ্রমিকরা সরাসরি ঝুঁকির মুখে পড়ে। বাংলাদেশ সরকার পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১০) এবং পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা, ১৯৯৯ অনুযায়ী বিপজ্জনক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য কঠোর নির্দেশিকা প্রণয়ন করলেও, মাঠ পর্যায়ে এর বাস্তবায়ন অত্যন্ত দুর্বল। বিশেষ করে, অ্যাসবেস্টসের মতো কার্সিনোজেনিক উপাদানগুলো আলাদাভাবে সংগ্রহ, পরিবহন এবং নিরাপদ নিষ্পত্তির জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও বিনিয়োগের অভাব প্রকট। অনেক ক্ষেত্রে, এসব বর্জ্য সাধারণ বর্জ্যের সাথে মিশে যায় অথবা উন্মুক্ত স্থানে ফেলে দেওয়া হয়, যা স্থানীয় ভূগর্ভস্থ পানি এবং কৃষিজমিকে দূষিত করে।

দ্বিতীয়ত, জাহাজ ভাঙা শিল্পে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য বিনিয়োগের অভাব এবং মনিটরিং ব্যবস্থার দুর্বলতা একটি বড় সমস্যা। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (ADB) এবং বাংলাদেশ সরকারের যৌথ উদ্যোগে বিগত দশকে এই খাতে সবুজ প্রযুক্তি এবং নিরাপদ শ্রম পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য একাধিক প্রকল্প হাতে নেওয়া হলেও, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রকল্পের উদ্দেশ্য পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। উদাহরণস্বরূপ, ‘গ্রিন শিপব্রেকিং ফ্যাসিলিটিস ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট’-এর আওতায় আধুনিক ডকইয়ার্ড এবং বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণ ইউনিট স্থাপনের কথা থাকলেও, অধিকাংশ ইয়ার্ড এখনও সেকেলে পদ্ধতিতেই চলছে। এছাড়া, জাহাজ ভাঙার আগে ক্ষতিকারক পদার্থের ইনভেন্টরি (IHM) যাচাই করার আন্তর্জাতিক নিয়ম ‘হংকং কনভেনশন ফর দ্য সেফ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টালি সাউন্ড রিকভারি অফ শিপস, ২০০৯’ বাংলাদেশ এখনও পুরোপুরি অনুমোদন ও বাস্তবায়ন করতে পারেনি, যা নিরাপদ জাহাজ আমদানির প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করছে। এর ফলে, বর্জ্যরে সঠিক পরিমাণ এবং ধরন সম্পর্কে পূর্ব ধারণা না থাকায় ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনাও অকার্যকর হয়ে পড়ে।

তৃতীয়ত, এই শিল্পে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতার অভাব টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পথে প্রধান অন্তরায়। বাংলাদেশ পরিবেশ অধিদপ্তর (DoE) এবং কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (DIFE) বর্জ্য ব্যবস্থাপনার নিয়মাবলী প্রয়োগের দায়িত্বে থাকলেও, সীমিত জনবল এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে প্রায়শই ব্যর্থ হয়। ওয়ার্ল্ড ব্যাংক তাদের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখিয়েছে যে, জাহাজ ভাঙা ইয়ার্ডগুলোর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ব্যয়কে উৎপাদন ব্যয়ের অংশ হিসেবে বিবেচনা না করে, মুনাফা বৃদ্ধির জন্য এটি এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। এই প্রবণতা কেবল পরিবেশের ক্ষতি করছে না, বরং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের জাহাজ ভাঙা শিল্পের ভাবমূর্তিকেও ক্ষুণ্ণ করছে। একই সাথে, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য ঝুঁকির বিষয়টি প্রায়শই উপেক্ষিত থাকে, যা সামাজিক ন্যায়বিচার ও পরিবেশগত অধিকারের লঙ্ঘন।

বিবরণ ২০২০ ২০২১ ২০২২ ২০২৩ (প্রাক্কলিত)
মোট ভাঙা জাহাজের সংখ্যা (ইউনিট) ১২০ ১৪৫ ১৭০ ১৮৫
পুনরুদ্ধারকৃত ইস্পাত (মিলিয়ন টন) ২.২ ২.৬ ৩.০ ৩.২
উৎপন্ন বিপজ্জনক বর্জ্য (মিলিয়ন টন) ১.৩ ১.৬ ১.৮ ২.০
বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বিনিয়োগ (% মোট রাজস্বের) ০.৮% ০.৯% ১.০% ১.১%
অ্যাসবেস্টস অপসারণের হার (% আনুমানিক) ২০% ২৫% ৩০% ৩৫%

উৎস: ওয়ার্ল্ড ব্যাংক রিপোর্ট (২০২৩), বাংলাদেশ পরিবেশ অধিদপ্তর (DoE) ও শিপব্রেকার্স অ্যাসোসিয়েশন (২০২৩)

সুপারিশ

  • বাংলাদেশ সরকার অবিলম্বে ‘হংকং কনভেনশন ফর দ্য সেফ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টালি সাউন্ড রিকভারি অফ শিপস, ২০০৯’ অনুমোদন ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ প্রণয়ন করুক এবং বাংলাদেশ পরিবেশ অধিদপ্তর (DoE) এর অধীনে একটি বিশেষ মনিটরিং সেল গঠন করে আমদানিকৃত প্রতিটি জাহাজের জন্য বাধ্যতামূলক Hazardous Material Inventory (IHM) যাচাই নিশ্চিত করুক।
  • শিল্প মন্ত্রণালয় এবং অর্থ মন্ত্রণালয় যৌথভাবে জাহাজ ভাঙা শিল্পে বিপজ্জনক বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণের জন্য আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্ল্যান্ট স্থাপন এবং শ্রমিকদের উন্নত প্রশিক্ষণ প্রদানের জন্য বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করুক এবং এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (ADB) এর সহযোগিতায় একটি "গ্রিন শিপব্রেকিং ফান্ড" প্রতিষ্ঠা করে ছোট ও মাঝারি ইয়ার্ডগুলোকে প্রযুক্তিগত upgrade-এর জন্য সহজ শর্তে ঋণ প্রদান করুক।
  • কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (DIFE) এবং শ্রম মন্ত্রণালয় শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ (সংশোধিত ২০১৮) এর ধারা ৫৬ (ঝুঁকিপূর্ণ কাজ ও প্রতিরোধ ব্যবস্থা) এবং ধারা ৬২ (ব্যক্তিগত সুরক্ষামূলক সরঞ্জাম) কঠোরভাবে প্রয়োগ করুক এবং প্রতিটি ইয়ার্ডে বাধ্যতামূলকভাবে স্বাস্থ্য পরীক্ষা, বীমা এবং অ্যাসবেস্টসসহ অন্যান্য বিপজ্জনক বর্জ্য পরিচালনার জন্য আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন সুরক্ষা সরঞ্জাম নিশ্চিত করুক।

✍️ নিবন্ধ লেখক: জাহাঙ্গীর আলম

জাহাঙ্গীর আলম 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: শিপবিল্ডিং ও জাহাজ ভাঙা শিল্প। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Inga kommentarer hittades


News Card Generator