পশ্চিমা শিক্ষাব্যবস্থা ও বাংলাদেশের মেধা পাচার: উচ্চশিক্ষার প্রলোভন নাকি স্থায়ী নির্বাসন? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

পশ্চিমা শিক্ষাব্যবস্থা ও বাংলাদেশের মেধা পাচার: উচ্চশিক্ষার প্রলোভন নাকি স্থায়ী নির্বাসন?

ড. জহিরুল ইসলাম  avatar   
ড. জহিরুল ইসলাম
পশ্চিমা শিক্ষাব্যবস্থা ও বাংলাদেশের মেধা পাচার: উচ্চশিক্ষার প্রলোভন নাকি স্থায়ী নির্বাসন?
পশ্চিমা শিক্ষাব্যবস্থা ও বাংলাদেশের মেধা পাচার: উচ্চশিক্ষার প্রলোভন নাকি স্থায়ী নির্বাসন?
ছবি: সংগৃহীত
কলামিস্ট: ড. জহিরুল ইসলাম | জ্যেষ্ঠ বিষয়ভিত্তিক গবেষক (খাত: ব্রেন ড্রেন ও মেধা পাচার)
📰 বিশেষ মতামত ও কলাম

কলামিস্ট: ড. জহিরুল ইসলাম | জ্যেষ্ঠ বিষয়ভিত্তিক গবেষক (খাত: ব্রেন ড্রেন ও মেধা পাচার)

সম্প্রতি বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC) প্রকাশিত সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে ডিগ্রি নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমানো শিক্ষার্থীর সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা দেশের দীর্ঘমেয়াদী মানবসম্পদ পরিকল্পনায় এক বড় ধরনের ফাটল সৃষ্টি করছে। এই প্রতিবেদনে দেখা গেছে, প্রতি বছর গড়ে প্রায় ১০-১৫ হাজার শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাচ্ছেন, যাদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আর দেশে ফিরে আসছেন না। এই পরিসংখ্যান কেবল একটি সংখ্যা নয়, এটি আমাদের জাতীয় মেধার অবক্ষয় এবং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রতি এক নীরব হুমকি।

এই মেধা পাচারের মূল কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার সাথে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের চাহিদার অসামঞ্জস্যতা। কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর এবং জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) তাদের বিভিন্ন প্রতিবেদনে বারবার উল্লেখ করেছে যে, বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে পাস করা শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশের দক্ষতা আন্তর্জাতিক মানের নয়। উদাহরণস্বরূপ, সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট বা ডেটা সায়েন্সের মতো দ্রুত পরিবর্তনশীল ক্ষেত্রগুলোতে আধুনিক কারিকুলামের অভাব এবং ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের অপ্রতুলতা শিক্ষার্থীদের বিদেশে উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। পশ্চিমা দেশগুলোর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আধুনিক গবেষণার সুযোগ, উন্নত ল্যাব সুবিধা এবং বৈশ্বিক নেটওয়ার্কিংয়ের সম্ভাবনা তরুণ মেধাবীদের কাছে এক অনতিক্রম্য প্রলোভন হিসেবে কাজ করে। এর ফলে, দেশের অর্থনীতি যে দক্ষ মানবসম্পদের অভাবে ভুগছে, তা স্পষ্ট। বিশেষ করে, Sustainable Enterprise Project (SEIP) এর মতো প্রকল্পগুলো দেশের কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে সচেষ্ট হলেও, উচ্চশিক্ষিত মেধাবীদের ধরে রাখতে পারছে না, যা বিনিয়োগের কার্যকরিতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

মেধা পাচারের এই ধারা দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোতে দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। BANBEIS (বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো) এর তথ্য অনুযায়ী, উচ্চশিক্ষা শেষে বিদেশে পাড়ি জমানো শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ STEM (বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত) ব্যাকগ্রাউন্ডের, যা দেশের গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) খাতে শূন্যতা তৈরি করছে। দেশের শিল্প-কারখানাগুলোতে উদ্ভাবনী সমাধান এবং নতুন প্রযুক্তির প্রয়োগের জন্য এই মেধাবীদের উপস্থিতি অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু তারা যখন বিদেশে চলে যাচ্ছেন, তখন দেশীয় শিল্প খাত আধুনিকীকরণের পথে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং বিদেশি প্রযুক্তির উপর নির্ভরতা বাড়ছে। এই প্রবণতা কেবল অর্থনৈতিক ক্ষতিই নয়, এটি দেশের আত্মনির্ভরশীলতা এবং উদ্ভাবনী সক্ষমতাকেও দুর্বল করে দিচ্ছে। উপরন্তু, বিদেশে যাওয়া শিক্ষার্থীদের পরিবার ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্নতা সামাজিক বন্ধনগুলোকেও প্রভাবিত করছে, যা দীর্ঘমেয়াদী সামাজিক অস্থিরতার কারণ হতে পারে।

সাল বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণকারী বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা দেশে ফিরে আসা শিক্ষার্থীর শতাংশ (আনুমানিক) STEM ক্ষেত্রে বিদেশে যাওয়া শিক্ষার্থীর শতাংশ
২০১৮-১৯ ৯,৭৫০ ৩০% ৫২%
২০১৯-২০ ১১,৩২০ ২৫% ৫৪%
২০২০-২১ ১০,৯৮০ ২২% ৫৬%
২০২১-২২ ১২,৫০০ ১৮% ৫৮%
২০২২-২৩ ১৫,১০০ ১৫% ৬০%

উৎস: বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC) বার্ষিক প্রতিবেদন এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থার তথ্য বিশ্লেষণ

সুপারিশ

  • দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পাঠ্যক্রম আধুনিকীকরণ এবং শিল্প-কারখানাগুলোর চাহিদার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ করতে UGC-কে অবিলম্বে একটি বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে। এতে জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর-এর সাথে যৌথভাবে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর কোর্স ডিজাইন এবং ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের ওপর জোর দিতে হবে, যা শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের জন্য প্রস্তুত করবে।
  • সরকারকে উচ্চশিক্ষিত মেধাবীদের জন্য দেশে আকর্ষণীয় গবেষণা ও উন্নয়নের সুযোগ তৈরি করতে হবে। বিশেষ করে, Sustainable Enterprise Project (SEIP)-এর মতো প্রকল্পগুলোর মাধ্যমে গবেষণা অনুদান বৃদ্ধি, আধুনিক ল্যাব স্থাপন এবং আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা উচিত, যাতে তরুণ গবেষকরা দেশে থেকেই বৈশ্বিক মানের কাজ করার সুযোগ পান।
  • BANBEIS-কে মেধা পাচারের কারণ ও প্রভাব নিয়ে একটি বিস্তারিত ও নিয়মিত গবেষণা পরিচালনা করতে হবে। এই গবেষণার ফলাফলের ভিত্তিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে একটি সুনির্দিষ্ট 'মেধা ধরে রাখার নীতি' (Talent Retention Policy) প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে উচ্চশিক্ষিতদের জন্য আকর্ষণীয় কর্মসংস্থানের সুযোগ, সামাজিক নিরাপত্তা এবং উদ্ভাবনী পরিবেশ তৈরির জন্য দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা থাকবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ড. জহিরুল ইসলাম

ড. জহিরুল ইসলাম 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: ব্রেন ড্রেন ও মেধা পাচার। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Inga kommentarer hittades


News Card Generator