সেমিকন্ডাক্টর যুদ্ধ: প্রযুক্তি মানচিত্রে চীন-মার্কিন স্নায়ুযুদ্ধের… | আই নিউজ বিডি

সেমিকন্ডাক্টর যুদ্ধ: প্রযুক্তি মানচিত্রে চীন-মার্কিন স্নায়ুযুদ্ধের নতুন ফ্রন্ট

ফারহান ফুয়াদ  avatar   
ফারহান ফুয়াদ
সেমিকন্ডাক্টর যুদ্ধ: প্রযুক্তি মানচিত্রে চীন-মার্কিন স্নায়ুযুদ্ধের নতুন ফ্রন্ট
সেমিকন্ডাক্টর যুদ্ধ: প্রযুক্তি মানচিত্রে চীন-মার্কিন স্নায়ুযুদ্ধের নতুন ফ্রন্ট
ছবি: সংগৃহীত
কলামিস্ট: ফারহান ফুয়াদ | জ্যেষ্ঠ বিষয়ভিত্তিক গবেষক (খাত: যুক্তরাষ্ট্র-চীন অর্থনৈতিক স্নায়ুযুদ্ধ)
📰 বিশেষ মতামত ও কলাম

কলামিস্ট: ফারহান ফুয়াদ | জ্যেষ্ঠ বিষয়ভিত্তিক গবেষক (খাত: যুক্তরাষ্ট্র-চীন অর্থনৈতিক স্নায়ুযুদ্ধ)

ওয়াশিংটন ডিসি থেকে গত বছরের অক্টোবরে ঘোষিত এক নতুন রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ নীতি বৈশ্বিক প্রযুক্তি সরবরাহ শৃঙ্খলে এক নতুন ঢেউ তুলেছে, যা চীনের সেমিকন্ডাক্টর খাতের অগ্রগতিকে সরাসরি লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে। মার্কিন বাণিজ্য মন্ত্রণালয় (Department of Commerce) কর্তৃক আরোপিত এই বিধিনিষেধগুলো শুধু উন্নত চিপ তৈরিতে ব্যবহৃত সরঞ্জাম এবং প্রযুক্তির চীনা কোম্পানিগুলোতে সরবরাহ সীমিত করেনি, বরং চীনা নাগরিক ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে মার্কিন প্রযুক্তি ব্যবহার করে চিপ ডিজাইন বা উৎপাদনেও বাধা দিয়েছে। এই পদক্ষেপটি কেবল একটি বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত ছিল না, এটি ছিল বিশ্ব অর্থনীতির পরাশক্তিদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান প্রযুক্তিগত আধিপত্যের লড়াইয়ের একটি সুস্পষ্ট ঘোষণা, যা 'সেমিকন্ডাক্টর যুদ্ধ' হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে।

এই প্রযুক্তিগত সংঘাতের মূলে রয়েছে সেমিকন্ডাক্টর, যা আধুনিক প্রযুক্তির প্রাণভোমরা। ফাইভ-জি নেটওয়ার্ক, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), স্বয়ংক্রিয় যানবাহন এবং সামরিক প্রযুক্তিসহ প্রতিটি অত্যাধুনিক ব্যবস্থার জন্য সেমিকন্ডাক্টর অপরিহার্য। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখতে চীনের অত্যাধুনিক চিপ তৈরির সক্ষমতা সীমিত করতে চাইছে। এ লক্ষ্যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার CHIPS and Science Act-এর অধীনে প্রায় ৫২ বিলিয়ন ডলারের একটি বিশাল তহবিল ঘোষণা করেছে, যার উদ্দেশ্য হলো অভ্যন্তরীণ চিপ উৎপাদন এবং গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়ানো। এর পাশাপাশি, ASML এবং TSMC-এর মতো বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর জায়ান্টদের উপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে যাতে তারা চীনের প্রতি সংবেদনশীল প্রযুক্তি সরবরাহ বন্ধ করে। এই নীতিগত চাপ এমন এক জায়গায় পৌঁছেছে যেখানে বেইজিং এখন বাধ্য হচ্ছে শত শত বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে নিজস্ব চিপ শিল্প গড়ে তুলতে, যা 'ডুয়াল সার্কুলেশন' অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

অন্যদিকে, চীন তার 'মেড ইন চায়না ২০২৫' (Made in China 2025) মহাপরিকল্পনার অধীনে সেমিকন্ডাক্টর স্বনির্ভরতার উপর জোর দিয়েছে। দেশটি ২০২৫ সালের মধ্যে চিপের চাহিদার ৭০ শতাংশ স্থানীয়ভাবে পূরণ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এ লক্ষ্য অর্জনে, চীনা সরকার এবং রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন উদ্যোগগুলো সেমিকন্ডাক্টর গবেষণা, উন্নয়ন এবং উৎপাদনে অভূতপূর্ব বিনিয়োগ করছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো SMIC (Semiconductor Manufacturing International Corporation) এবং Huawei, যারা মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মুখেও নিজস্ব চিপ ডিজাইনিং এবং উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে। এই পদক্ষেপগুলো কেবল চীনের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য জরুরি নয়, বরং এটি ভূ-রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রদর্শনের একটি মাধ্যমও। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (Ministry of Foreign Affairs) বারবার এই মার্কিন নিষেধাজ্ঞাকে 'প্রযুক্তিগত স্বৈরাচার' আখ্যা দিয়ে এর নিন্দা জানিয়েছে, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তির লঙ্ঘন বলে তারা দাবি করে। এটি আঞ্চলিক জোট যেমন সার্ক (SAARC) এবং BIMSTEC-এর মতো প্ল্যাটফর্মেও আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে উঠেছে, যেখানে সদস্য দেশগুলো বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের বিভাজন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

এই প্রযুক্তিগত স্নায়ুযুদ্ধ কেবল দুই পরাশক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এর প্রভাব বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে। দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো অন্যান্য প্রধান প্রযুক্তি উৎপাদনকারী দেশগুলো উভয় পক্ষের চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। তারা একদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৌশলগত জোট বজায় রাখতে চায়, আবার অন্যদিকে চীনের বিশাল বাজার হারানো এড়াতে চায়। এর ফলে, বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলগুলো নতুন করে বিন্যস্ত হচ্ছে, যেখানে 'ফ্রেন্ড-শোরিং' এবং 'নিয়ার-শোরিং' ধারণাগুলো গুরুত্ব পাচ্ছে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা (UN Peacekeeping) কার্যক্রমের মতো বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোও পরোক্ষভাবে এই প্রযুক্তিগত বিভাজনের কারণে প্রভাবিত হতে পারে, কারণ অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি এবং নজরদারি ব্যবস্থার উপর নিয়ন্ত্রণ পরাশক্তিগুলোর কূটনৈতিক ক্ষমতাকে প্রভাবিত করে।

সূচক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (২০২২) চীন (২০২২) বিশ্ববাজারের হিস্যা (২০২২)
গ্লোবাল সেমিকন্ডাক্টর রেভিনিউ শেয়ার ৫০.৪% ১২.৭% ১০০%
সেমিকন্ডাক্টর R&D বিনিয়োগ (বিলিয়ন USD) ৯১.৪ ৩২.১ ১৯০.১
উন্নত চিপ উৎপাদন সক্ষমতা (ন্যানোমিটার) ৭nm ও তার নিচে (সীমিত) ১৪nm (মূলত), ৭nm (প্রচেষ্টা) --
CHIPS Act বরাদ্দ (বিলিয়ন USD) ৫২.৭ -- --

উৎস: Semiconductor Industry Association (SIA), Rhodium Group, CSIS

সুপারিশ

  • দ্বিপাক্ষিক এবং বহুপাক্ষিক ফোরামে, যেমন সার্ক এবং BIMSTEC এর মতো আঞ্চলিক সংস্থাগুলোতে, সদস্য দেশগুলোর উচিত সেমিকন্ডাক্টর সরবরাহ শৃঙ্খলে স্থিতিশীলতা এবং বৈচিত্র্য আনতে যৌথ নীতি প্রণয়ন করা। এর মাধ্যমে কোনো একক পরাশক্তির উপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমানো যেতে পারে।
  • জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা (UN Peacekeeping) কার্যক্রমের মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে সাইবার নিরাপত্তা এবং প্রযুক্তিগত স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করার জন্য সদস্য রাষ্ট্রগুলোর উচিত একটি আন্তর্জাতিক প্রযুক্তিগত মানদণ্ড এবং সহযোগিতা ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করা। এটি সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এবং প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধে সহায়ক হবে।
  • মার্কিন বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় উভয়কেই বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (WTO) এর অধীনে একটি প্রযুক্তিগত বাণিজ্য সংলাপ শুরু করতে উৎসাহিত করা উচিত, যেখানে সেমিকন্ডাক্টর রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ এবং প্রযুক্তি স্থানান্তরের নীতিগুলো নিয়ে স্বচ্ছ আলোচনা হতে পারে। এটি বৈশ্বিক বাণিজ্য সম্পর্ককে স্থিতিশীল করতে এবং অপ্রয়োজনীয় উত্তেজনা কমাতে সাহায্য করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ফারহান ফুয়াদ

ফারহান ফুয়াদ 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: যুক্তরাষ্ট্র-চীন অর্থনৈতিক স্নায়ুযুদ্ধ। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

نظری یافت نشد


News Card Generator