অচেনা পথের বাঁকে চামড়া শিল্প: সাভারের ট্যানারিতে অব্যবহৃত বর্জ্যের করুণ পরিণতি | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

অচেনা পথের বাঁকে চামড়া শিল্প: সাভারের ট্যানারিতে অব্যবহৃত বর্জ্যের করুণ পরিণতি

শাজাহান মিয়া  avatar   
শাজাহান মিয়া
অচেনা পথের বাঁকে চামড়া শিল্প: সাভারের ট্যানারিতে অব্যবহৃত বর্জ্যের করুণ পরিণতি
অচেনা পথের বাঁকে চামড়া শিল্প: সাভারের ট্যানারিতে অব্যবহৃত বর্জ্যের করুণ পরিণতি
ছবি: সংগৃহীত
কলামিস্ট: শাজাহান মিয়া | জ্যেষ্ঠ বিষয়ভিত্তিক গবেষক (খাত: চামড়া ও পাদুকাশিল্প)
📰 বিশেষ মতামত ও কলাম

কলামিস্ট: শাজাহান মিয়া | জ্যেষ্ঠ বিষয়ভিত্তিক গবেষক (খাত: চামড়া ও পাদুকাশিল্প)

সাভারের চামড়া শিল্প নগরীর কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার (CETP) থেকে নির্গত তরল বর্জ্যের অব্যবস্থাপনা এবং কঠিন বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণে দীর্ঘদিনের ব্যর্থতা সম্প্রতি বাংলাদেশ সরকারের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে আবারও প্রকটভাবে উঠে এসেছে। গত অর্থবছরেও, প্রায় ২.৫ লক্ষ টন কঠিন বর্জ্য, যার মধ্যে ক্রোমিয়াম-যুক্ত স্লাজ অন্যতম, অপরিশোধিত অবস্থায় ফেলে রাখা হয়েছে, যা কেবল পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকিই নয়, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি চামড়া শিল্পের জন্য একটি গভীর ক্ষত। এই বিপুল পরিমাণ বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরের সুযোগ থাকলেও, অবকাঠামোগত দুর্বলতা এবং কার্যকর নীতির অভাবে তা অব্যবহৃতই থেকে যাচ্ছে, যা বিশ্ব বাজারে বাংলাদেশের চামড়া পণ্যের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

হাজারীবাগ থেকে সাভারে ট্যানারি স্থানান্তরের মূল উদ্দেশ্য ছিল আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদন প্রক্রিয়া চালু করা। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (BSCIC) এবং শিল্প মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে গড়ে ওঠা এই শিল্প নগরীতে CETP স্থাপন করা হলেও, এর সক্ষমতা এবং কার্যকারিতা নিয়ে শুরু থেকেই প্রশ্ন ছিল। দৈনিক প্রায় ২১,০০০ ঘনমিটার তরল বর্জ্য পরিশোধনের সক্ষমতা থাকলেও, ট্যানারিগুলোর প্রকৃত বর্জ্য উৎপাদন এবং CETP-এর দুর্বল রক্ষণাবেক্ষণের কারণে প্রায়শই অপরিশোধিত বর্জ্য ধলেশ্বরী নদীতে মিশে যাচ্ছে। অপরদিকে, কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য পৃথক সলিড ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (SWMS) স্থাপনের কথা থাকলেও, তা আজ পর্যন্ত পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে চামড়ার ছাঁট, ট্রিমড ফ্লেশ ও ক্রোমিয়াম-যুক্ত স্লাজসহ অন্যান্য কঠিন বর্জ্য উন্মুক্ত স্থানে স্তূপীকৃত হচ্ছে, যা কেবল মাটির উর্বরতা ও ভূগর্ভস্থ পানিকে দূষিত করছে না, স্থানীয় জনস্বাস্থ্যেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। World Bank এবং Asian Development Bank (ADB)-এর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এই প্রকল্পের অর্থায়নে জড়িত থাকলেও, তাদের পরিবেশগত ও সামাজিক সুরক্ষা মানদণ্ড (ESF) বাস্তবায়নে বাংলাদেশ সরকার এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ধারাবাহিক ব্যর্থতা চোখে পড়ার মতো।

এই অব্যবস্থাপনা দেশের অর্থনীতিতে দ্বিমুখী ক্ষতি করছে। প্রথমত, পরিবেশ দূষণের কারণে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশের চামড়া পণ্যের গ্রহণযোগ্যতা কমছে, যা রপ্তানি আয়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে পরিবেশগত সনদপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা একটি প্রধান শর্ত। দ্বিতীয়ত, এই বিপুল পরিমাণ বর্জ্যকে সঠিকভাবে প্রক্রিয়াজাত করতে পারলে তা থেকে বায়ো-সার, পশুখাদ্য, এমনকি বায়োগ্যাস উৎপাদন করা সম্ভব, যা শিল্পনগরীর বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণেও সহায়ক হতে পারত। শিল্প মন্ত্রণালয় এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এই খাতের উন্নয়নে বিভিন্ন নীতিগত সহায়তা দিলেও, বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত বিনিয়োগ এবং বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারেনি। উদাহরণস্বরূপ, চামড়ার ছাঁট থেকে জিলাটিন ও কোলাজেন তৈরির বিশ্বব্যাপী চাহিদা থাকলেও, সাভারের ট্যানারিগুলো এই সুযোগ কাজে লাগাতে ব্যর্থ হচ্ছে। এই অব্যবহৃত বর্জ্য শুধুমাত্র পরিবেশগত দায়ই নয়, এটি একটি বিশাল অর্থনৈতিক সুযোগ যা বাংলাদেশ সরকার হারাচ্ছে।

বর্জ্যের প্রকার উৎপাদন (আনুমানিক বার্ষিক, টন) পুনর্ব্যবহারের সুযোগ বর্তমান অবস্থা
ক্রোমিয়াম-যুক্ত স্লাজ ৫০,০০০ - ৬০,০০০ ক্রোমিয়াম পুনরুদ্ধার, সিমেন্ট শিল্পে ব্যবহার উন্মুক্ত স্থানে স্তূপীকৃত/পরিবেশ দূষণ
চামড়ার ছাঁট/ফ্লেশ ১,৫০,০০০ - ২,০০,০০০ জিলাটিন, কোলাজেন, বায়ো-সার, পশুখাদ্য অব্যবহৃত/ফেলে দেওয়া
অন্যান্য কঠিন বর্জ্য ২০,০০০ - ৩০,০০০ জ্বালানি/কম্পোস্ট অব্যবস্থাপিত

উৎস: পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়, শিল্প মন্ত্রণালয় এবং BSCIC-এর বিভিন্ন প্রতিবেদন (২০২২-২০২৩)

সুপারিশ

  • শিল্প মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (BSCIC)-কে অবিলম্বে সাভার চামড়া শিল্প নগরীতে একটি পূর্ণাঙ্গ সলিড ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (SWMS) স্থাপন ও কার্যকর করতে হবে, যেখানে ক্রোমিয়াম-যুক্ত স্লাজ থেকে ক্রোমিয়াম পুনরুদ্ধার এবং চামড়ার ছাঁট থেকে জিলাটিন ও কোলাজেন উৎপাদনের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা থাকবে।
  • পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়কে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড (যেমন EU Green Deal-এর পরিবেশগত নির্দেশনা) অনুসরণ করে চামড়া শিল্প বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য কঠোর আইন ও বিধিমালা প্রণয়ন ও প্রয়োগ করতে হবে, এবং World Bank ও ADB-এর পরিবেশগত ও সামাজিক সুরক্ষা মানদণ্ড (ESF) মেনে চলতে শিল্প উদ্যোগগুলোকে বাধ্য করতে হবে।
  • বাংলাদেশ সরকারকে চামড়া শিল্পের কঠিন বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরের জন্য বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে বিশেষ প্রণোদনা, কর ছাড় এবং প্রযুক্তি স্থানান্তরের সুযোগ দিতে হবে, এবং এ লক্ষ্যে অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে যৌথভাবে একটি বিনিয়োগবান্ধব নীতিমালা তৈরি করতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: শাজাহান মিয়া

শাজাহান মিয়া 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: চামড়া ও পাদুকাশিল্প। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Walang nakitang komento


News Card Generator