ফিফা ফান্ড: 'তৃণমূল' কি শুধু कागজের নাম, মাঠের ছবিটা কেন ভিন্ন? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

ফিফা ফান্ড: 'তৃণমূল' কি শুধু कागজের নাম, মাঠের ছবিটা কেন ভিন্ন?

জাহিদ রিজভি  avatar   
জাহিদ রিজভি
ফিফা ফান্ড: 'তৃণমূল' কি শুধু कागজের নাম, মাঠের ছবিটা কেন ভিন্ন?
ফিফা ফান্ড: 'তৃণমূল' কি শুধু कागজের নাম, মাঠের ছবিটা কেন ভিন্ন?
ছবি: সংগৃহীত
কলামিস্ট: জাহিদ রিজভি | জ্যেষ্ঠ বিষয়ভিত্তিক গবেষক (খাত: ফুটবলের তৃণমূল উন্নয়ন ও ফিফা ফান্ডিং)
📰 বিশেষ মতামত ও কলাম

কলামিস্ট: জাহিদ রিজভি | জ্যেষ্ঠ বিষয়ভিত্তিক গবেষক (খাত: ফুটবলের তৃণমূল উন্নয়ন ও ফিফা ফান্ডিং)

২০২২ সালের ফিফা বিশ্বকাপকে সামনে রেখে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) ফিফা থেকে 'ফরোয়ার্ড প্রোগ্রাম' (FIFA Forward Program) এর অধীনে প্রায় ৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার অনুদান লাভ করেছিল, যা মূলত ফুটবলের তৃণমূল উন্নয়নে ব্যবহৃত হওয়ার কথা ছিল। এই তহবিলের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ জাতীয় দলের প্রস্তুতি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং তৃণমূল পর্যায় থেকে প্রতিভাবান খেলোয়াড় খুঁজে বের করার জন্য বরাদ্দ করা হয়। কিন্তু, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের ফুটবলের সার্বিক চিত্র, বিশেষ করে তৃণমূল পর্যায়ের খেলার মাঠের বাস্তবতা, এই বিশাল অঙ্কের বিনিয়োগের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের ফুটবল লিগগুলোর অনিয়মিত আয়োজন, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষকের অভাব এবং মানসম্মত খেলার মাঠের দুষ্প্রাপ্যতা স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয় যে, ফিফা থেকে প্রাপ্ত অর্থ মাঠ পর্যায়ে প্রত্যাশিত প্রভাব ফেলতে পারেনি। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৯ সালে কক্সবাজার জেলার মহেশখালী উপজেলায় একটি ফুটবল একাডেমি প্রতিষ্ঠার জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ সঠিক সময়ে পৌঁছায়নি এবং একাডেমির কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে আছে, যা তৃণমূলের নামে শুধু কাগজে-কলমে প্রকল্প দেখানোর একটি প্রকট উদাহরণ।

এই তহবিল ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতার অভাব একটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ফিফার 'ফরোয়ার্ড প্রোগ্রাম' এর অন্যতম উদ্দেশ্য হলো সদস্য দেশগুলোর ফুটবল ফেডারেশনগুলোকে অর্থনৈতিক সহায়তা প্রদান করা, যাতে তারা তাদের নিজস্ব উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারে। বাংলাদেশ সরকার এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ফুটবলের উন্নয়নে বিভিন্ন সময়ে নীতিগত সমর্থন দিলেও, ফিফা ফান্ডের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণের অভাব পরিলক্ষিত হয়েছে। প্রায়শই দেখা যায়, বরাদ্দকৃত অর্থের একটি বড় অংশ প্রশাসনিক ব্যয়, অহেতুক বিদেশ সফর, বা এমন সব খাতে ব্যয় হয় যা সরাসরি তৃণমূল পর্যায়ের খেলোয়াড়দের উন্নয়নে কোনো ভূমিকা রাখে না। উদাহরণস্বরূপ, স্থানীয় ফুটবল ক্লাবগুলোকে সরঞ্জাম সরবরাহ বা প্রশিক্ষণ ক্যাম্প আয়োজনের ক্ষেত্রে যে বাজেট বরাদ্দ করা হয়, তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল অথবা বিতরণে বিলম্বের কারণে কার্যকারিতা হারায়। এই পরিস্থিতিতে, World Bank এবং ADB-এর মতো আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাগুলো যদিও সরাসরি ফুটবলের তৃণমূল উন্নয়নে অর্থায়ন করে না, তবে তাদের প্রকল্প ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মানদণ্ডগুলো ফিফা ফান্ডের ক্ষেত্রে অনুসরণ করা গেলে দুর্নীতি ও অপচয় অনেকটাই কমানো সম্ভব হতো।

তৃণমূল ফুটবলের উন্নয়নে অবকাঠামোগত দুর্বলতা একটি প্রকট সমস্যা। সারাদেশে প্রায় প্রতিটি জেলাতেই স্টেডিয়াম থাকলেও, সেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ এবং নিয়মিত ব্যবহারের অভাবে অনেকগুলোই জীর্ণদশায় পতিত। নতুন খেলার মাঠ তৈরি করা বা বিদ্যমান মাঠগুলোর মানোন্নয়নের জন্য ফিফা ফান্ড থেকে অর্থ বরাদ্দ করা হলেও, স্থানীয় পর্যায়ে ভূমি অধিগ্রহণ, নির্মাণ কাজের ধীরগতি এবং নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রীর ব্যবহার প্রায়শই প্রকল্পের উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করে। এই সমস্যাগুলো শুধুমাত্র অর্থায়নের অভাবে নয়, বরং সুপরিকল্পিত বাস্তবায়ন ও তদারকির অভাবেও সৃষ্ট। বাংলাদেশ সরকার ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন সময়ে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের ক্রীড়া অবকাঠামো উন্নয়নে প্রকল্প হাতে নিয়েছে, কিন্তু ফিফা ফান্ডের সাথে এর সমন্বয় প্রায়শই অনুপস্থিত। এর ফলে, ফিফা থেকে আসা অর্থের একটি বড় অংশ অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যয় হয়ে যায়, যা শেষ পর্যন্ত তৃণমূল পর্যায়ে নতুন প্রতিভা অন্বেষণ বা খেলোয়াড়দের মানোন্নয়নে কোনো দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলে না। ফলে, দেশের ক্রীড়াঙ্গনে, বিশেষ করে ফুটবলে, আন্তর্জাতিক মানের খেলোয়াড় তৈরি হওয়ার প্রক্রিয়াটি বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

বছর ফিফা ফরোয়ার্ড ফান্ড (মিলিয়ন USD) তৃণমূল পর্যায়ের লিগ আয়োজন (সংখ্যা) জাতীয় দলে তৃণমূল খেলোয়াড়ের অংশগ্রহণ (%)
২০১৮ ১.২৫ ৫৬ ১২
২০১৯ ১.৬৭ ৪৯ ১০
২০২০ ২.৫০ ৩০ ৮
২০২১ ২.০০ ৩৩ ৭
২০২২ ১.৫০ ৩৮ ৯

উৎস: ফিফা ফরোয়ার্ড প্রোগ্রাম রিপোর্ট, বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) বার্ষিক প্রতিবেদন এবং জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ।

সুপারিশ

  • ফিফা ফান্ডের অর্থ ব্যবহারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সরকারের ক্রীড়া মন্ত্রণালয়কে একটি স্বাধীন অডিট কমিটি গঠন করতে হবে, যা 'সরকারি অর্থ ও হিসাব আইন, ২০০২' এবং 'জাতীয় ক্রীড়া নীতিমালা ২০১৯'-এর অধীনে পরিচালিত হবে এবং নিয়মিতভাবে বাফুফের আর্থিক লেনদেন নিরীক্ষা করবে।
  • তৃণমূল পর্যায়ে ফুটবল লিগ এবং প্রশিক্ষণ কর্মসূচী নিয়মিত ও কার্যকরভাবে আয়োজনের জন্য প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় 'জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ অধ্যাদেশ, ১৯৮১' অনুসারে গঠিত ক্রীড়া সংস্থাগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে এবং ফিফা ফান্ডের কমপক্ষে ৫০% সরাসরি মাঠ পর্যায়ের ক্লাব ও একাডেমিতে সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষক নিয়োগের জন্য বরাদ্দ করতে হবে, যা জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সরকারের তদারকিতে বাস্তবায়িত হবে।
  • ফুটবল অবকাঠামোর উন্নয়নে ফিফা ফান্ডের অর্থায়নে নির্মিত বা সংস্কারকৃত প্রতিটি প্রকল্পের জন্য 'পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন, ২০০৬' এবং 'পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা, ২০০৮' অনুসরণ করে একটি ডিজিটাল ট্র্যাকিং সিস্টেম চালু করতে হবে, যা নির্মাণ কাজের অগ্রগতি, মান এবং ব্যয় সংক্রান্ত তথ্য জনসম্মুখে প্রকাশ করবে এবং World Bank এর প্রকল্প বাস্তবায়ন নির্দেশিকা অনুসরণ করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: জাহিদ রিজভি

জাহিদ রিজভি 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: ফুটবলের তৃণমূল উন্নয়ন ও ফিফা ফান্ডিং। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

نظری یافت نشد


News Card Generator