ভারত মহাসাগরীয় নিরাপত্তা: বেইজিংয়ের ‘মুক্তা’ নীতি ও ঢাকার কৌশলগত অবস্থান | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

ভারত মহাসাগরীয় নিরাপত্তা: বেইজিংয়ের ‘মুক্তা’ নীতি ও ঢাকার কৌশলগত অবস্থান

লে. কর্নেল (অব.) আসাদ  avatar   
লে. কর্নেল (অব.) আসাদ
ভারত মহাসাগরীয় নিরাপত্তা: বেইজিংয়ের ‘মুক্তা’ নীতি ও ঢাকার কৌশলগত অবস্থান
ভারত মহাসাগরীয় নিরাপত্তা: বেইজিংয়ের ‘মুক্তা’ নীতি ও ঢাকার কৌশলগত অবস্থান
ছবি: সংগৃহীত

কলামিস্ট: লে. কর্নেল (অব.) আসাদ | জ্যেষ্ঠ বিষয়ভিত্তিক গবেষক (খাত: ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল ও প্রতিরক্ষা)

📰 বিশেষ মতামত ও কলাম

কলামিস্ট: লে. কর্নেল (অব.) আসাদ | জ্যেষ্ঠ বিষয়ভিত্তিক গবেষক (খাত: ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল ও প্রতিরক্ষা)

সম্প্রতি মার্কিন নৌবাহিনীর সপ্তম ফ্লিটের কমান্ডার ভাইস অ্যাডমিরাল কার্ল থমাসের ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক উপস্থিতি এবং তাদের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (BRI)-এর অধীনে অবকাঠামোগত বিনিয়োগ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ, বেইজিংয়ের ‘মুক্তার মালা’ (String of Pearls) নীতির গভীর ভূ-রাজনৈতিক প্রভাবকে আবারও সামনে এনেছে। ভারত মহাসাগরের কৌশলগত জলপথে চীনের বর্ধিত প্রভাব বিস্তারের এই নীতি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তিগুলোর মধ্যে নতুন মেরুকরণ সৃষ্টি করছে, যেখানে বাংলাদেশের মতো দেশগুলো এক গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু সংবেদনশীল অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে। এই প্রেক্ষাপটে ঢাকার কৌশলগত অবস্থান এবং ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় অপরিহার্য ভূমিকা পালন করতে পারে।

চীনের ‘মুক্তার মালা’ কৌশল মূলত ভারত মহাসাগরের উপকূলবর্তী দেশগুলোতে বন্দর, সামরিক ঘাঁটি এবং অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে বেইজিংয়ের অর্থনৈতিক ও সামরিক প্রভাব বিস্তারের একটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা। এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার তেল সমৃদ্ধ অঞ্চল থেকে চীনে জ্বালানি সরবরাহের সামুদ্রিক রুট সুরক্ষিত রাখা এবং একইসাথে পশ্চিমা বিশ্বের নৌ-আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করা। পাকিস্তানের গোয়াদর, শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা, মিয়ানমারের কিয়াউকপিউ এবং জিবুতির সামরিক ঘাঁটির মতো প্রকল্পগুলো এই নীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এসব বিনিয়োগের মাধ্যমে চীন শুধু বাণিজ্য রুটই সুরক্ষিত করছে না, বরং আঞ্চলিক শক্তি ভারসাম্যকেও প্রভাবিত করছে, যা ভারতের মতো আঞ্চলিক পরাশক্তির জন্য কৌশলগত উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই পরিস্থিতিতে, বঙ্গোপসাগরের প্রবেশপথে অবস্থিত বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও মাতারবাড়ী বন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পগুলো আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

বাংলাদেশের জন্য এই পরিস্থিতি একইসাথে সুযোগ ও চ্যালেঞ্জের জন্ম দিয়েছে। একদিকে, চীনের BRI-এর অধীনে অবকাঠামোগত বিনিয়োগ দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সহায়ক হতে পারে। অপরদিকে, আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলোর মধ্যে ক্রমবর্ধমান প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে ভারসাম্য বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তাকে আরও জটিল করে তুলেছে। বাংলাদেশ ঐতিহ্যগতভাবে কোনো সামরিক জোটে অংশ না নিয়ে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে আসছে। তবে, ভারত মহাসাগরের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব বৃদ্ধির সাথে সাথে বাংলাদেশকে তার জাতীয় স্বার্থ সমুন্নত রাখতে এবং আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে আরও সক্রিয় ও সতর্ক ভূমিকা পালন করতে হচ্ছে। দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই জটিল পরিস্থিতি মোকাবেলায় বহুপাক্ষিক কূটনীতি এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা ফোরাম যেমন BIMSTEC-এর মাধ্যমে আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো জোরদার করার ওপর জোর দিচ্ছে। একইসাথে, UN Peacekeeping মিশনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ বিশ্বব্যাপী শান্তি রক্ষায় দেশের অঙ্গীকারকে প্রতিফলিত করে, যা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের সুনাম বৃদ্ধি করেছে এবং কৌশলগত অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করেছে।

প্রতিষ্ঠানের নাম ভূমিকা/সম্পর্কিত তথ্য প্রভাব/গুরুত্ব
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ভারত মহাসাগরীয় নিরাপত্তা ইস্যুতে বাংলাদেশের নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের প্রধান সংস্থা। আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষায় বহুপাক্ষিক কূটনীতি ও স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ।
BIMSTEC বে অব বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ ফর মাল্টি-সেক্টরাল টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশন। আঞ্চলিক অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতার প্ল্যাটফর্ম, যা ভারত মহাসাগরীয় দেশগুলোকে একত্রিত করে।
UN Peacekeeping জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ। বিশ্বব্যাপী শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় বাংলাদেশের অঙ্গীকারের প্রতীক; আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে কৌশলগত বিশ্বাসযোগ্যতা বৃদ্ধি।
সার্ক দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা। আঞ্চলিক সহযোগিতা ও সংহতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ, যদিও বর্তমানে এর কার্যকারিতা কিছুটা মন্থর।

উৎস: বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, BIMSTEC সচিবালয়, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন প্রতিবেদন, সার্ক সচিবালয়।

সুপারিশ

  • পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংলাপে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে হবে এবং BIMSTEC-এর মতো ফোরামের মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে একটি সুসংগঠিত সামুদ্রিক নিরাপত্তা কাঠামো গঠনের প্রস্তাবনা দিতে হবে, যা ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের একক প্রভাব বিস্তারের প্রবণতা কমাতে সহায়ক হবে।
  • বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবন্দর ও উপকূলীয় অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য আধুনিকীকরণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে, এবং UN Peacekeeping-এর আওতায় সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংক্রান্ত প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রাখতে হবে।
  • সরকারকে একটি সমন্বিত 'জাতীয় সামুদ্রিক কৌশল' (National Maritime Strategy) প্রণয়ন করতে হবে, যা অর্থনৈতিক, নিরাপত্তা ও পরিবেশগত দিকগুলো বিবেচনা করে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদী স্বার্থ রক্ষা করবে এবং এর বাস্তবায়নে সার্ক সহ অন্যান্য আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সাথে সহযোগিতা জোরদার করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: লে. কর্নেল (অব.) আসাদ

লে. কর্নেল (অব.) আসাদ 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল ও প্রতিরক্ষা। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator