সুরক্ষার দায়বদ্ধতা (R2P): আন্তর্জাতিক আইনের দুর্বলতা নাকি রাষ্ট্রের… | আই নিউজ বিডি

সুরক্ষার দায়বদ্ধতা (R2P): আন্তর্জাতিক আইনের দুর্বলতা নাকি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব?

তানিয়া সুলতানা  avatar   
তানিয়া সুলতানা
সুরক্ষার দায়বদ্ধতা (R2P): আন্তর্জাতিক আইনের দুর্বলতা নাকি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব?
সুরক্ষার দায়বদ্ধতা (R2P): আন্তর্জাতিক আইনের দুর্বলতা নাকি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব?
ছবি: সংগৃহীত
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের সাম্প্রতিক ২০২৩ সালের 'সুরক্ষার দায়বদ্ধতা (R2P) এবং গণ-atrocity অপরাধ প্রতিরোধ' শীর্ষক প্রতিবেদনটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায...

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের সাম্প্রতিক ২০২৩ সালের 'সুরক্ষার দায়বদ্ধতা (R2P) এবং গণ-atrocity অপরাধ প্রতিরোধ' শীর্ষক প্রতিবেদনটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে R2P নীতির কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। প্রতিবেদনটি স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয় যে, যদিও R2P একটি প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক নীতি, এর প্রয়োগ বহুলাংশে সদস্য রাষ্ট্রগুলির রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং কৌশলগত স্বার্থের উপর নির্ভরশীল। মিয়ানমারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর উপর পরিচালিত নৃশংসতার ঘটনায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সম্মিলিত ব্যর্থতা, বিশেষত জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো ক্ষমতার অপব্যবহারের কারণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে অক্ষমতা, R2P-এর আদর্শিক ভিত্তি এবং বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে গভীর ব্যবধানকে প্রকটভাবে তুলে ধরেছে। এই ব্যর্থতা কেবল আন্তর্জাতিক আইনের দুর্বলতা নয়, বরং রাষ্ট্রীয় স্বার্থের কাছে মানবিক নীতির ক্রমাগত আত্মসমর্পণেরও ইঙ্গিতবাহী।

R2P নীতিটি ২০০৫ সালে জাতিসংঘ বিশ্ব সম্মেলনে সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়েছিল, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ, জাতিগত নির্মূল এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের মতো গণ-atrocity অপরাধ থেকে জনগোষ্ঠীকে রক্ষা করা। এই নীতি অনুযায়ী, প্রতিটি রাষ্ট্রের তার নিজস্ব জনগণকে এই ধরনের অপরাধ থেকে রক্ষা করার প্রাথমিক দায়িত্ব রয়েছে। যদি কোনো রাষ্ট্র এই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়, অথবা নিজেই তার জনগণের বিরুদ্ধে এমন অপরাধে লিপ্ত হয়, তাহলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের, বিশেষত জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের মাধ্যমে, সম্মিলিত পদক্ষেপ গ্রহণের দায়বদ্ধতা তৈরি হয়। তবে, সিরিয়া, ইয়েমেন বা ইউক্রেনের মতো চলমান সংঘাতগুলিতে আমরা দেখেছি যে, নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের কৌশলগত স্বার্থের দ্বন্দ্বে প্রায়শই R2P-এর অধীনে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ অসম্ভব হয়ে পড়ে। উদাহরণস্বরূপ, সিরিয়া সংঘাতে নিরাপত্তা পরিষদে একাধিকবার প্রস্তাব উত্থাপন করা হলেও, রাশিয়া ও চীনের ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগের কারণে মানবিক হস্তক্ষেপ বা অপরাধীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার প্রচেষ্টা বারবার ব্যর্থ হয়েছে। এটি R2P-এর আইনি কাঠামোকে নয়, বরং আন্তর্জাতিক রাজনীতির কাঠিন্যকে প্রতিফলিত করে।

R2P-এর বাস্তবায়নে রাষ্ট্রগুলোর সামরিক সক্ষমতা বা অর্থনৈতিক প্রভাবও একটি বড় ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করে। কিছু রাষ্ট্র, বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলো, তাদের সার্বভৌমত্বের উপর যেকোনো ধরনের হস্তক্ষেপকে সন্দেহের চোখে দেখে, যা R2P-এর প্রতিরোধমূলক স্তম্ভকে দুর্বল করে। এশিয়া অঞ্চলে, সার্ক (SAARC) বা বিমসটেক (BIMSTEC) এর মতো আঞ্চলিক জোটগুলোর মধ্যে R2P নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো সম্মিলিত কাঠামো বা নীতি নেই। ফলে, মিয়ানমারে রোহিঙ্গা সংকটের মতো ঘটনায়, যেখানে R2P-এর অধীনে হস্তক্ষেপের প্রবল প্রয়োজন ছিল, আঞ্চলিক বা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কোনো কার্যকর সম্মিলিত পদক্ষেপ দেখা যায়নি। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা (UN Peacekeeping) মিশনগুলো তুলনামূলকভাবে সফল হলেও, তাদের ম্যান্ডেট সাধারণত সংঘাত-পরবর্তী স্থিতিশীলতা রক্ষা বা সীমিত পরিসরে বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষায় সীমাবদ্ধ থাকে, যা R2P-এর অধীনে বৃহত্তর সামরিক হস্তক্ষেপের আওতাভুক্ত নয়। ফলে, R2P-এর অধীনে পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়গুলোর সমন্বিত উদ্যোগ এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে, যা শুধুমাত্র আইনি কাঠামোর দুর্বলতা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না।

সাল জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে R2P-এর উল্লেখ ভেটো প্রয়োগের সংখ্যা (R2P-সংশ্লিষ্ট) R2P-এর অধীনে সফল হস্তক্ষেপের উদাহরণ
২০০৫-২০১০ ১২ বার ০ পূর্ব তিমুর (যদিও R2P আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হওয়ার পূর্বে), কেনিয়া (জাতিগত সহিংসতা প্রতিরোধে কূটনৈতিক উদ্যোগ)
২০১১-২০১৫ ২৯ বার ৯ লিবিয়া (UNSC রেজোলিউশন ১৯৭৩), আইভরি কোস্ট
২০১৬-২০২০ ৩৫ বার ১৫ মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র (সীমিত সাফল্য), ইয়েমেন (ব্যর্থতা)
২০২১-২০২৩ ১৮ বার ৭ ইউক্রেন (প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা সীমিত), মিয়ানমার (ব্যর্থতা)

উৎস: জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের কার্যবিবরণী, মহাসচিবের কার্যালয়ের R2P বিষয়ক প্রতিবেদন, স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (SIPRI)

সুপারিশ

  • জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের ভেটো ক্ষমতা সংস্কারের জন্য সদস্য রাষ্ট্রগুলিকে সম্মিলিতভাবে চাপ সৃষ্টি করতে হবে, বিশেষত যখন গণ-atrocity অপরাধের ক্ষেত্রে R2P নীতি প্রয়োগের প্রশ্ন আসে। 'ফ্রান্স-মেক্সিকো ইনিশিয়েটিভ' (French-Mexican Initiative) এর মতো প্রস্তাবগুলিকে শক্তিশালী সমর্থন দিয়ে একটি 'কোড অফ কন্ডাক্ট' প্রণয়ন করতে হবে, যা স্থায়ী সদস্যদের গণ-atrocity অপরাধের ক্ষেত্রে স্বেচ্ছায় ভেটো প্রয়োগ থেকে বিরত থাকতে উৎসাহিত করবে।
  • আঞ্চলিক সংস্থা যেমন BIMSTEC এবং সার্ক-এর মতো জোটগুলিকে তাদের নিজস্ব আঞ্চলিক কাঠামোতে R2P-এর নীতিগুলি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে এবং গণ-atrocity অপরাধ প্রতিরোধের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট 'আঞ্চলিক কর্মপরিকল্পনা' (Regional Action Plan) তৈরি করতে হবে। এই পরিকল্পনায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়গুলির মধ্যে নিয়মিত সংলাপ, তথ্য আদান-প্রদান এবং সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় যৌথ প্রশিক্ষণ ও মহড়ার ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে।
  • জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা (UN Peacekeeping) মিশনগুলোর ম্যান্ডেটকে R2P-এর প্রতিরোধমূলক স্তম্ভের সাথে আরও গভীরভাবে সংযুক্ত করতে হবে, যাতে তারা প্রাথমিক পর্যায়েই গণ-atrocity অপরাধের লক্ষণগুলি সনাক্ত করতে এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে সক্ষম হয়। এ লক্ষ্যে 'জাতিসংঘের পিসবিল্ডিং কমিশন' (UN Peacebuilding Commission) এর ক্ষমতা ও সংস্থান বৃদ্ধি করতে হবে, যাতে তারা সংঘাতপ্রবণ দেশগুলিতে দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: তানিয়া সুলতানা

তানিয়া সুলতানা 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক আইন। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Không có bình luận nào được tìm thấy


News Card Generator