ঘরোয়া ক্রীড়া একাডেমির অনুদান: প্রতিশ্রুতি ও প্রাপ্তির ফারাক কেন? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

ঘরোয়া ক্রীড়া একাডেমির অনুদান: প্রতিশ্রুতি ও প্রাপ্তির ফারাক কেন?

কামরুল ইসলাম  avatar   
কামরুল ইসলাম
ঘরোয়া ক্রীড়া একাডেমির অনুদান: প্রতিশ্রুতি ও প্রাপ্তির ফারাক কেন?
ঘরোয়া ক্রীড়া একাডেমির অনুদান: প্রতিশ্রুতি ও প্রাপ্তির ফারাক কেন?
ছবি: সংগৃহীত
কলামিস্ট: কামরুল ইসলাম | জ্যেষ্ঠ বিষয়ভিত্তিক গবেষক (খাত: ঘরোয়া স্পোর্টস অবকাঠামো ও একাডেমি)
📰 বিশেষ মতামত ও কলাম

কলামিস্ট: কামরুল ইসলাম | জ্যেষ্ঠ বিষয়ভিত্তিক গবেষক (খাত: ঘরোয়া স্পোর্টস অবকাঠামো ও একাডেমি)

সম্প্রতি জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (National Sports Council - NSC) কর্তৃক প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত অর্থবছরে (২০২৩-২৪) দেশের ৪৭টি নিবন্ধিত ক্রীড়া একাডেমির মধ্যে মাত্র ১৭টি তাদের ঘোষিত সরকারি অনুদানের সম্পূর্ণ অংশ পেয়েছে, যা মোট প্রতিশ্রুত অর্থের প্রায় ৩৫%। এই পরিসংখ্যান দেশের তৃণমূল পর্যায়ে ক্রীড়া বিকাশের প্রতি সরকারের সদিচ্ছা এবং তার বাস্তবায়নের মধ্যে এক প্রকট ফারাক তুলে ধরে। বাংলাদেশ সরকার, বিশেষ করে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, ক্রীড়া অবকাঠামো উন্নয়নে বারবার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হলেও, মাঠ পর্যায়ের একাডেমিগুলো প্রায়শই দীর্ঘসূত্রিতা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং তহবিল অপ্রাপ্তির শিকার হয়। World Bank এবং Asian Development Bank (ADB) এর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও বাংলাদেশের ক্রীড়া খাতে বিনিয়োগের সম্ভাব্যতা নিয়ে ইতিবাচক মনোভাব দেখালেও, অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়াগত দুর্বলতা এই সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে দিচ্ছে না।

এই অনুদান বিতরণের অসামঞ্জস্যতা কেবল আর্থিক সীমাবদ্ধতার প্রশ্ন নয়, বরং এটি দেশের ক্রীড়া নীতিমালার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া এবং জবাবদিহিতার কাঠামোগত দুর্বলতাকেও প্রকট করে তোলে। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়-এর অধীনে পরিচালিত 'ক্রীড়া ও যুব উন্নয়ন প্রকল্প' (Sports and Youth Development Project) এর আওতায়, প্রতি বছর অসংখ্য আবেদন জমা পড়ে। প্রাথমিক বাছাই এবং মাঠ পর্যায়ের পরিদর্শনের পর যোগ্য একাডেমিগুলোকে অনুদানের জন্য নির্বাচিত করা হয়। তবে, দেখা যায় যে, বাজেট বরাদ্দ, অর্থ ছাড়ের পদ্ধতি এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের নিরীক্ষা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে, ক্ষুদ্র ও নতুন একাডেমিগুলো, যাদের প্রকৃত অর্থেই আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন, তারা আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে আবেদন প্রক্রিয়াতেই পিছিয়ে পড়ে। অন্যদিকে, অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী লবিং ক্ষমতা সম্পন্ন বা রাজনৈতিক প্রভাবাধীন একাডেমিগুলো তুলনামূলকভাবে দ্রুত অনুদান পেতে সক্ষম হয়, যা যোগ্য ও সম্ভাবনাময় একাডেমিগুলোর মধ্যে বৈষম্য তৈরি করে এবং তৃণমূল প্রতিভার বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে। ২০১৩ সালে প্রণীত জাতীয় ক্রীড়া নীতিমালায় তৃণমূল পর্যায়ে ক্রীড়ার প্রসারে একাডেমিগুলোর ভূমিকার কথা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকলেও, তার কার্যকরী প্রয়োগ প্রায়শই প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

এই সমস্যার গভীরে প্রবেশ করলে দেখা যায়, অনুদান বিতরণের ক্ষেত্রে একটি সুনির্দিষ্ট, ডিজিটাল ও মানদণ্ডভিত্তিক পদ্ধতির অভাব রয়েছে। বাংলাদেশ সরকার তার 'ডিজিটাল বাংলাদেশ' ভিশনের অংশ হিসেবে বিভিন্ন খাতে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম চালু করলেও, ক্রীড়া অনুদান বিতরণে এখনো অনেকাংশে ম্যানুয়াল পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়, যা দীর্ঘসূত্রিতা এবং অস্বচ্ছতার জন্ম দেয়। World Bank এর 'Sports for Development' ফ্রেমওয়ার্ক অনুযায়ী, ক্রীড়া প্রকল্পগুলোতে বিনিয়োগের পূর্বে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং প্রভাব পরিমাপের সুনির্দিষ্ট নির্দেশিকা থাকা অত্যাবশ্যক। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, অনুদানপ্রাপ্ত একাডেমিগুলোর কার্যকলাপের নিয়মিত নিরীক্ষা এবং তাদের সাফল্যের প্রভাব পরিমাপের পদ্ধতিগুলো এখনো দুর্বল। অনেক সময় অনুদানপ্রাপ্তির পর একাডেমিগুলো সেই অর্থ সঠিকভাবে ব্যবহার করছে কিনা, বা তাদের মাধ্যমে প্রকৃত অর্থে ক্রীড়া প্রতিভা বিকশিত হচ্ছে কিনা, তার নিয়মিত ফলো-আপ হয় না। ADB'র সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের ক্রীড়া খাতে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (PPP) মডেলের সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করা হলেও, সরকারি অনুদান বিতরণের বর্তমান অব্যবস্থা বেসরকারি বিনিয়োগকারীদেরও নিরুৎসাহিত করছে, কারণ তারা মনে করে সরকারি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব থাকলে তাদের বিনিয়োগও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। এই পরিস্থিতি দেশের ক্রীড়া অর্থনীতির সামগ্রিক প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করছে এবং আন্তর্জাতিক ক্রীড়া মঞ্চে বাংলাদেশের অবস্থানকে দুর্বল করে তুলছে।

অর্থবছর মোট নিবন্ধিত একাডেমি অনুদান প্রাপ্তির জন্য নির্বাচিত একাডেমি প্রতিশ্রুত মোট অনুদান (কোটি টাকা) বিতরণকৃত মোট অনুদান (কোটি টাকা) প্রাপ্তির হার (%)
২০১৮-১৯ ১১০ ৪০ ৮.৫০ ৪.২০ ৪৯.৪১%
২০১৯-২০ ১৩০ ৫০ ১০.০০ ৪.৫০ ৪৫.০০%
২০২০-২১ ১৪৫ ৪৫ ৯.৫০ ৩.৮০ ৪০.০০%
২০২১-২২ ১৫৫ ৫৫ ১১.৫০ ৪.৬০ ৪০.০০%
২০২২-২৩ ১৬০ ৬০ ১২.০০ ৫.০০ ৪১.৬৭%
২০২৩-২৪ ১৭০ ৪৭ ১০.০০ ৩.৫০ ৩৫.০০%

উৎস: যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের বার্ষিক প্রতিবেদন।

সুপারিশ

  • যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়-কে একটি স্বয়ংক্রিয় অনলাইন পোর্টাল (যেমন: 'ক্রীড়া অনুদান ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম') চালু করতে হবে, যেখানে একাডেমিগুলো তাদের আবেদন জমা দিতে পারবে, আবেদনের অবস্থা ট্র্যাক করতে পারবে এবং অনুদান প্রাপ্তির পর ব্যবহারের প্রতিবেদন জমা দিতে পারবে। এই সিস্টেমে একটি সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড (যেমন: 'জাতীয় ক্রীড়া নীতিমালা ২০১৩' অনুযায়ী একাডেমির অবকাঠামো, কোচের যোগ্যতা, প্রতিভার বিকাশ ও সাফল্যের রেকর্ড) ব্যবহার করে স্বয়ংক্রিয় স্কোরিং পদ্ধতি চালু করতে হবে, যা World Bank এর 'Good Governance in Sports' নির্দেশিকা অনুসরণ করবে।
  • বাংলাদেশ সরকার, জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ এবং বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনকে যৌথভাবে একটি স্বাধীন নিরীক্ষা কমিটি গঠন করতে হবে। এই কমিটি প্রতি বছর অনুদানপ্রাপ্ত একাডেমিগুলোর আর্থিক লেনদেন এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের উপর নিয়মিত এবং আকস্মিক নিরীক্ষা পরিচালনা করবে। নিরীক্ষার ফলাফল যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে জনসম্মুখে প্রকাশ করতে হবে, যা 'তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯' এর আওতায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবে।
  • সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে 'ক্রীড়া উন্নয়ন বোর্ড আইন, ২০২৪' (প্রস্তাবিত) এর অধীনে একটি 'ক্রীড়া একাডেমি উন্নয়ন তহবিল' প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এই তহবিলে ADB এবং World Bank এর মতো আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে তহবিল সংগ্রহ করার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা তৈরি করতে হবে, যেখানে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের জন্য আকর্ষণীয় সুযোগ এবং কর অবকাশের মতো প্রণোদনা অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: কামরুল ইসলাম

কামরুল ইসলাম 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: ঘরোয়া স্পোর্টস অবকাঠামো ও একাডেমি। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Geen reacties gevonden


News Card Generator