এআই ও ডিপফেক: মিসইনফরমেশন ছড়ানোর নতুন অস্ত্র ও ফ্যাক্ট-চেকারদের চ্যালেঞ্জ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

এআই ও ডিপফেক: মিসইনফরমেশন ছড়ানোর নতুন অস্ত্র ও ফ্যাক্ট-চেকারদের চ্যালেঞ্জ

তানজিনা ইয়াসমিন  avatar   
তানজিনা ইয়াসমিন
এআই ও ডিপফেক: মিসইনফরমেশন ছড়ানোর নতুন অস্ত্র ও ফ্যাক্ট-চেকারদের চ্যালেঞ্জ
এআই ও ডিপফেক: মিসইনফরমেশন ছড়ানোর নতুন অস্ত্র ও ফ্যাক্ট-চেকারদের চ্যালেঞ্জ
ছবি: সংগৃহীত
কলামিস্ট: তানজিনা ইয়াসমিন | জ্যেষ্ঠ বিষয়ভিত্তিক গবেষক (খাত: মিসইনফরমেশন ও ফ্যাক্ট-চেকিং)
📰 বিশেষ মতামত ও কলাম

কলামিস্ট: তানজিনা ইয়াসমিন | জ্যেষ্ঠ বিষয়ভিত্তিক গবেষক (খাত: মিসইনফরমেশন ও ফ্যাক্ট-চেকিং)

সম্প্রতি, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) একটি জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে যে, ২০২৪ সালের প্রথম তিন মাসেই তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারিত প্রায় ৩০০টি এআই-জেনারেটেড ডিপফেক ভিডিও ও অডিও শনাক্ত করেছে, যার বেশিরভাগই ছিল রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও গণমাধ্যম কর্মীদের টার্গেট করে তৈরি করা। এই ঘটনা কেবল একটি বিচ্ছিন্ন উপাত্ত নয়, বরং মিসইনফরমেশন ছড়ানোর ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও ডিপফেক প্রযুক্তির ক্রমবর্ধমান ভয়াবহতার একটি সুস্পষ্ট ইঙ্গিত। গত জাতীয় নির্বাচনের সময়কালে একই ধরনের প্রযুক্তির ব্যবহার ব্যাপক হারে পরিলক্ষিত হয়েছিল, যেখানে অসত্য তথ্য দিয়ে ভোটারদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করা হয়। এই ডিজিটাল হুমকি এখন শুধু গুজব ছড়ানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি সমাজের আস্থা, স্থিতিশীলতা এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।

এআই-এর মাধ্যমে ডিপফেক তৈরির ক্ষমতা এতটাই পরিশীলিত হয়েছে যে, সাধারণ মানুষের পক্ষে আসল ও নকলের পার্থক্য নির্ণয় করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বিশেষত, পাবলিক ফিগারদের ছবি, কণ্ঠস্বর ও ভিডিও ব্যবহার করে এমন সব অসত্য বিবৃতি তৈরি করা হচ্ছে যা তাদের সম্মানহানি ঘটাচ্ছে এবং জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে। ওয়ার্ল্ড ব্যাংক (World Bank) এবং এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (ADB) তাদের সাম্প্রতিক ডিজিটাল গভর্নেন্স রিপোর্টে উল্লেখ করেছে যে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে ডিজিটাল বিভাজন এবং প্রযুক্তিগত সচেতনতার অভাব ডিপফেক জনিত মিসইনফরমেশনের বিস্তারকে আরও ত্বরান্বিত করছে। তারা আরও দেখিয়েছে যে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলো, যেমন ফেসবুক ও ইউটিউব, এই ধরনের কন্টেন্ট দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে, কারণ তাদের অ্যালগরিদম প্রায়শই বিতর্কিত ও আবেগপ্রবণ কন্টেন্টকে বেশি গুরুত্ব দেয়। এই সমস্যা মোকাবেলায় ফ্যাক্ট-চেকারদের ওপর চাপ বাড়ছে, কারণ প্রতিটি ডিপফেক কন্টেন্ট যাচাই করতে যে পরিমাণ সময় ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা প্রয়োজন, তা প্রায়শই বিদ্যমান সংস্থানগুলোর আওতার বাইরে চলে যাচ্ছে। গত এক বছরে, বাংলাদেশের মূলধারার গণমাধ্যমগুলোকেও বেশ কয়েকটি ডিপফেক ভিডিওর সত্যতা যাচাই করতে গিয়ে হিমশিম খেতে হয়েছে, যা তাদের বিশ্বাসযোগ্যতাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।

এই চ্যালেঞ্জের মূলে রয়েছে ডিপফেক প্রযুক্তির সহজলভ্যতা এবং এর দ্রুত বিবর্তন। ওপেন-সোর্স এআই টুলস এবং মেশিন লার্নিং মডেলগুলোর কারণে এখন যে কেউ তুলনামূলক কম প্রযুক্তিগত জ্ঞান নিয়েও উচ্চমানের ডিপফেক তৈরি করতে পারছে। এর ফলে, মিসইনফরমেশনের উৎপাদকরা প্রচলিত পদ্ধতি যেমন ফটোশপ বা ভিডিও এডিটিং-এর চেয়ে অনেক বেশি বাস্তবসম্মত এবং বিশ্বাসযোগ্য কন্টেন্ট তৈরি করতে পারছে। উদাহরণস্বরূপ, একটি ভয়েস ক্লোনিং টুল দিয়ে মাত্র কয়েক সেকেন্ডের অডিও স্যাম্পল ব্যবহার করে যেকোনো ব্যক্তির কণ্ঠস্বর নকল করা সম্ভব, যা টেলিফোন কেলেঙ্কারি বা ফিশিং আক্রমণের মতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডেও ব্যবহৃত হচ্ছে। বাংলাদেশ সরকারের ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এই বিপদ সম্পর্কে অবগত এবং তারা সাইবার নিরাপত্তা জোরদার করার জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছেন। তবে, প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সাথে তাল মিলিয়ে আইন প্রণয়ন এবং প্রয়োগের ক্ষেত্রে এখনও যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। ফ্যাক্ট-চেকিং সংস্থাগুলো, যেমন বিডি ফ্যাক্টচেক বা ডিসইনফো ল্যাব, প্রায়শই সীমিত বাজেট এবং জনবল নিয়ে কাজ করে, যা তাদের পক্ষে সকল ডিপফেক মোকাবেলা করা কঠিন করে তোলে। এছাড়া, ডিপফেক কন্টেন্ট শনাক্তকরণের জন্য যে ধরনের উন্নত এআই-ভিত্তিক টুলস প্রয়োজন, তা এখনও বাংলাদেশের বেশিরভাগ ফ্যাক্ট-চেকিং সংস্থার কাছে সহজলভ্য নয়। এই প্রযুক্তিগত অসামঞ্জস্য মিসইনফরমেশন ছড়ানোকারীদের একতরফা সুবিধা দিচ্ছে।

সাল শনাক্তকৃত ডিপফেক/এআই-জেনারেটেড মিসইনফরমেশন (আনুমানিক) ফ্যাক্ট-চেকিং সংস্থার সংখ্যা (বাংলাদেশে) ডিজিটাল সাক্ষরতার হার (বাংলাদেশ, %)
২০২০ ১০০-১৫০ ৫ ৩৫%
২০২১ ৩০০-৪০০ ৭ ৪০%
২০২২ ৭০০-৮০০ ৯ ৪৫%
২০২৩ ১৫০০-২০০০+ ১২ ৫০%
২০২৪ (প্রথম ত্রৈমাসিক) ৯০০+ ১২ ৫২%

উৎস: বিটিআরসি, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, World Bank ডিজিটাল ডেভেলপমেন্ট রিপোর্ট (২০২২-২০২৩), স্থানীয় ফ্যাক্ট-চেকিং সংস্থাগুলোর বার্ষিক প্রতিবেদন।

সুপারিশ

  • বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়কে অবিলম্বে একটি জাতীয় 'ডিজিটাল কন্টেন্ট ভেরিফিকেশন সেন্টার' প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যা অত্যাধুনিক এআই-ভিত্তিক ডিপফেক শনাক্তকরণ সফটওয়্যার (যেমন Deepfake Detection Challenge বা Media Forensics-এর আদলে) এবং বিশেষজ্ঞ জনবল দ্বারা সজ্জিত থাকবে। এই কেন্দ্রটি সকল গণমাধ্যম ও ফ্যাক্ট-চেকিং সংস্থাকে প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করবে এবং দ্রুত ভুয়া কন্টেন্ট শনাক্ত করে তা অপসারণের জন্য বিটিআরসি ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলোর সাথে সমন্বয় সাধন করবে।
  • বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রণীত 'ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮' (কিংবা প্রস্তাবিত 'সাইবার নিরাপত্তা আইন')-এর অধীনে ডিপফেক ও এআই-জেনারেটেড মিসইনফরমেশন ছড়ানোর জন্য সুনির্দিষ্ট ও কঠোর শাস্তির বিধান যুক্ত করতে হবে। এই বিধানে শুধুমাত্র কন্টেন্ট তৈরি ও প্রচারকারী নয়, বরং এর পেছনে আর্থিক বা প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তাকারীদেরও জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে এবং ওয়ার্ল্ড ব্যাংক ও ADB-এর সুপারিশকৃত 'Responsible AI Governance Framework' অনুসরণ করে একটি নৈতিক নির্দেশিকা তৈরি ও বাস্তবায়ন করতে হবে।
  • জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)-এর মাধ্যমে প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত ডিজিটাল সাক্ষরতা ও মিডিয়া লিটারেসি শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করতে হবে। এই শিক্ষায় শিক্ষার্থীদেরকে এআই ও ডিপফেক প্রযুক্তির ঝুঁকি, ভুয়া খবর শনাক্তকরণের কৌশল এবং নির্ভরযোগ্য তথ্যের উৎস যাচাই করার পদ্ধতি সম্পর্কে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দিতে হবে, যাতে তারা ইন্টারনেটে প্রাপ্ত তথ্যের সত্যতা সম্পর্কে সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে পারে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: তানজিনা ইয়াসমিন

তানজিনা ইয়াসমিন 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: মিসইনফরমেশন ও ফ্যাক্ট-চেকিং। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

没有找到评论


News Card Generator