সিন্ডিকেটের কারসাজি: নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে অদৃশ্য দেয়াল ভাঙার… | আই নিউজ বিডি

সিন্ডিকেটের কারসাজি: নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে অদৃশ্য দেয়াল ভাঙার কৌশল

ইকবাল হোসেন  avatar   
ইকবাল হোসেন
সিন্ডিকেটের কারসাজি: নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে অদৃশ্য দেয়াল ভাঙার কৌশল
সিন্ডিকেটের কারসাজি: নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে অদৃশ্য দেয়াল ভাঙার কৌশল
ছবি: সংগৃহীত
গত মার্চ মাসে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক পরিচালিত বাজার তদারকি অভিযান সত্ত্বেও, রমজান মাসজুড়ে পেঁয়াজ, চিনি এবং ভোজ্যতেলের দামের অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বগতি ভোক্তা...

গত মার্চ মাসে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক পরিচালিত বাজার তদারকি অভিযান সত্ত্বেও, রমজান মাসজুড়ে পেঁয়াজ, চিনি এবং ভোজ্যতেলের দামের অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বগতি ভোক্তা অধিকার কর্মীদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এমনকি সরকারি বিপণন সংস্থা ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)-এর মাধ্যমে ভর্তুকি মূল্যে পণ্য বিক্রির উদ্যোগও এই সিন্ডিকেটেড কারসাজিকে সম্পূর্ণরূপে প্রতিহত করতে পারেনি। এই পরিস্থিতি স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয় যে, নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণে কেবল বিক্ষিপ্ত অভিযান যথেষ্ট নয়; বরং একটি অদৃশ্য কারসাজিচক্রের গভীরে প্রোথিত জাল ভাঙতে প্রয়োজন সুসংগঠিত, কাঠামোগত এবং প্রযুক্তি-নির্ভর কৌশলগত পরিবর্তন।

নিত্যপণ্যের বাজারকে জিম্মি করে রাখা এই সিন্ডিকেট কেবল মুনাফালোভী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সমষ্টি নয়, এটি একটি জটিল অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামো, যা বহুস্তরীয় যোগসাজশের মাধ্যমে কাজ করে। উৎপাদন পর্যায় থেকে শুরু করে পাইকারি ও খুচরা বাজার পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে এই সিন্ডিকেট তার প্রভাব বিস্তার করে। উদাহরণস্বরূপ, স্থানীয় আড়তদার থেকে শুরু করে বড় আমদানিকারক পর্যন্ত একটি সুনির্দিষ্ট চক্র পণ্যের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে। বিশ্বব্যাংকের (World Bank) সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি গত এক বছরে ১৫% এর বেশি বেড়েছে, যার একটি বড় অংশ এই কৃত্রিম সংকট ও সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রিত সরবরাহের কারণে সৃষ্ট। এই সিন্ডিকেট প্রায়শই নিজেদের মধ্যে আঁতাত করে পণ্য আমদানি বা সরবরাহ সীমিত করে, যার ফলে বাজারে পণ্যের সরবরাহ কমে যায় এবং দাম বৃদ্ধি পায়। এই চক্র এতটাই শক্তিশালী যে, এমনকি বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক নির্ধারিত মূল্যও তারা উপেক্ষা করে নিজেদের মর্জিমাফিক দাম চাপিয়ে দেয়, যা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯-এর স্পষ্ট লঙ্ঘন।

এই সিন্ডিকেট ভাঙার পথে অন্যতম বড় বাধা হলো তথ্য প্রবাহের অস্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতার অভাব। কৃষি মন্ত্রণালয় ও খাদ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে উৎপাদন, মজুত ও সরবরাহের যে তথ্য থাকে, তা প্রায়শই বাজারের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় না। এই তথ্যের অসামঞ্জস্যতাকে কাজে লাগিয়ে সিন্ডিকেট সহজেই গুজব ছড়ায় এবং কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB)-এর এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের কৃষি ও খাদ্য সরবরাহ চেইনে তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার অত্যন্ত সীমিত, যা মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বাড়াতে সহায়ক। পণ্য পরিবহন, গুদামজাতকরণ এবং বিতরণের প্রতিটি ধাপে ডিজিটাল নজরদারির অভাব সিন্ডিকেটকে আরও বেশি শক্তিশালী করে তোলে। ফলস্বরূপ, প্রান্তিক কৃষক তার পণ্যের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হয়, অন্যদিকে চূড়ান্ত ভোক্তাকে দিতে হয় চওড়া দাম। এই ব্যবধানের সিংহভাগ মুনাফা চলে যায় সিন্ডিকেটের পকেটে, যা অর্থনীতির উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি করে।

পণ্য ২০২৩ সালের গড় মূল্য (টাকা/কেজি) ২০২৪ সালের মার্চ মাসের গড় মূল্য (টাকা/কেজি) মূল্য বৃদ্ধি (%)
পেঁয়াজ ৭৫ ১১০ ৪৬.৬৭%
চিনি ১১০ ১৪০ ২৭.২৭%
ভোজ্যতেল (সুপার পাম) ১৭০ ১৮৫ ৮.৮২%

উৎস: ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়

সুপারিশ

  • কৃষি মন্ত্রণালয়, খাদ্য মন্ত্রণালয় এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে নিয়ে একটি সমন্বিত ‘জাতীয় নিত্যপণ্য সরবরাহ ও মূল্য পর্যবেক্ষণ সেল’ গঠন করা হোক, যা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, প্রতিযোগিতা কমিশন এবং জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ আইন, ২০০৯-এর অধীনে বাজারের প্রতিটি ধাপের তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ এবং প্রকাশের জন্য একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরি করবে। এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে উৎপাদন, মজুত, আমদানি, সরবরাহ এবং বিক্রয় মূল্যের রিয়েল-টাইম তথ্য জনগণের জন্য উন্মুক্ত করা হবে।
  • বাজার সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে প্রতিযোগিতা আইন, ২০১২ এবং ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯-এর অধীনে দায়েরকৃত মামলাগুলির দ্রুত নিষ্পত্তি এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান নিশ্চিত করতে বিচার বিভাগকে শক্তিশালী করা হোক। বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক গঠিত বিশেষ ট্রাইব্যুনাল বা আদালতকে এই ধরনের মামলা নিষ্পত্তির জন্য অগ্রাধিকার দিতে হবে, যাতে অভিযুক্তদের দ্রুত বিচার নিশ্চিত হয় এবং অন্যেরা এমন কাজে নিরুৎসাহিত হয়।
  • বিশ্বব্যাংক (World Bank) এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB)-এর প্রযুক্তিগত সহায়তায় একটি স্বয়ংক্রিয় 'সাপ্লাই চেইন ট্র্যাকিং সিস্টেম' (Supply Chain Tracking System) স্থাপন করা হোক, যা পণ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে ভোক্তা পর্যন্ত পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতিটি ধাপকে ডিজিটাল মনিটরিংয়ের আওতায় আনবে। বিশেষ করে, আমদানি পর্যায়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) এবং বাংলাদেশ ব্যাংক (BB)-এর সঙ্গে সমন্বয় করে আমদানিকৃত পণ্যের পরিমাণ, মূল্য এবং শুল্ক পরিশোধের তথ্য প্রকাশ্যে আনা হবে, যা অসৎ আমদানিকারকদের কারসাজি বন্ধে সহায়ক হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ইকবাল হোসেন

ইকবাল হোসেন 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: ভোক্তা অধিকার ও বাজার সিন্ডিকেট। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

לא נמצאו הערות


News Card Generator