অসংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণে ডিজিটাল স্বাস্থ্য বিপ্লব: সম্ভাবনা, চ্যালেঞ্জ ও আগামী দিনের পথ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

অসংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণে ডিজিটাল স্বাস্থ্য বিপ্লব: সম্ভাবনা, চ্যালেঞ্জ ও আগামী দিনের পথ

ডা. তৌহিদ হাসান  avatar   
ডা. তৌহিদ হাসান
অসংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণে ডিজিটাল স্বাস্থ্য বিপ্লব: সম্ভাবনা, চ্যালেঞ্জ ও আগামী দিনের পথ
অসংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণে ডিজিটাল স্বাস্থ্য বিপ্লব: সম্ভাবনা, চ্যালেঞ্জ ও আগামী দিনের পথ
ছবি: সংগৃহীত
কলামিস্ট: ডা. তৌহিদ হাসান | জ্যেষ্ঠ বিষয়ভিত্তিক গবেষক (খাত: সংক্রামক ও অসংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণ)
📰 বিশেষ মতামত ও কলাম

কলামিস্ট: ডা. তৌহিদ হাসান | জ্যেষ্ঠ বিষয়ভিত্তিক গবেষক (খাত: সংক্রামক ও অসংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণ)

সম্প্রতি, বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত 'বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট' (অক্টোবর ২০২৩) প্রতিবেদনে অসংক্রামক ব্যাধি (NCDs) মোকাবেলায় ডিজিটাল স্বাস্থ্য সমাধানের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে যে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে অসংক্রামক ব্যাধির কারণে অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ জিডিপির প্রায় ৩.৫% পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে যদি কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়। এই গুরুতর অর্থনৈতিক ও জনস্বাস্থ্য সংকট নিরসনে ডিজিটাল স্বাস্থ্য প্রযুক্তির ব্যবহার একটি অপরিহার্য হাতিয়ার হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। বিশেষত, টেলিমেডিসিন, মোবাইল স্বাস্থ্য (mHealth) অ্যাপ্লিকেশন এবং আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI) ভিত্তিক ডায়াগনস্টিক টুলসগুলো অসংক্রামক ব্যাধি, যেমন — হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, ক্যান্সার এবং শ্বাসতন্ত্রের রোগসমূহ প্রতিরোধ, প্রাথমিক শনাক্তকরণ এবং ব্যবস্থাপনায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে। বাংলাদেশ সরকারও এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জাতীয় স্বাস্থ্য নীতিমালায় ডিজিটাল রূপান্তরের ওপর জোর দিচ্ছে, যার ফলে স্বাস্থ্যসেবা প্রান্তিক মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে এবং একই সাথে স্বাস্থ্যখাতে বিদ্যমান সীমিত সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত হচ্ছে।

ডিজিটাল স্বাস্থ্য বিপ্লব অসংক্রামক ব্যাধির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে একাধিক ফ্রন্টে কাজ করছে। প্রথমত, মোবাইল স্বাস্থ্য অ্যাপ্লিকেশনগুলো রোগীদের নিজেদের স্বাস্থ্য ডেটা (যেমন: রক্তচাপ, রক্তে শর্করার মাত্রা) নিয়মিত রেকর্ড করতে এবং চিকিৎসকদের কাছে পাঠাতে সহায়তা করছে, যা রোগের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণে এবং সময়োপযোগী চিকিৎসাগত হস্তক্ষেপ নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। উদাহরণস্বরূপ, ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য স্মার্টফোন অ্যাপ্লিকেশনগুলো তাদের খাদ্য গ্রহণ, ব্যায়াম এবং ইনসুলিন গ্রহণের ট্র্যাক রাখতে সাহায্য করে, যা রোগ ব্যবস্থাপনার মান উন্নত করে। একই সাথে, টেলিমেডিসিন প্ল্যাটফর্মগুলো গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ পেতে সক্ষম করছে, যেখানে ফিজিক্যাল অ্যাক্সেস প্রায়শই একটি বড় বাধা। এর ফলে, রোগীরা দ্রুত স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছেন এবং দীর্ঘমেয়াদী অসুস্থতাগুলো প্রাথমিক পর্যায়েই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে, যা উন্নত জীবনযাত্রার পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার উপর চাপ কমাচ্ছে। World Bank-এর তথ্য অনুযায়ী, নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে অসংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত প্রায় ৭০% রোগী প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়, যা ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে অনেকাংশে সমাধান করা সম্ভব।

তবে, এই সম্ভাবনার পাশাপাশি ডিজিটাল স্বাস্থ্যখাতে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জও বিদ্যমান। ডিজিটাল বিভাজন (digital divide) এর মধ্যে অন্যতম, যেখানে ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন ব্যবহারের সুযোগ সব স্তরের মানুষের কাছে সমানভাবে পৌঁছায়নি। বিশেষ করে, বয়স্ক জনগোষ্ঠী এবং স্বল্পশিক্ষিত মানুষেরা ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারে অনভ্যস্ত হওয়ায় এর সুফল থেকে বঞ্চিত হতে পারে। এছাড়া, ডেটা নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। সংবেদনশীল স্বাস্থ্য ডেটা সংরক্ষণে শক্তিশালী সাইবার নিরাপত্তা কাঠামো এবং ডেটা সুরক্ষা আইন না থাকলে রোগীদের আস্থা অর্জন করা কঠিন হবে। বাংলাদেশ সরকার, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। ADB (এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক) তাদের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে ডিজিটাল স্বাস্থ্য অবকাঠামো উন্নয়নে প্রায় ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ প্রয়োজন, যার একটি বড় অংশ ডেটা নিরাপত্তা এবং ব্যবহারকারীদের প্রশিক্ষণের জন্য বরাদ্দ করা উচিত। এই বিনিয়োগ ব্যতীত ডিজিটাল স্বাস্থ্য বিপ্লবের পূর্ণ সুফল অর্জন করা সম্ভব হবে না, এবং অসংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হতে পারে।

অসংক্রামক ব্যাধি সংক্রান্ত ডিজিটাল স্বাস্থ্য উদ্যোগের বর্তমান অবস্থা (বাংলাদেশ) ২০২২ ২০২৩ ২০২৪ (প্রক্ষেপিত)
টেলিমেডিসিন পরামর্শের সংখ্যা (লক্ষ) ১.৫ ৩.২ ৫.০
mHealth অ্যাপ ব্যবহারকারী (লক্ষ) ০.৮ ১.৭ ৩.০
প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ডিজিটাল স্বাস্থ্য প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মী (%) ১৫ ২৫ ৪০
অসংক্রামক ব্যাধি স্ক্রিনিংয়ে ডিজিটাল টুলের ব্যবহার (%) ৫ ১০ ২০

উৎস: স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, World Bank, ADB ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে সংকলিত।

সুপারিশ

  • জাতীয় ডিজিটাল স্বাস্থ্য কৌশল (National Digital Health Strategy) এর অধীনে 'সমন্বিত ই-স্বাস্থ্য নীতিমালা' প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা, যেখানে ডেটা সুরক্ষা আইন (যেমন: প্রস্তাবিত ডেটা সুরক্ষা আইন, ২০২৪) এবং সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ যৌথভাবে একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম তৈরি করবে।
  • প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোতে কর্মরত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য ডিজিটাল স্বাস্থ্য প্রযুক্তি ব্যবহারে (যেমন: টেলিমেডিসিন প্ল্যাটফর্ম, ইলেকট্রনিক স্বাস্থ্য রেকর্ড সিস্টেম) বাধ্যতামূলক ও নিয়মিত প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করা, যা স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তর কর্তৃক পরিচালিত হবে, এবং World Bank ও ADB-এর কারিগরি সহায়তা গ্রহণ করা।
  • গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবার সহজলভ্যতা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক 'ইউনিভার্সাল সার্ভিস অবলিগেশন ফান্ড' (USOF) ব্যবহার করে ইন্টারনেট অবকাঠামো সম্প্রসারণ এবং স্বল্পমূল্যে স্মার্টফোন ও ডেটা প্যাকেজ সরবরাহের জন্য বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (BTRC) এবং সংশ্লিষ্ট মোবাইল অপারেটরদের সাথে অংশীদারিত্ব স্থাপন করা।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ডা. তৌহিদ হাসান

ডা. তৌহিদ হাসান 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: সংক্রামক ও অসংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণ। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Nessun commento trovato


News Card Generator