ওটিটি প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশের সিনেমা: স্থানীয় গল্প, বৈশ্বিক বাজার জয় | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

ওটিটি প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশের সিনেমা: স্থানীয় গল্প, বৈশ্বিক বাজার জয়

ফারদিন খান  avatar   
ফারদিন খান
ওটিটি প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশের সিনেমা: স্থানীয় গল্প, বৈশ্বিক বাজার জয়
ওটিটি প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশের সিনেমা: স্থানীয় গল্প, বৈশ্বিক বাজার জয়
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএফডিসি) এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে আয়োজিত 'আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র বাজার' শীর্ষক কর্মশালায় ...

সম্প্রতি, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএফডিসি) এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে আয়োজিত 'আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র বাজার' শীর্ষক কর্মশালায় ওটিটি প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে দেশের চলচ্চিত্র বিশ্বব্যাপী প্রদর্শনের সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়, যা বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের জন্য এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। এই আলোচনায় উঠে এসেছে যে, বিগত তিন বছরে দেশের ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলোতে স্থানীয়ভাবে নির্মিত চলচ্চিত্রের দর্শক সংখ্যা প্রায় ৪০% বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ঐতিহ্যবাহী প্রেক্ষাগৃহের বাইরেও নতুন বাজার সৃষ্টির ইঙ্গিত দেয়। বিশেষত, চরকি, হইচই এবং বায়োস্কোপের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো শুধু দেশেই নয়, প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যেও জনপ্রিয়তা অর্জন করছে, যা স্থানীয় গল্পগুলোকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে এক অনুঘটকের ভূমিকা পালন করছে।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প একটি রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলো ঐতিহ্যবাহী বিতরণ মডেলকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে এবং নির্মাতাদের জন্য অভূতপূর্ব সুযোগ তৈরি করছে। একসময় যেখানে প্রেক্ষাগৃহের স্বল্পতা এবং বিতরণ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা ছিল প্রধান বাধা, সেখানে এখন ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলো নির্মাতাদের সরাসরি দর্শকদের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ করে দিচ্ছে। ২০২৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত 'কারাগার' এবং 'মহানগর' এর মতো সিরিজগুলো শুধুমাত্র দেশেই নয়, আন্তর্জাতিক সমালোচকদেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে, যা প্রমাণ করে যে বাংলাদেশের গল্প বলার ক্ষমতা বৈশ্বিক মানদণ্ড পূরণ করতে সক্ষম। এই প্ল্যাটফর্মগুলো শুধু বিনোদনই নয়, দেশের সংস্কৃতি, ভাষা এবং জীবনযাত্রাকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিচ্ছে, যা এক ধরনের সাংস্কৃতিক কূটনীতিরও অংশ। পাশাপাশি, এই প্ল্যাটফর্মগুলোতে বিনিয়োগের পরিমাণও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)-এর তথ্য অনুযায়ী, গত দুই বছরে ওটিটি খাতে স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ২৫% বৃদ্ধি পেয়েছে, যা এই খাতের ভবিষ্যত সম্ভাবনার প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থার প্রতিফলন।

তবে, এই সম্ভাবনার পূর্ণ সদ্ব্যবহার করতে হলে কিছু কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা জরুরি। প্রথমত, কনটেন্টের মান এবং বৈচিত্র্য নিশ্চিত করা। যদিও কিছু ওটিটি প্রযোজনা আন্তর্জাতিক মান ছুঁয়েছে, তবুও সামগ্রিকভাবে কনটেন্টের গুণগত মান বজায় রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। দ্বিতীয়ত, পাইরেসি বা অবৈধভাবে কনটেন্ট প্রচারের সমস্যা। এটি নির্মাতাদের আয়কে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করে। তৃতীয়ত, বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা। নেটফ্লিক্স, অ্যামাজন প্রাইম ভিডিওর মতো বৈশ্বিক জায়ান্টদের ভিড়ে নিজেদের অবস্থান তৈরি করা এবং বজায় রাখা সহজ নয়। এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, যার মধ্যে রয়েছে 'ওটিটি প্ল্যাটফর্ম নির্দেশিকা' প্রণয়নের উদ্যোগ। এই নির্দেশিকা কনটেন্টের মান, পাইরেসি প্রতিরোধ এবং প্ল্যাটফর্মগুলোর বাণিজ্যিক কার্যক্রমকে একটি আইনি কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। World Bank এবং ADB-এর সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে ডিজিটাল কনটেন্ট স্ট্রিমিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান দ্রুত উন্নতি করছে, তবে বৈশ্বিক বাজারে প্রবেশের জন্য আরও কৌশলগত বিনিয়োগ এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি অপরিহার্য। এই সমীক্ষায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, বাংলাদেশের তরুণ জনসংখ্যার মধ্যে ওটিটি প্ল্যাটফর্মের জনপ্রিয়তা আগামী দশকে এই খাতের প্রবৃদ্ধিকে আরও ত্বরান্বিত করবে, যদি সঠিক নীতি সহায়তা প্রদান করা হয়।

সাল ওটিটি সাবস্ক্রিপশন (মিলিয়ন) স্থানীয় কনটেন্ট প্রবৃদ্ধি (%) বিদেশি বিনিয়োগ (মিলিয়ন USD) রপ্তানিকৃত কনটেন্টের সংখ্যা
২০২১ ২.৮ ১৫ ১.৫ ৫
২০২২ ৪.২ ২৫ ৩.২ ১২
২০২৩ ৬.১ ৪০ ৫.৮ ২৩
২০২৪ (প্রক্ষেপিত) ৮.৫ ৩৫ ৭.৫ ৩০

উৎস: বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (BIDA), বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (BTRC) এবং World Bank-এর প্রতিবেদন থেকে সংগৃহীত।

সুপারিশ

  • তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়কে দ্রুত 'ওটিটি প্ল্যাটফর্ম নির্দেশিকা' চূড়ান্ত করে কার্যকর করতে হবে এবং এর আওতায় কনটেন্টের মান নিয়ন্ত্রণ, পাইরেসি প্রতিরোধে কঠোর আইন প্রয়োগ এবং স্থানীয় নির্মাতাদের জন্য প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করতে হবে।
  • বাংলাদেশ সরকার, বিশেষ করে অর্থ মন্ত্রণালয় এবং সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে যৌথভাবে একটি 'চলচ্চিত্র ও ডিজিটাল কনটেন্ট উন্নয়ন তহবিল' গঠন করতে হবে, যেখানে World Bank এবং ADB-এর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো থেকে সহজ শর্তে ঋণ বা অনুদান প্রাপ্তির সুযোগ থাকবে, যা উচ্চমানের স্থানীয় প্রযোজনায় বিনিয়োগ উৎসাহিত করবে।
  • বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএফডিসি)-কে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব ও বাজারের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ স্থাপন করতে হবে এবং দেশের ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলোর সাথে সমন্বয় করে বৈশ্বিক প্রদর্শনী ও বিতরণের জন্য একটি সুসংগঠিত প্রচার কৌশল প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ফারদিন খান

ফারদিন খান 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: সিনেমা ও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র বাজার। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Inga kommentarer hittades


News Card Generator