সুন্দরবনের শ্বাসমূল: জলবায়ু পরিবর্তনের নীরব শিকার ও আমাদের দায়বদ্ধতা | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

সুন্দরবনের শ্বাসমূল: জলবায়ু পরিবর্তনের নীরব শিকার ও আমাদের দায়বদ্ধতা

জাবীর হোসেন  avatar   
জাবীর হোসেন
সুন্দরবনের শ্বাসমূল: জলবায়ু পরিবর্তনের নীরব শিকার ও আমাদের দায়বদ্ধতা
সুন্দরবনের শ্বাসমূল: জলবায়ু পরিবর্তনের নীরব শিকার ও আমাদের দায়বদ্ধতা
ছবি: সংগৃহীত
কলামিস্ট: জাবীর হোসেন | জ্যেষ্ঠ বিষয়ভিত্তিক গবেষক (খাত: বন ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ)
📰 বিশেষ মতামত ও কলাম

কলামিস্ট: জাবীর হোসেন | জ্যেষ্ঠ বিষয়ভিত্তিক গবেষক (খাত: বন ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ)

সম্প্রতি প্রকাশিত বাংলাদেশ পরিবেশ অধিদপ্তরের (Department of Environment, DoE) এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত দুই দশকে সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধির হার পূর্বের যেকোনো সময়ের চেয়ে আশঙ্কাজনকভাবে তীব্র হয়েছে, যার ফলস্বরূপ সুন্দরী গাছের প্রজনন ও বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে প্রায় ৪০%। এই লবণাক্ততা বৃদ্ধির প্রধান কারণ হিসেবে বৈশ্বিক উষ্ণায়নজনিত সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং উজানে মিঠাপানির প্রবাহ কমে যাওয়াকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্রের মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত শ্বাসমূলীয় উদ্ভিদের ওপর, যা কেবল বনের নিজস্ব অস্তিত্বের জন্য নয়, বরং উপকূলীয় অঞ্চলের কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকার জন্যও এক অশনিসংকেত। প্রতি বছর গড়ে ১-২ মিলিমিটার হারে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে নদীর নোনাজল আরও গভীরে প্রবেশ করছে, যা শ্বাসমূলের টিকে থাকার ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের প্রথম প্রতিরক্ষা প্রাচীরকে দুর্বল করে দিচ্ছে।

সুন্দরবনের শ্বাসমূল, বিশেষত সুন্দরী, গেওয়া, গরান এবং কেওড়ার মতো প্রজাতিগুলো, লবণাক্ততা সহনশীল হলেও, বর্তমানে যে হারে লবণাক্ততা বাড়ছে, তা তাদের প্রাকৃতিক অভিযোজন ক্ষমতাকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউটের (Bangladesh Forest Research Institute, BFRI) এক গবেষণায় দেখা গেছে, বিগত ১৫ বছরে সুন্দরবনের প্রায় ২৫০ বর্গকিলোমিটার এলাকায় সুন্দরী গাছের ঘনত্ব কমেছে প্রায় ১৫%। এই গাছগুলো শুধু মাটিকে আঁকড়ে ধরে ক্ষয় রোধ করে না, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের তীব্রতা কমাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শ্বাসমূলের এই নীরব ক্ষয় সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যের ওপরও মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। বহু প্রজাতির মাছ, কাঁকড়া, এবং অন্যান্য জলজ প্রাণীর প্রজনন ও বিচরণ ক্ষেত্র হিসেবে এই শ্বাসমূলীয় বনাঞ্চল অপরিহার্য। লবণাক্ততা বৃদ্ধির ফলে মাছ ও কাঁকড়ার নির্দিষ্ট প্রজাতিগুলো তাদের অনুকূল পরিবেশ হারাচ্ছে, যা স্থানীয় জেলেদের জীবন-জীবিকাকে সরাসরি হুমকির মুখে ফেলছে। জলবায়ু পরিবর্তনের এই প্রভাব কেবল প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে সীমাবদ্ধ থাকছে না, বরং এটি স্থানীয় অর্থনীতির ওপরও গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, যা খাদ্য নিরাপত্তা এবং গ্রামীণ দারিদ্র্য বিমোচন প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করছে।

লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং শ্বাসমূলের ক্ষয় সুন্দরবনের সামগ্রিক বাস্তুতন্ত্রকে দুর্বল করে দিচ্ছে, যার ফলে বন্যপ্রাণীদের আবাসস্থল সংকুচিত হচ্ছে এবং তাদের খাদ্যশৃঙ্খলে ব্যাঘাত ঘটছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (Bangladesh Agricultural Research Council, BARC) এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (Department of Agricultural Extension, DAE) এর যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় চাষযোগ্য জমির লবণাক্ততাও আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। এর ফলে ঐতিহ্যবাহী ধান ও সবজি চাষ কঠিন হয়ে পড়েছে, যার পরিবর্তে লবণ সহনশীল চিংড়ি চাষের দিকে স্থানীয় কৃষকদের ঝুঁকে পড়তে দেখা যাচ্ছে। যদিও চিংড়ি চাষ অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হতে পারে, তবে এটি এক ফসলি কৃষি পদ্ধতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে এবং জমির প্রাকৃতিক উর্বরতা হ্রাস করছে। এই ধরনের একপেশে কৃষি অনুশীলন দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য নিরাপত্তা এবং জীববৈচিত্র্যের জন্য হুমকি সৃষ্টি করছে। উপরন্তু, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (Bangladesh Rice Research Institute, BRRI) কর্তৃক উদ্ভাবিত লবণ সহনশীল ধানের জাতগুলো (যেমন BRRI ধান ৪৭, BRRI ধান ৬৭) কিছুটা আশার আলো দেখালেও, বিস্তৃত পরিসরে এর ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং কৃষকদের কাছে এর প্রযুক্তিগত সহায়তা পৌঁছানো এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এই শ্বাসমূলের ক্ষয় যদি অব্যাহত থাকে, তবে সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সুরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে, যা উপকূলীয় অঞ্চলের লাখ লাখ মানুষকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ ঝুঁকিতে ফেলবে এবং দেশের সামগ্রিক পরিবেশগত ভারসাম্যকে নষ্ট করবে।

সূচক ২০১০ সাল ২০২০ সাল পরিবর্তনের হার (দশকে)
সুন্দরবনের গড় লবণাক্ততা (ppt) ৮.৫ ১২.৩ + ৪৪.৭%
সুন্দরী গাছের ঘনত্ব হ্রাস (বর্গ কি.মি.) ০ ১৫০ + ১৫০ বর্গ কি.মি.
উপকূলীয় কৃষি জমিতে লবণাক্ততা বৃদ্ধি (DS/m) ৪.০ ৬.৫ + ৬২.৫%
ম্যানগ্রোভ বনভূমি কমে যাওয়া (বর্গ কি.মি.) ০ ২০ + ২০ বর্গ কি.মি.

উৎস: বাংলাদেশ পরিবেশ অধিদপ্তর (DoE) ও বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউট (BFRI) এর সম্মিলিত প্রতিবেদন, ২০২১।

সুপারিশ

  • পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়কে (MoEFCC) 'সুন্দরবন সুরক্ষা আইন, ২০২০' এর আওতায় একটি সমন্বিত টাস্কফোর্স গঠন করতে হবে, যা সুন্দরবনের লবণাক্ততা প্রতিরোধে উজানে মিঠাপানির প্রবাহ নিশ্চিত করতে আন্তঃদেশীয় নদী ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত আলোচনায় সক্রিয় ভূমিকা রাখবে এবং স্থানীয়ভাবে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের আধুনিক প্রযুক্তি (যেমন - BARI কর্তৃক উদ্ভাবিত লবণ সহনশীল ফসল চাষের জন্য বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ পদ্ধতি) প্রচলনে DAE এর মাধ্যমে কৃষকদের প্রশিক্ষণ প্রদান করবে।
  • BARC এবং BRRI এর যৌথ তত্ত্বাবধানে সুন্দরবনের জলবায়ু সহনশীল শ্বাসমূলীয় উদ্ভিদের চারা উৎপাদন ও রোপণের একটি বৃহৎ প্রকল্প হাতে নিতে হবে, যা 'বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২' এর অধীনে সংরক্ষিত বনাঞ্চলে জীববৈচিত্র্য পুনরুদ্ধারে সহায়তা করবে এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণে সামাজিক বনায়ন কার্যক্রমকে জোরদার করবে।
  • সরকারকে 'জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (NAP)' এর অধীনে একটি সুনির্দিষ্ট বাজেট বরাদ্দ করতে হবে যা সুন্দরবন অঞ্চলের লবণাক্ততা সহনশীল কৃষি পদ্ধতির গবেষণায় (DAE এবং BARI এর মাধ্যমে) এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য বিকল্প আয়মূলক কর্মসূচিতে (যেমন - মধু সংগ্রহ ও কাঁকড়া চাষের টেকসই পদ্ধতি) বিনিয়োগ করবে, যাতে তাদের জীবিকা সুন্দরবনের পরিবেশের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে পারে এবং পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় থাকে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: জাবীর হোসেন

জাবীর হোসেন 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: বন ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator