ব্লু ফ্ল্যাগ সনদ: পর্যটন শিল্পের নতুন দিগন্ত নাকি পরিবেশ সুরক্ষার ফাঁকি? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

ব্লু ফ্ল্যাগ সনদ: পর্যটন শিল্পের নতুন দিগন্ত নাকি পরিবেশ সুরক্ষার ফাঁকি?

মেহেদী পারভেজ  avatar   
মেহেদী পারভেজ
ব্লু ফ্ল্যাগ সনদ: পর্যটন শিল্পের নতুন দিগন্ত নাকি পরিবেশ সুরক্ষার ফাঁকি?
ব্লু ফ্ল্যাগ সনদ: পর্যটন শিল্পের নতুন দিগন্ত নাকি পরিবেশ সুরক্ষার ফাঁকি?
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি কক্সবাজারের লাবণী পয়েন্ট এবং ইনানী সৈকতে ব্লু ফ্ল্যাগ সনদ প্রাপ্তির লক্ষ্যে বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশন (BPC) এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্...

সম্প্রতি কক্সবাজারের লাবণী পয়েন্ট এবং ইনানী সৈকতে ব্লু ফ্ল্যাগ সনদ প্রাপ্তির লক্ষ্যে বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশন (BPC) এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত সম্ভাব্যতা যাচাই কার্যক্রমটি দেশব্যাপী পর্যটন মহলে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে, ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (WEF) ২০২৩ সালের ভ্রমণ ও পর্যটন উন্নয়ন সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ৯৯তম হওয়ায়, যেখানে দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশই এগিয়ে, তখন এই ধরনের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অর্জনের প্রচেষ্টা এক নতুন আশার সঞ্চার করেছে। তবে, এই সনদ কেবল পর্যটকদের আকৃষ্ট করার একটি উপায় নাকি সত্যিই টেকসই পরিবেশবান্ধব পর্যটন নিশ্চিত করবে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কারণ, ব্লু ফ্ল্যাগ সনদের কঠোর মানদণ্ড পূরণে অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং নিয়মিত পরিবেশ পর্যবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলো উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

ব্লু ফ্ল্যাগ সনদ হলো ডেনমার্ক-ভিত্তিক ফাউন্ডেশন ফর এনভায়রনমেন্টাল এডুকেশন (FEE) কর্তৃক প্রদত্ত একটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, যা সমুদ্র সৈকত, মেরিনা এবং টেকসই বোট ট্যুরিজম অপারেটরদের পরিবেশগত মান, নিরাপত্তা ও অ্যাক্সেসিবিলিটির উচ্চ মানদণ্ড বজায় রাখার জন্য পুরস্কৃত করে। এই সনদের জন্য মোট ৩৩টি কঠোর মানদণ্ড পূরণ করতে হয়, যার মধ্যে রয়েছে পানির গুণমান, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা, পরিবেশগত শিক্ষা, নিরাপত্তা পরিষেবা এবং প্রবেশাধিকার। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে, বিশেষ করে কক্সবাজারের মতো জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্রগুলিতে যেখানে প্রতিদিন হাজার হাজার পর্যটকের সমাগম ঘটে, সেখানে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট এবং প্লাস্টিক দূষণ একটি বড় সমস্যা। ২০২১ সালের এক সমীক্ষা অনুযায়ী, কক্সবাজার সৈকতে দৈনিক প্রায় ৩০০ টন কঠিন বর্জ্য উৎপন্ন হয়, যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ সরাসরি সমুদ্রে পতিত হয়। এই পরিস্থিতিতে, শুধুমাত্র অবকাঠামোগত উন্নয়ন নয়, বরং স্থানীয় জনগোষ্ঠী, পর্যটক এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলির মধ্যে পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ অপরিহার্য। ব্লু ফ্ল্যাগ সনদের জন্য আবেদন করার অর্থ কেবল একটি প্রতীকী স্বীকৃতি নয়, বরং এটি দেশের সামগ্রিক পরিবেশ ব্যবস্থাপনা ও টেকসই পর্যটন নীতিমালার প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ থাকার একটি প্রকাশ।

ব্লু ফ্ল্যাগ সনদের চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি এর অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুফলও অনস্বীকার্য। ওয়ার্ল্ড ব্যাংক (World Bank) এর এক বিশ্লেষণ অনুসারে, ব্লু ফ্ল্যাগ সনদপ্রাপ্ত সৈকতগুলিতে পর্যটকদের আগমন গড়ে ২০-৩০% বৃদ্ধি পায়, যা স্থানীয় অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়ক হয়। উদাহরণস্বরূপ, ইউরোপের ব্লু ফ্ল্যাগ সৈকতগুলি প্রতি বছর অতিরিক্ত কয়েক বিলিয়ন ইউরো রাজস্ব এনে দেয়। বাংলাদেশে, যেখানে পর্যটন শিল্প জিডিপিতে প্রায় ৩.২% অবদান রাখে (বাংলাদেশ ব্যাংক, ২০২২), সেখানে ব্লু ফ্ল্যাগ সনদ প্রাপ্তি এই অবদানকে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে পারে। তবে, এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে বিদ্যমান আইন ও নীতিমালার কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ এবং উপকূলীয় অঞ্চল ব্যবস্থাপনা নীতি, ২০০৫ এর অধীনে সৈকতগুলিতে পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণ, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের বিধান রয়েছে। এসব বিধানের কার্যকর প্রয়োগ ছাড়া ব্লু ফ্ল্যাগ সনদের শর্ত পূরণ করা অসম্ভব। এছাড়া, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (ADB) এর সহযোগিতায় পরিচালিত কোস্টাল এনভায়রনমেন্টাল ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্টের মতো উদ্যোগগুলি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পানি শোধনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে, যা ব্লু ফ্ল্যাগ অর্জনের পথ সুগম করবে। কেবল একটি সনদ অর্জন নয়, বরং এর মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব পর্যটন সংস্কৃতির বিকাশই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য।

সূচক ২০২০ ২০২১ ২০২২ ২০২৩
কক্সবাজার সৈকতে দৈনিক কঠিন বর্জ্য উৎপাদন (টন) ২৬০ ২৮৫ ৩১০ ৩৩০
পর্যটন খাতে জিডিপিতে অবদান (%) ৩.০ ২.৮ ৩.২ ৩.৪
ব্লু ফ্ল্যাগ সনদপ্রাপ্ত সৈকতের সংখ্যা (বিশ্বব্যাপী) ৪৬৬৪ ৪৮৩১ ৪৮৯৩ ৫০৩৪
বাংলাদেশের ভ্রমণ ও পর্যটন উন্নয়ন সূচকে অবস্থান (WEF) ১০৪ ১০১ ১০০ ৯৯

উৎস: বাংলাদেশ পরিবেশ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ ব্যাংক, ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম, ফাউন্ডেশন ফর এনভায়রনমেন্টাল এডুকেশন (FEE)

সুপারিশ

  • বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশন এবং পরিবেশ অধিদপ্তরকে যৌথভাবে 'বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫' ও 'বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা, ১৯৯৭' এর কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে, বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, প্লাস্টিক দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের ক্ষেত্রে।
  • স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (LGED) এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডকে সঙ্গে নিয়ে 'জাতীয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নীতিমালা, ২০১২' এবং 'জাতীয় স্যানিটেশন কৌশল, ২০০৫' এর অধীনে কক্সবাজার ও অন্যান্য সম্ভাবনাময় সৈকতে আধুনিক বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণ ও সুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট স্থাপন করতে হবে, যার জন্য ওয়ার্ল্ড ব্যাংক বা এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (ADB) এর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে তহবিল ও কারিগরি সহায়তা চাওয়া যেতে পারে।
  • পর্যটন মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ পর্যটন বোর্ডকে 'জাতীয় পর্যটন নীতিমালা, ২০১০' এর আলোকে ব্লু ফ্ল্যাগ সনদের ৩৩টি মানদণ্ড পূরণের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা তৈরি ও বাস্তবায়ন করতে হবে, যেখানে স্থানীয় জনগোষ্ঠী, পর্যটন ব্যবসায়ী এবং এনজিওদের অংশগ্রহণে পরিবেশগত শিক্ষা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম বাধ্যতামূলক করা হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: মেহেদী পারভেজ

মেহেদী পারভেজ 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: ব্লু ফ্ল্যাগ সমুদ্র সৈকত ও পর্যটন। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Ingen kommentarer fundet


News Card Generator