নারী ক্রীড়াবিদদের জন্য গ্রামীণ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র: স্বপ্নপূরণের বাধা ও সম্ভাবনার পথ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

নারী ক্রীড়াবিদদের জন্য গ্রামীণ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র: স্বপ্নপূরণের বাধা ও সম্ভাবনার পথ

রেহানা আক্তার  avatar   
রেহানা আক্তার
নারী ক্রীড়াবিদদের জন্য গ্রামীণ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র: স্বপ্নপূরণের বাধা ও সম্ভাবনার পথ
নারী ক্রীড়াবিদদের জন্য গ্রামীণ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র: স্বপ্নপূরণের বাধা ও সম্ভাবনার পথ
ছবি: সংগৃহীত
কলামিস্ট: রেহানা আক্তার | জ্যেষ্ঠ বিষয়ভিত্তিক গবেষক (খাত: নারী ক্রীড়াবিদ ও কাঠামোগত সুবিধা)
📰 বিশেষ মতামত ও কলাম

কলামিস্ট: রেহানা আক্তার | জ্যেষ্ঠ বিষয়ভিত্তিক গবেষক (খাত: নারী ক্রীড়াবিদ ও কাঠামোগত সুবিধা)

সম্প্রতি, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় কর্তৃক ঘোষিত 'গ্রামীণ নারী ক্রীড়াবিদ উন্নয়ন প্রকল্প ২০২৩-২০২৭'-এর প্রাথমিক সমীক্ষা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক উদ্বেগজনক চিত্র। সমীক্ষা অনুযায়ী, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রতি ১০ জন সম্ভাবনাময় নারী ক্রীড়াবিদের মধ্যে মাত্র ৩ জন প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও অবকাঠামোগত সুবিধা পান। এই পরিসংখ্যান ইঙ্গিত দেয় যে, গ্রামীণ নারী ক্রীড়াবিদদের জন্য প্রশিক্ষণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা এবং সেগুলোর কার্যকর পরিচালনা এখনো অনেক দূরের পথ। যেখানে বিশ্বব্যাংকের 'বাংলাদেশ স্পোর্টস ডেভেলপমেন্ট আউটলুক ২০৩০' প্রতিবেদনে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে ক্রীড়া বিকাশের উপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে, সেখানে এই প্রাথমিক সমীক্ষা দেশের ক্রীড়া উন্নয়নের অন্যতম চালিকাশক্তি নারী ক্রীড়াবিদদের স্বপ্ন পূরণের পথে এক বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

গ্রামীণ নারী ক্রীড়াবিদদের জন্য প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের অপ্রতুলতা এবং বিদ্যমান কেন্দ্রগুলোর দুর্বল ব্যবস্থাপনা দেশের ক্রীড়া উন্নয়নে এক দীর্ঘস্থায়ী প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। অধিকাংশ গ্রামীণ প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে প্রয়োজনীয় আধুনিক সরঞ্জাম, মানসম্মত কোচিং স্টাফ এবং উপযুক্ত আবাসন সুবিধার অভাব প্রকট। উদাহরণস্বরূপ, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) কর্তৃক ২০১৯ সালে প্রকাশিত 'জেন্ডার অ্যান্ড স্পোর্টস ইন বাংলাদেশ: চ্যালেঞ্জেস অ্যান্ড অপরচুনিটিজ' শীর্ষক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বাংলাদেশের গ্রামীণ অঞ্চলের ক্রীড়া অবকাঠামো উন্নয়নে লিঙ্গ-সংবেদনশীলতার অভাব রয়েছে। এই প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গ্রামীণ প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোতে মেয়েদের জন্য পৃথক শৌচাগার, নিরাপদ আবাসন এবং নারী কোচের উপস্থিতি খুবই কম, যা অনেক সম্ভাবনাময় ক্রীড়াবিদকে খেলাধুলা থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। উপরন্তু, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাধা, যেমন বাল্যবিবাহের প্রবণতা এবং মেয়েদের খেলাধুলায় অংশগ্রহণের প্রতি পরিবার ও সমাজের রক্ষণশীল মনোভাব, এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে। প্রশিক্ষণের পাশাপাশি পুষ্টি ও মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তার অভাবও তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, যা তাদের আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সফল হওয়ার সম্ভাবনাকে খর্ব করছে।

তবে, এই চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যেও সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত উন্মোচন হতে পারে। বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রণীত 'জাতীয় ক্রীড়া নীতি ২০১৮'-তে গ্রামীণ ক্রীড়া উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে এবং নারী ক্রীড়াবিদদের জন্য সুযোগ তৈরির কথা বলা হয়েছে। এই নীতির কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে গ্রামীণ পর্যায়ে আধুনিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন সম্ভব। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, বেসরকারি সংস্থা এবং কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (CSR) কর্মসূচির অধীনে অর্থায়ন পেলে এই কেন্দ্রগুলো আধুনিকায়িত হতে পারে। বিশ্বব্যাংক এবং ADB-এর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো ক্রীড়া অবকাঠামো উন্নয়নে কারিগরি ও আর্থিক সহায়তা প্রদানে আগ্রহী, যা বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সুযোগ। স্থানীয় স্কুল ও কলেজের সঙ্গে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোকে মাল্টিপারপাস ফ্যাসিলিটি হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে, যেখানে শুধুমাত্র ক্রীড়া প্রশিক্ষণ নয়, বরং শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সচেতনতা কার্যক্রমও পরিচালিত হবে। এর ফলে, ক্রীড়াবিদরা খেলাধুলার পাশাপাশি তাদের শিক্ষাজীবনও চালিয়ে যেতে পারবে এবং সামগ্রিকভাবে একটি সুস্থ ও শিক্ষিত প্রজন্ম গড়ে উঠবে।

বছর মোট নারী ক্রীড়াবিদ (গ্রামীণ) প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে নিবন্ধিত (গ্রামীণ) জাতীয় পর্যায়ে অংশগ্রহণকারী (গ্রামীণ) আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অংশগ্রহণকারী (গ্রামীণ)
২০১৮ ১,২০,০০০ ১৫,২০০ ১,৮০০ ৪৫
২০১৯ ১,৩০,০০০ ১৭,৫০০ ২,১০০ ৫০
২০২০ ১,৩৫,০০০ ১৬,০০০ ১,৬০০ ৩৫
২০২১ ১,৪৫,০০০ ১৮,৮০০ ২,৩০০ ৬০
২০২২ ১,৫০,০০০ ২০,৫০০ ২,৫০০ ৭০

উৎস: যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (বিকেএসপি), World Bank - বাংলাদেশ স্পোর্টস ডেভেলপমেন্ট আউটলুক।

সুপারিশ

  • যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়কে 'জাতীয় ক্রীড়া নীতি ২০১৮' এর অধীনে একটি সুনির্দিষ্ট 'গ্রামীণ নারী ক্রীড়াবিদ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন ও পরিচালনা বিধিমালা' প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে প্রতিটি কেন্দ্রে মানসম্মত আবাসন, পৃথক শৌচাগার, নারী কোচ এবং ক্রীড়া মনোবিদের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করা হবে। এই বিধিমালা বাস্তবায়নে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে সক্রিয়ভাবে যুক্ত করতে হবে।
  • বাংলাদেশ সরকার World Bank এবং ADB-এর সাথে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে 'গ্রামীণ ক্রীড়া অবকাঠামো উন্নয়ন তহবিল' গঠন করতে পারে, যা গ্রামীণ প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোর আধুনিকীকরণ, সরঞ্জাম সরবরাহ এবং প্রশিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে আর্থিক সহায়তা প্রদান করবে। এই তহবিল থেকে অর্থায়নের জন্য একটি স্বচ্ছ আবেদন প্রক্রিয়া এবং কঠোর নিরীক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
  • শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় যৌথভাবে একটি 'ক্রীড়া ও শিক্ষা সমন্বয় কর্মসূচি' চালু করতে পারে, যেখানে গ্রামীণ নারী ক্রীড়াবিদদের জন্য বিশেষ শিক্ষাবৃত্তি এবং নমনীয় পাঠ্যক্রমের ব্যবস্থা থাকবে, যাতে তারা খেলাধুলার পাশাপাশি তাদের শিক্ষা চালিয়ে যেতে পারে। এই কর্মসূচিতে বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (বিকেএসপি) এর মেন্টরশিপ প্রোগ্রামকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: রেহানা আক্তার

রেহানা আক্তার 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: নারী ক্রীড়াবিদ ও কাঠামোগত সুবিধা। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Комментариев нет


News Card Generator