বিশেষজ্ঞ চোখে জনস্বাস্থ্য ও মহামারী প্রতিরোধ: সত্য, মিথ ও গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

বিশেষজ্ঞ চোখে জনস্বাস্থ্য ও মহামারী প্রতিরোধ: সত্য, মিথ ও গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ

ডা. আসিফ মাহমুদ  avatar   
ডা. আসিফ মাহমুদ
বিশেষজ্ঞ চোখে জনস্বাস্থ্য ও মহামারী প্রতিরোধ: সত্য, মিথ ও গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ
বিশেষজ্ঞ চোখে জনস্বাস্থ্য ও মহামারী প্রতিরোধ: সত্য, মিথ ও গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ
ছবি: সংগৃহীত
কলামিস্ট: ডা. আসিফ মাহমুদ | জ্যেষ্ঠ বিষয়ভিত্তিক গবেষক (খাত: জনস্বাস্থ্য ও মহামারী প্রতিরোধ)
📰 বিশেষ মতামত ও কলাম

কলামিস্ট: ডা. আসিফ মাহমুদ | জ্যেষ্ঠ বিষয়ভিত্তিক গবেষক (খাত: জনস্বাস্থ্য ও মহামারী প্রতিরোধ)

সম্প্রতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) প্রকাশিত 'ওয়ার্ল্ড হেলথ স্ট্যাটিসটিকস ২০২৩' প্রতিবেদনে বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য খাতের কিছু সূচক ইতিবাচক দেখালেও, মহামারী প্রতিরোধ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে এখনো বহু চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। বিশেষ করে, কোভিড-১৯ পরবর্তী সময়ে সাধারণ স্বাস্থ্যসেবার ওপর চাপ, সংক্রামক রোগের নতুন ধরণ এবং অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধের মতো বিষয়গুলো দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে নতুন করে ভাবাচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) এর সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, গত ছয় মাসে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা গত পাঁচ বছরের গড়কে ছাড়িয়ে গেছে, যা মহামারী প্রতিরোধের প্রস্তুতিতে ঘাটতির ইঙ্গিত দেয়। একইসাথে, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) কর্তৃক সম্প্রতি প্রকাশিত একটি নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, স্বাস্থ্য খাতের মোট বাজেট বরাদ্দের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এখনো অবকাঠামোগত উন্নয়নে ব্যয় হলেও, গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) এবং জনস্বাস্থ্য কর্মীদের প্রশিক্ষণে বরাদ্দ অপ্রতুল।

বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করে রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (IEDCR) এবং জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIMH)। IEDCR দেশের সংক্রামক রোগ নজরদারি, শনাক্তকরণ এবং প্রতিরোধে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে। তবে, মহামারী ব্যবস্থাপনায় তাদের সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য আধুনিক ল্যাবরেটরি সরঞ্জাম এবং দক্ষ জনবলের প্রয়োজনীয়তা এখনো অনুভূত হয়। উদাহরণস্বরূপ, কোভিড-১৯ মহামারীর সময় IEDCR এর ল্যাবরেটরিগুলো ব্যাপক চাপ সামলেছে, কিন্তু প্যাথোজেন জিনোম সিকোয়েন্সিং এবং দ্রুত ডায়াগনস্টিক কিট তৈরিতে আন্তর্জাতিক মানের সক্ষমতা অর্জনে আরও বিনিয়োগ প্রয়োজন। অন্যদিকে, NIMH মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় ব্যাপক চাহিদা পূরণে হিমশিম খাচ্ছে। মানসিক স্বাস্থ্য আইন ২০১৮ প্রণীত হলেও, এর বাস্তবায়ন এবং প্রান্তিক পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্য পরিষেবা পৌঁছানো এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। দেশের মোট স্বাস্থ্য বাজেটের মাত্র ০.৫% মানসিক স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশকৃত ন্যূনতম ৫% এর অনেক নিচে। এই অপ্রতুল বরাদ্দ মানসিক স্বাস্থ্য পরিচর্যা কর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নে বড় বাধা তৈরি করছে।

জনস্বাস্থ্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA) এর ভূমিকা। মানসম্মত ঔষধের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা এবং ঔষধের অপব্যবহার রোধ করা তাদের প্রধান কাজ। সম্প্রতি, অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার এবং এর ফলে সৃষ্ট অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (AMR) জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি ভয়াবহ হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। DGDA এই বিষয়ে বিভিন্ন নীতিমালা প্রণয়ন করলেও, মাঠ পর্যায়ে এর প্রয়োগ এবং নজরদারি এখনো দুর্বল। বিশেষ করে, চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি বন্ধ করা এবং ফার্মেসীগুলোর লাইসেন্সিং ও তদারকি জোরদার করা অত্যাবশ্যক। এছাড়া, নতুন রোগের প্রাদুর্ভাব বা মহামারীর সময় প্রয়োজনীয় ভ্যাকসিন বা ঔষধের দ্রুত অনুমোদন এবং সরবরাহ নিশ্চিত করাও DGDA এর অন্যতম দায়িত্ব। কোভিড-১৯ মহামারীর সময় ভ্যাকসিন আমদানিতে কিছুটা সময় লাগলেও, ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবেলায় একটি সুসংগঠিত সরবরাহ চেইন এবং স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর উপর জোর দেওয়া প্রয়োজন। স্থানীয়ভাবে ভ্যাকসিন উৎপাদন বা ঔষধ তৈরির সক্ষমতা বাড়াতে গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণ করার জন্য প্রণোদনা প্যাকেজ চালু করা যেতে পারে।

সূচক ২০১৯ সাল ২০২১ সাল ২০২৩ সাল (প্রাক্কলিত/শেষ) উৎস
স্বাস্থ্য খাতে জিডিপি-র শতাংশ ২.৫% ২.৩% ২.১% MOHFW, জাতীয় স্বাস্থ্য হিসাব
প্রতি ১০০০ জনে চিকিৎসক ০.৬ ০.৭ ০.৮ DGHS, স্বাস্থ্য বুলেটিন
শিশুমৃত্যু হার (প্রতি ১০০০ জীবিত জন্মে) ২২ ২১ ১৯ BBS, স্যাম্পল ভাইটাল রেজিস্ট্রেশন সিস্টেম
মানসিক স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বরাদ্দ (মোট স্বাস্থ্য বাজেটের%) ০.৪% ০.৪৫% ০.৫% MOHFW, বাজেট পর্যালোচনা
এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের হার (নির্দিষ্ট কিছু প্যাথোজেনের জন্য) ৩০-৪০% ৩৫-৪৫% ৪০-৫০% IEDCR, AMR নজরদারি প্রতিবেদন

উৎস: স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW), স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS), বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS), রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (IEDCR)

সুপারিশ

  • রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (IEDCR) এর ল্যাবরেটরি সক্ষমতা আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে একটি সুনির্দিষ্ট 'জাতীয় প্যাথোজেন নজরদারি ও গবেষণা তহবিল' গঠন করা হোক, যা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) কর্তৃক পরিচালিত হবে এবং প্রতি বছর মোট স্বাস্থ্য বাজেটের ন্যূনতম ১% এই তহবিলে বরাদ্দ দেওয়া হবে।
  • জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIMH) এর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রান্তিক পর্যায়ে পৌঁছাতে 'মানসিক স্বাস্থ্য আইন ২০১৮' এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় টাস্কফোর্স গঠন করা হোক, যার নেতৃত্বে থাকবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) এবং প্রতি জেলায় একজন করে সাইকিয়াট্রিস্ট ও দুইজন করে ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট নিয়োগ নিশ্চিত করা হোক।
  • ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA) কে শক্তিশালী করতে 'জাতীয় ঔষধ নীতি ২০১৬' এর কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা হোক, বিশেষ করে চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করতে একটি ডিজিটাল ট্র্যাকিং সিস্টেম চালু করা এবং ফার্মেসী লাইসেন্সিং ও নবায়নের শর্ত হিসেবে অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রির নিয়মাবলী সম্পর্কে প্রশিক্ষণের বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হোক।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ডা. আসিফ মাহমুদ

ডা. আসিফ মাহমুদ 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: জনস্বাস্থ্য ও মহামারী প্রতিরোধ। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

कोई टिप्पणी नहीं मिली


News Card Generator