নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ও জনআস্থা সংকট: জবাবদিহিতার পথ কোথায়? | আই নিউজ বিডি

নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ও জনআস্থা সংকট: জবাবদিহিতার পথ কোথায়?

ড. তৌফিক এলাহী  avatar   
ড. তৌফিক এলাহী
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ও জনআস্থা সংকট: জবাবদিহিতার পথ কোথায়?
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ও জনআস্থা সংকট: জবাবদিহিতার পথ কোথায়?
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর এক গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, গত তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর ঘোষিত প্রায় ...

সম্প্রতি ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর এক গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, গত তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর ঘোষিত প্রায় ৭০% নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ঘাটতি রয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে জনআস্থার ওপর। এই পরিসংখ্যান কেবল একটি সংখ্যা নয়, বরং এটি গণতন্ত্রের মৌলিক ভিত্তি – নাগরিক ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার মধ্যে বিশ্বাস – ক্ষয়ের এক গভীর ইঙ্গিত বহন করে। বিশেষ করে, সুশাসন ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকারগুলো প্রায়শই বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকে, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার প্রতি এক ধরনের অনাস্থা তৈরি করছে।

এই জনআস্থা সংকটের মূল কারণ নিহিত রয়েছে নির্বাচনী অঙ্গীকারের দুর্বল তদারকি প্রক্রিয়া এবং নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহিতার অভাবের মধ্যে। রাজনৈতিক দলগুলো ভোটের আগে যে সুদূরপ্রসারী প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি ছড়ায়, তার অধিকাংশই থাকে অস্পষ্ট এবং পরিমাপযোগ্য নয়। উদাহরণস্বরূপ, ‘দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়া’ বা ‘সুশাসন নিশ্চিত করা’—এ ধরনের অঙ্গীকারের কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা বা সময়সীমা না থাকায়, পরবর্তীতে এর বাস্তবায়ন পরিমাপ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এর ফলে, নির্বাচিত হওয়ার পর এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকলেও, জবাবদিহিতা চাওয়ার কোনো সুস্পষ্ট কাঠামো থাকে না। এই শূন্যতা নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণের সুযোগকে সীমিত করে এবং সরকারের স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতার প্রশ্নকে আরও জটিল করে তোলে।

আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর পর্যবেক্ষণও এই জনআস্থা সংকটের প্রতিধ্বনি করে। ওয়ার্ল্ড ব্যাংক (World Bank) এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB)-এর বিভিন্ন প্রতিবেদনে বাংলাদেশের শাসনতান্ত্রিক দুর্বলতা, বিশেষ করে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থার অভাবের দিকে বারবার ইঙ্গিত করা হয়েছে। ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের 'গভর্নেন্স ইন্ডিকেটরস' (Worldwide Governance Indicators) ডেটাতে বাংলাদেশের 'ভয়েস অ্যান্ড অ্যাকাউন্টিবিলিটি' এবং 'কন্ট্রোল অব করাপশন' সূচকগুলো প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় অনেক সময় নিম্নমুখী প্রবণতা দেখায়, যা জনগণের অংশগ্রহণের সুযোগ এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার অভাবকে তুলে ধরে। একইভাবে, এডিবি তার 'কান্ট্রি পার্টনারশিপ স্ট্র্যাটেজি' ডকুমেন্টে সুশাসনকে বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করে এবং জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা বৃদ্ধির উপর জোর দেয়। এই আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণগুলো শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যার চিত্রই তুলে ধরে না, বরং বিশ্ব মঞ্চে বাংলাদেশের ভাবমূর্তির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ও জনআস্থা সংকটের সমাধানে বাংলাদেশ সরকার এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রায়শই দেখা যায়, সরকার গঠনের পর নির্বাচনী ইশতেহারকে কেবল একটি রাজনৈতিক দলিল হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যা প্রশাসনিক পরিকল্পনা বা বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে খুব কমই প্রতিফলিত হয়। অর্থ মন্ত্রণালয় এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সহ অন্যান্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর উচিত নির্বাচনী অঙ্গীকারগুলোকে তাদের নীতি ও কর্মসূচির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা। বর্তমানে, নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের অগ্রগতি পরিমাপের জন্য কোনো স্বাধীন ও শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নেই। এছাড়া, তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯ (Right to Information Act, 2009) থাকা সত্ত্বেও, অনেক সময় সরকারি তথ্য প্রাপ্তিতে নাগরিকদের বেগ পেতে হয়, যা জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠায় অন্যতম বাধা। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য, শুধুমাত্র আইন প্রণয়ন করাই যথেষ্ট নয়, বরং আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে একটি সুনির্দিষ্ট ও জবাবদিহিমূলক প্রক্রিয়া প্রতিষ্ঠা করা অপরিহার্য।

বছর নির্বাচনী ইশতেহারে সুশাসনের প্রতিশ্রুতি (সংখ্যা) বাস্তবায়নের অগ্রগতি (গড় শতাংশ) জনগণের আস্থার স্তর (১-৫ স্কেল, ৫ সর্বোচ্চ)
২০০৮ ২৫ ৪৫% ৩.৫
২০১৪ ৩০ ৩৫% ২.৮
২০১৮ ৩২ ৩০% ২.২

উৎস: ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ও বিভিন্ন জনমত জরিপের সমন্বিত বিশ্লেষণ।

সুপারিশ

  • নির্বাচনী ইশতেহারকে আইনি বাধ্যবাধকতার আওতায় আনা: গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২ (Representation of the People Order, 1972) সংশোধন করে নির্বাচনী ইশতেহারকে একটি আইনি বাধ্যবাধকতার দলিল হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে, যেখানে প্রতিটি প্রতিশ্রুতির জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা ও বাস্তবায়ন সূচক উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক হবে এবং এর ব্যত্যয়ে জবাবদিহিতার বিধান থাকবে।
  • স্বাধীন তদারকি কমিশন গঠন: বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন-এর অধীনে অথবা একটি স্বতন্ত্র 'প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন ও তদারকি কমিশন' গঠন করতে হবে, যা নিয়মিত বিরতিতে রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারের বাস্তবায়ন অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করবে এবং জনসম্মুখে প্রতিবেদন প্রকাশ করবে। এই কমিশনকে তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯-এর অধীনে পর্যাপ্ত ক্ষমতা প্রদান করতে হবে।
  • পার্লামেন্টারি ওভারসাইট কমিটি সক্রিয়করণ: জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধিমালা সংশোধন করে প্রতিটি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিকে নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমের সমন্বয় ও বাস্তবায়ন তদারকির জন্য সুস্পষ্ট ক্ষমতা ও ম্যান্ডেট প্রদান করতে হবে, যাতে তারা নিয়মিতভাবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে পারে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ড. তৌফিক এলাহী

ড. তৌফিক এলাহী 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: নির্বাচন, ট্রাস্ট ও রাজনৈতিক স্বচ্ছতা। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Nenhum comentário encontrado


News Card Generator