বাংলাদেশ ক্রিকেট ও পাইপলাইন ফিন্যান্স-এর অজানা দিক: গবেষণা ও মাঠ পর্যায়ের প্রতিবেদন | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

বাংলাদেশ ক্রিকেট ও পাইপলাইন ফিন্যান্স-এর অজানা দিক: গবেষণা ও মাঠ পর্যায়ের প্রতিবেদন

নাবিল কায়সার  avatar   
নাবিল কায়সার
বাংলাদেশ ক্রিকেট ও পাইপলাইন ফিন্যান্স-এর অজানা দিক: গবেষণা ও মাঠ পর্যায়ের প্রতিবেদন
বাংলাদেশ ক্রিকেট ও পাইপলাইন ফিন্যান্স-এর অজানা দিক: গবেষণা ও মাঠ পর্যায়ের প্রতিবেদন
ছবি: সংগৃহীত
কলামিস্ট: নাবিল কায়সার | জ্যেষ্ঠ বিষয়ভিত্তিক গবেষক (খাত: বাংলাদেশ ক্রিকেট ও পাইপলাইন ফিন্যান্স)
📰 বিশেষ মতামত ও কলাম

কলামিস্ট: নাবিল কায়সার | জ্যেষ্ঠ বিষয়ভিত্তিক গবেষক (খাত: বাংলাদেশ ক্রিকেট ও পাইপলাইন ফিন্যান্স)

সম্প্রতি ২০২৩ সালের আইসিসি ওয়ানডে বিশ্বকাপ শেষে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের পারফরম্যান্স এবং এর ধারাবাহিকতা নিয়ে যখন দেশজুড়ে আলোচনা তুঙ্গে, তখন ক্রিকেট ভক্ত ও বিশ্লেষকদের মনোযোগ প্রায়শই মাঠের পারফরম্যান্সের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু এর নেপথ্যে যে সুদূরপ্রসারী আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং পাইপলাইন ফিন্যান্সের একটি জটিল জালের ভূমিকা রয়েছে, তা খুব কমই আলোচিত হয়। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) এর বার্ষিক বাজেট এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট থেকে প্রাপ্ত আয়ের একটি বড় অংশ কীভাবে তৃণমূল থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত প্রতিভা বিকাশে বিনিয়োগ করা হচ্ছে, তা নিয়ে স্বচ্ছ তথ্যের অভাব প্রায়শই পরিলক্ষিত হয়। গত অর্থবছরে বিসিবি’র মোট আয়ের প্রায় ৩০% শুধুমাত্র জাতীয় দলের প্রস্তুতি ও আন্তর্জাতিক ম্যাচ আয়োজনে ব্যয় হয়েছে, অথচ জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের ক্রিকেট উন্নয়নে এর অনুপাত ছিল মাত্র ৭%, যা পাইপলাইন ফিন্যান্সের একটি বড় অসামঞ্জস্য নির্দেশ করে।

বাংলাদেশের ক্রিকেটের পাইপলাইন ফিন্যান্স বলতে কেবল বিসিবি’র নিজস্ব তহবিল নয়, বরং বাংলাদেশ সরকার, আন্তর্জাতিক সংস্থা যেমন World Bank ও ADB, এবং বিভিন্ন স্পনসর প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আসা অর্থেরও একটি সমন্বিত প্রবাহকে বোঝায়। এই অর্থের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ অনিয়মিতভাবে হলেও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় হয়ে জেলা ক্রীড়া সংস্থায় পৌঁছায়, যার উদ্দেশ্য তরুণ খেলোয়াড়দের প্রশিক্ষণ, স্থানীয় লিগ আয়োজন এবং অবকাঠামো উন্নয়ন। তবে, মাঠ পর্যায়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই অর্থের বন্টন ও ব্যবহার প্রায়শই অপর্যাপ্ত মনিটরিং এবং সুনির্দিষ্ট নীতিমালার অভাবে মুখ থুবড়ে পড়ে। উদাহরণস্বরূপ, World Bank এর 'Sports for Development' কর্মসূচির আওতায় গৃহীত প্রকল্পগুলো সাধারণত সামাজিক উন্নয়নের বৃহত্তর ছাতার নিচে পরিচালিত হয়, যেখানে ক্রিকেটের মতো নির্দিষ্ট খেলার জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ সরাসরি প্রতিভা বিকাশে কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা পরিমাপ করা কঠিন। গত পাঁচ বছরে, World Bank এর মাধ্যমে বাংলাদেশে ক্রীড়া অবকাঠামো উন্নয়নে প্রায় ৫০ মিলিয়ন ডলারের প্রকল্প অনুমোদিত হলেও, এর মধ্যে সরাসরি ক্রিকেট একাডেমী বা তৃণমূল পর্যায়ের প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোতে কতটুকু বিনিয়োগ হয়েছে তার সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান প্রায়শই বিচ্ছিন্ন থাকে। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (ADB) যদিও সরাসরি ক্রীড়া খাতে বড় ধরনের অর্থায়ন করে না, তবে দেশের সামগ্রিক মানবসম্পদ উন্নয়নে তাদের বিনিয়োগের একটি ক্ষুদ্র অংশ পরোক্ষভাবে ক্রীড়া শিক্ষায় ব্যবহৃত হতে পারে, যা সুনির্দিষ্টভাবে ক্রিকেটের পাইপলাইনকে শক্তিশালী করতে কতটা সক্ষম, তা গবেষণা সাপেক্ষ। এই আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর অর্থায়নের শর্তাবলী প্রায়শই কঠোর এবং নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা ভিত্তিক হলেও, মাঠ পর্যায়ে এর প্রয়োগে অনেক সময়ই সমন্বয়হীনতা দেখা যায়, যা পাইপলাইন ফিন্যান্সের কার্যকারিতা হ্রাস করে।

তৃণমূল পর্যায়ে ক্রিকেটের উন্নয়নে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও, ফিন্যান্সিয়াল ইনজেকশনের ক্ষেত্রে এটি প্রায়শই উপেক্ষিত হয়। বাংলাদেশ সরকার প্রতি বছর জাতীয় বাজেট থেকে ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিভিন্ন ক্রীড়া ফেডারেশনকে অনুদান প্রদান করে। কিন্তু এই অনুদানের একটি বড় অংশ প্রশাসনিক ব্যয় এবং অবকাঠামোগত রক্ষণাবেক্ষণে চলে যায়, যা সরাসরি নতুন খেলোয়াড় তৈরির দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়ায় খুব কমই অবদান রাখে। উদাহরণস্বরূপ, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ক্রীড়া অবকাঠামো উন্নয়নে বরাদ্দকৃত তহবিলের প্রায় ৬০% সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণে ব্যয় হয়েছে, যেখানে নতুন প্রতিভা অন্বেষণ বা তাদের নিবিড় প্রশিক্ষণের জন্য বরাদ্দ ছিল মাত্র ১৫%। এই চিত্র স্পষ্টতই দেখায় যে, পাইপলাইন ফিন্যান্সের একটি বড় অংশ সরাসরি উৎপাদনে না গিয়ে রক্ষণাবেক্ষণে আটকে যাচ্ছে। বিসিবি’র নিজস্ব একাডেমিগুলো যদিও প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের জন্য একটি সুসংহত পথ তৈরি করে, তবে দেশের ৭০০টির বেশি উপজেলা থেকে প্রতি বছর যে হাজার হাজার তরুণ ক্রিকেটার উঠে আসছে, তাদের সকলের জন্য এই একাডেমিতে সুযোগ তৈরি করা সম্ভব নয়। ফলে, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের ক্লাব ও একাডেমিগুলোই তাদের প্রাথমিক ভরসা। এই ক্লাবগুলো প্রায়শই স্থানীয় পৃষ্ঠপোষকতা এবং সীমিত সরকারি অনুদানের উপর নির্ভরশীল থাকে, যা তাদের কার্যক্রমকে সীমিত করে দেয়। এই প্রেক্ষাপটে, পাইপলাইন ফিন্যান্সের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে একটি সুসংহত ও স্বচ্ছ আর্থিক কাঠামো তৈরি করা অপরিহার্য, যেখানে প্রতিটি স্তরের জন্য সুস্পষ্ট আর্থিক লক্ষ্যমাত্রা এবং জবাবদিহিতা থাকবে।

খাতের নাম ২০২০-২১ অর্থবছরে বিসিবি'র মোট ব্যয় (%) ২০২১-২২ অর্থবছরে বিসিবি'র মোট ব্যয় (%) ২০২২-২৩ অর্থবছরে বিসিবি'র মোট ব্যয় (%) ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সরকারি বরাদ্দ (ক্রীড়া মন্ত্রণালয় থেকে, কোটি টাকা)
জাতীয় দল ও আন্তর্জাতিক ম্যাচ আয়োজন ৩০% ৩২% ৩৩% ০.০০*
একাডেমি ও বয়সভিত্তিক ক্রিকেট ১২% ১৩% ১৪% ১৫.০০
জেলা ও বিভাগীয় ক্রিকেট উন্নয়ন ৭% ৭% ৬% ২০.০০
অবকাঠামো নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ ১৮% ১৭% ১৬% ৬০.০০
প্রশাসনিক ও অন্যান্য ব্যয় ৩৩% ৩১% ৩১% ৫.০০

উৎস: বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) এর বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদন এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের বাজেট সারসংক্ষেপ। *বিসিবি তার নিজস্ব আয় থেকে জাতীয় দল পরিচালনা করে, সরকারি বরাদ্দ মূলত অবকাঠামো ও তৃণমূল উন্নয়নে।

সুপারিশ

  • যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়কে 'জাতীয় ক্রিকেট পাইপলাইন উন্নয়ন তহবিল' নামে একটি সুনির্দিষ্ট তহবিল গঠন করতে হবে, যা বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক বার্ষিক বাজেট বরাদ্দ পাবে এবং World Bank ও ADB এর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর 'Sports for Development' কর্মসূচির আওতায় প্রাপ্ত অনুদান সরাসরি এই তহবিলে যুক্ত হবে। এই তহবিলের অর্থ শুধুমাত্র জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের ক্রিকেট একাডেমি প্রতিষ্ঠা, কোচ নিয়োগ এবং বয়সভিত্তিক টুর্নামেন্ট আয়োজনে ব্যয় করা হবে এবং এর ব্যয় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে একটি স্বাধীন অডিট কমিটি গঠন করতে হবে।
  • বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) কে তাদের বার্ষিক বাজেটের কমপক্ষে ১৫% সরাসরি জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের ক্রিকেট উন্নয়নে বিনিয়োগের জন্য একটি বাধ্যতামূলক নীতি গ্রহণ করতে হবে, যা 'বিসিবি পাইপলাইন ইনভেস্টমেন্ট রেগুলেশন' নামে পরিচিত হবে। এই নীতিতে প্রতিটি জেলায় নিয়মিত প্রতিভা অন্বেষণ ক্যাম্প, স্থানীয় কোচদের প্রশিক্ষণ এবং আধুনিক ক্রিকেট সরঞ্জাম সরবরাহের জন্য সুনির্দিষ্ট অর্থ বরাদ্দ ও ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে হবে, যার অগ্রগতি প্রতি ছয় মাস অন্তর বিসিবি’র কার্যনির্বাহী কমিটিতে পেশ করতে হবে।
  • স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ) আইন, ২০০৯ এর সংশোধনের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের বার্ষিক উন্নয়ন বাজেটের (এডিপি) অন্তত ১% ক্রীড়া উন্নয়নে, বিশেষ করে তৃণমূল পর্যায়ের ক্রিকেট মাঠ ও অনুশীলন সুবিধা উন্নয়নে ব্যয় করার জন্য বাধ্যতামূলক বিধান যুক্ত করতে হবে। এই বিধানের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে ক্রিকেট অবকাঠামো উন্নয়নে একটি টেকসই আর্থিক উৎস নিশ্চিত হবে এবং এর বাস্তবায়ন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় কর্তৃক নিয়মিত মনিটরিং করা হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: নাবিল কায়সার

নাবিল কায়সার 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: বাংলাদেশ ক্রিকেট ও পাইপলাইন ফিন্যান্স। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator