বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলা কূটনীতি: সেমিকন্ডাক্টর দৌড়ে বাংলাদেশের অবস্থান ও কৌশলগত চ্যালেঞ্জ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলা কূটনীতি: সেমিকন্ডাক্টর দৌড়ে বাংলাদেশের অবস্থান ও কৌশলগত চ্যালেঞ্জ

সালাহউদ্দিন আহমেদ  avatar   
সালাহউদ্দিন আহমেদ
বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলা কূটনীতি: সেমিকন্ডাক্টর দৌড়ে বাংলাদেশের অবস্থান ও কৌশলগত চ্যালেঞ্জ
বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলা কূটনীতি: সেমিকন্ডাক্টর দৌড়ে বাংলাদেশের অবস্থান ও কৌশলগত চ্যালেঞ্জ
ছবি: সংগৃহীত
কলামিস্ট: সালাহউদ্দিন আহমেদ | জ্যেষ্ঠ বিষয়ভিত্তিক গবেষক (খাত: বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলা কূটনীতি)
📰 বিশেষ মতামত ও কলাম

কলামিস্ট: সালাহউদ্দিন আহমেদ | জ্যেষ্ঠ বিষয়ভিত্তিক গবেষক (খাত: বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলা কূটনীতি)

২০২২ সালের চিপস অ্যান্ড সাইন্স অ্যাক্টের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র যখন অর্ধপরিবাহী (সেমিকন্ডাক্টর) উৎপাদনে ৫২ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ ঘোষণা করে, তখন বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলা কূটনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। এই পদক্ষেপ কেবল ওয়াশিংটনের অভ্যন্তরীণ শিল্প পুনরুত্থানের ইঙ্গিত দেয়নি, বরং এটি ভূ-রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর প্রযুক্তিগত আধিপত্য বজায় রাখার এক স্পষ্ট কূটনৈতিক বার্তা ছিল। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও প্রযুক্তি স্থানান্তরে, যেখানে বাংলাদেশও তার কৌশলগত অবস্থান নিয়ে ভাবনায় পড়েছে।

বর্তমানে, সেমিকন্ডাক্টর শিল্প বৈশ্বিক অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ফাইভ-জি প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং আধুনিক ইলেক্ট্রনিক্সের প্রতিটি ক্ষেত্রে এর অপরিহার্যতা অনস্বীকার্য। বিশ্বব্যাংকের এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক চিপ বাজারের আকার ১ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। এই প্রতিযোগিতামূলক পরিস্থিতিতে, বাংলাদেশ তার 'ডিজিটাল বাংলাদেশ' রূপকল্প বাস্তবায়নে সেমিকন্ডাক্টর সরবরাহ শৃঙ্খলার ওপর ক্রমবর্ধমান নির্ভরশীলতার কারণে এক জটিল কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। যেখানে তাইওয়ানের টিএসএমসি এবং দক্ষিণ কোরিয়ার স্যামসাং-এর মতো জায়ান্টরা বৈশ্বিক উৎপাদনের সিংহভাগ নিয়ন্ত্রণ করে, সেখানে সরবরাহ শৃঙ্খলার যেকোনো বিঘ্ন বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য মারাত্মক অর্থনৈতিক ও কৌশলগত পরিণতি ডেকে আনতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, কোভিড-১৯ মহামারীর সময় সেমিকন্ডাক্টর ঘাটতি বৈশ্বিক অটোমোবাইল শিল্পে কয়েক বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি সাধন করেছিল এবং ইলেক্ট্রনিক্স পণ্যের মূল্য অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি করেছিল, যা বাংলাদেশের ভোক্তা বাজারকেও প্রভাবিত করেছিল। এই প্রেক্ষাপটে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অংশীদারদের সাথে সেমিকন্ডাক্টর সরবরাহ শৃঙ্খলা স্থিতিশীল রাখার জন্য বহুমুখী কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করতে হচ্ছে, যা কেবল বাণিজ্যিক চুক্তি নয়, বরং প্রযুক্তিগত সহযোগিতা ও বিনিয়োগ আকর্ষণের ওপরও গুরুত্বারোপ করছে।

বাংলাদেশের জন্য সেমিকন্ডাক্টর দৌড়ে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করা কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের বিষয় নয়, বরং এটি জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত সার্বভৌমত্বের প্রশ্নও বটে। যদিও বাংলাদেশ এখনো সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন শিল্পে প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে, তবে এর ডিজাইন ও টেস্টিং খাতে কিছু অগ্রগতি লক্ষণীয়। বিশেষ করে, তৃতীয় পক্ষের সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন হাউসের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রকৌশলীরা বৈশ্বিক চিপ ডিজাইনে অবদান রাখছেন। এই প্রেক্ষাপটে, BIMSTEC (বে অব বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ ফর মাল্টি-সেক্টরাল টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশন) এর মতো আঞ্চলিক জোটগুলোর মাধ্যমে সেমিকন্ডাক্টর সরবরাহ শৃঙ্খলায় আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করা একটি কার্যকর কৌশল হতে পারে। BIMSTEC সদস্য দেশগুলোর মধ্যে প্রযুক্তি বিনিময়, যৌথ গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ এবং শুল্কমুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সেমিকন্ডাক্টর পণ্যের নির্বিঘ্ন প্রবাহ নিশ্চিত করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। উপরন্তু, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন (UN Peacekeeping) এ বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের সফল অংশগ্রহণ দেশের কূটনৈতিক ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে, যা উন্নত দেশগুলোর সাথে প্রযুক্তিগত অংশীদারিত্বের আলোচনায় একটি ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বাংলাদেশের এই বহুপাক্ষিক সম্পৃক্ততা সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তির মতো সংবেদনশীল খাতে নির্ভরযোগ্য সরবরাহকারী ও অংশীদারদের আকর্ষণ করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে, যেখানে নিরাপত্তা ও আস্থা একটি বড় বিষয়। তবে, সার্ক (সাউথ এশিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর রিজিওনাল কো-অপারেশন) এর সাম্প্রতিক স্থবিরতা এই অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে বৃহত্তর প্রযুক্তিগত সমন্বয় সাধনে একটি বড় চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে, যা বাংলাদেশকে বিকল্প আঞ্চলিক ও দ্বিপাক্ষিক কূটনৈতিক পথ খুঁজতে বাধ্য করছে।

সূচক ২০১৮ ২০২০ ২০২২ ২০২৪ (প্রাক্কলিত)
বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর বাজার আকার (বিলিয়ন USD) ৪৭৪ ৪৪০ ৫৭৪ ৬০০-৬৫০
বাংলাদেশের ইলেক্ট্রনিক্স আমদানিতে সেমিকন্ডাক্টরের অংশ (%) ২৫ ২৮ ৩২ ৩৫
সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তিতে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ (FDI) (মিলিয়ন USD) ৫ ১০ ১৫ ২০

উৎস: ওয়ার্ল্ড সেমিকন্ডাক্টর ট্রেড স্ট্যাটিস্টিক্স (WSTS), বাংলাদেশ ব্যাংক, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় (প্রাক্কলিত তথ্য)।

সুপারিশ

  • পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার জন্য একটি সমন্বিত 'টেক-ডিপ্লোমেসি' ইউনিট গঠন করতে হবে, যা বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (BIDA) এর সাথে যৌথভাবে কাজ করবে এবং উন্নত দেশগুলোর সাথে দ্বিপাক্ষিক প্রযুক্তি স্থানান্তর চুক্তি (Technology Transfer Agreement) সম্পাদনে অগ্রাধিকার দেবে।
  • BIMSTEC প্ল্যাটফর্মকে ব্যবহার করে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন, টেস্টিং এবং প্যাকেজিং খাতে যৌথ গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) প্রকল্প চালু করতে হবে এবং এর জন্য BIMSTEC প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন তহবিল (Technology and Innovation Fund) গঠনের প্রস্তাব দিতে হবে।
  • জাতীয় সেমিকন্ডাক্টর কৌশল (National Semiconductor Strategy) প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে স্থানীয়ভাবে সেমিকন্ডাক্টর প্রকৌশলী তৈরিতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিশেষায়িত কোর্স চালু এবং শিল্প-একাডেমি সহযোগিতার জন্য বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের আওতায় একটি 'সেমিকন্ডাক্টর ইনোভেশন হাব' প্রতিষ্ঠা করার সুনির্দিষ্ট রূপরেখা থাকবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: সালাহউদ্দিন আহমেদ

সালাহউদ্দিন আহমেদ 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলা কূটনীতি। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

没有找到评论


News Card Generator