ইউরোপীয় ইউনিয়নের কার্বন শুল্ক: বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে নতুন কৌশল | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

ইউরোপীয় ইউনিয়নের কার্বন শুল্ক: বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে নতুন কৌশল

সাদিয়া আফরিন  avatar   
সাদিয়া আফরিন
ইউরোপীয় ইউনিয়নের কার্বন শুল্ক: বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে নতুন কৌশল
ইউরোপীয় ইউনিয়নের কার্বন শুল্ক: বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে নতুন কৌশল
ছবি: সংগৃহীত
কলামিস্ট: সাদিয়া আফরিন | জ্যেষ্ঠ বিষয়ভিত্তিক গবেষক (খাত: ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও বৈশ্বিক নীতি)
📰 বিশেষ মতামত ও কলাম

কলামিস্ট: সাদিয়া আফরিন | জ্যেষ্ঠ বিষয়ভিত্তিক গবেষক (খাত: ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও বৈশ্বিক নীতি)

গত ১ অক্টোবর, ২০২৩ তারিখে ইউরোপীয় ইউনিয়ন তার কার্বন বর্ডার অ্যাডজাস্টমেন্ট মেকানিজম (CBAM) বা কার্বন শুল্কের অন্তর্বর্তীকালীন প্রয়োগ শুরু করেছে, যা বৈশ্বিক বাণিজ্য নীতিতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। ইউরোপীয় কমিশনের এই সিদ্ধান্ত জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ইইউ-এর অঙ্গীকারের প্রতিফলন হলেও, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এটি রপ্তানি খাতে এক নতুন চ্যালেঞ্জ এবং একই সাথে কৌশলগত পুনর্বিন্যাসের প্রয়োজনীয়তা তৈরি করেছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় শুরু থেকেই এই শুল্কের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে সতর্ক দৃষ্টি রাখছে এবং ইইউ-এর সাথে দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় এর সমাধানের পথ খুঁজছে। বিশেষ করে, বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্যের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ইইউ বাজারে প্রবেশ করে, যার ফলে এই শুল্ক আরোপের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব বাংলাদেশের অর্থনীতি ও কূটনৈতিক সম্পর্কে গভীর ছাপ ফেলবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই পদক্ষেপ কেবল একটি পরিবেশগত নীতি নয়, বরং এটি বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি ও বাণিজ্যিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি নতুন মানদণ্ড স্থাপন করছে। CBAM মূলত ইইউতে আমদানিকৃত নির্দিষ্ট কিছু পণ্যের (যেমন — সিমেন্ট, লোহা ও ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম, সার, বিদ্যুৎ এবং হাইড্রোজেন) কার্বন নিঃসরণের উপর শুল্ক আরোপ করে, যা ইইউ অভ্যন্তরীণ উৎপাদনে প্রযোজ্য কার্বন মূল্যের সমতুল্য। এর উদ্দেশ্য হলো 'কার্বন লিকেজ' রোধ করা, অর্থাৎ ইইউ-এর কঠোর জলবায়ু নীতির কারণে উৎপাদন শিল্প যেন কম কঠোর নীতিযুক্ত দেশগুলোতে স্থানান্তরিত না হয়। বাংলাদেশের জন্য এটি একটি কৌশলগত পরীক্ষার বিষয়, কারণ আমাদের রপ্তানি পণ্যের কার্বন ফুটপ্রিন্ট হ্রাস করার জন্য দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে ইইউ বাজারে প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা হারানোর ঝুঁকি রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে, বাংলাদেশের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত ইইউ-এর সাথে একটি কার্যকর সংলাপ প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বিশেষ ও ভিন্ন আচরণের (Special and Differential Treatment) নীতির অধীনে কিছু ছাড় বা অভিযোজনমূলক ব্যবস্থার সুযোগ সৃষ্টি করা যায়। এটি কেবল বাংলাদেশের একার চ্যালেঞ্জ নয়, বরং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (WTO) এবং অন্যান্য আঞ্চলিক ফোরামেও এই বিষয়ে একটি সমন্বিত অবস্থান তৈরি করা অপরিহার্য।

এই কার্বন শুল্কের অভিঘাত মোকাবেলায় বাংলাদেশের জন্য বহুপাক্ষিক জোট ও আঞ্চলিক সহযোগিতা প্ল্যাটফর্মগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। উদাহরণস্বরূপ, BIMSTEC (Bay of Bengal Initiative for Multi-Sectoral Technical and Economic Cooperation) এর মতো আঞ্চলিক জোটের মাধ্যমে সদস্য দেশগুলো জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় যৌথ কৌশল গ্রহণ করতে পারে এবং কার্বন নিঃসরণ কমানোর জন্য প্রযুক্তিগত সহায়তা ও জ্ঞান বিনিময়ের সুযোগ তৈরি করতে পারে। একইভাবে, সার্ক (South Asian Association for Regional Cooperation) ফোরামেও সদস্য দেশগুলো তাদের সাধারণ স্বার্থকে তুলে ধরতে পারে এবং সম্মিলিতভাবে ইইউ ও অন্যান্য উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোর কাছে কার্বন শুল্কের ন্যায্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাস্তবায়নের দাবি জানাতে পারে। এছাড়া, UN Peacekeeping মিশনে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের সফল অংশগ্রহণ বৈশ্বিক মঞ্চে দেশটির একটি শক্তিশালী ও দায়িত্বশীল ভাবমূর্তি তৈরি করেছে, যা ইইউ-এর মতো অংশীদারদের সাথে আলোচনায় একটি ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এই মিশনগুলোতে বাংলাদেশের অবদান বৈশ্বিক শান্তি ও স্থিতিশীলতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, যা কূটনৈতিক আলোচনায় একটি বাড়তি সুবিধা দিতে পারে। ইইউ-এর সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের এই বহুমাত্রিক অবদান তুলে ধরে একটি সমন্বিত কূটনৈতিক কৌশল গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।

বছর ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশের মোট রপ্তানি (বিলিয়ন ইউএস ডলার) ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশের মোট রপ্তানির শতাংশ (% মোট রপ্তানির) কার্বন শুল্কের আওতাধীন পণ্যের সম্ভাব্য রপ্তানি মূল্য (মিলিয়ন ইউএস ডলার, আনুমানিক)
২০২০-২১ ১৯.৫৩ ৪৮.৭% ১১০
২০২১-২২ ২৫.৫৩ ৫২.৩% ১৪৫
২০২২-২৩ ২৭.৩০ ৫০.৫% ১৬০

উৎস: রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (EPB) এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশ্লেষণ প্রতিবেদন, আনুমানিক হিসাব।

সুপারিশ

  • পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে ইইউ-এর সাথে দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য CBAM-এর আওতায় বিশেষ ও ভিন্ন আচরণের (Special and Differential Treatment) নীতি প্রয়োগের জন্য জোরালোভাবে দাবি জানাতে হবে এবং এ বিষয়ে একটি কারিগরি কমিটি গঠন করে ইইউ-এর সাথে নিয়মিত সংলাপ চালিয়ে যেতে হবে।
  • BIMSTEC এবং সার্ক-এর মতো আঞ্চলিক সংস্থাগুলোর ফোরামে বাংলাদেশ নেতৃত্ব দিয়ে একটি অভিন্ন কৌশলপত্র তৈরি করবে, যেখানে সদস্য দেশগুলো কার্বন নির্গমন হ্রাস এবং সবুজ প্রযুক্তির প্রসারে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করবে, যা আঞ্চলিকভাবে ইইউ-এর কার্বন শুল্ক মোকাবিলায় সম্মিলিত সক্ষমতা বাড়াবে।
  • জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত কাঠামো চুক্তি (UNFCCC) এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (WTO)-এর মতো বহুপাক্ষিক প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনগুলোকে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে, যাতে কার্বন শুল্কের মতো বাণিজ্যিক নীতিগুলো বৈশ্বিক বাণিজ্য এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার উপর কী প্রভাব ফেলছে তা তুলে ধরে একটি ন্যায্য বৈশ্বিক জলবায়ু ও বাণিজ্য শাসন প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখা যায়।

✍️ নিবন্ধ লেখক: সাদিয়া আফরিন

সাদিয়া আফরিন 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও বৈশ্বিক নীতি। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Ingen kommentarer fundet


News Card Generator