নতুন কারিকুলামে শিখনফল মূল্যায়ন: পরীক্ষাভীতি দূর হলো, নাকি তৈরি হলো নতুন সংকট? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

নতুন কারিকুলামে শিখনফল মূল্যায়ন: পরীক্ষাভীতি দূর হলো, নাকি তৈরি হলো নতুন সংকট?

কাজী মাকসুদুল হক  avatar   
কাজী মাকসুদুল হক
নতুন কারিকুলামে শিখনফল মূল্যায়ন: পরীক্ষাভীতি দূর হলো, নাকি তৈরি হলো নতুন সংকট?
নতুন কারিকুলামে শিখনফল মূল্যায়ন: পরীক্ষাভীতি দূর হলো, নাকি তৈরি হলো নতুন সংকট?
ছবি: সংগৃহীত
কলামিস্ট: কাজী মাকসুদুল হক | জ্যেষ্ঠ বিষয়ভিত্তিক গবেষক (খাত: প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা কারিকুলাম)
📰 বিশেষ মতামত ও কলাম

কলামিস্ট: কাজী মাকসুদুল হক | জ্যেষ্ঠ বিষয়ভিত্তিক গবেষক (খাত: প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা কারিকুলাম)

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) কর্তৃক প্রণীত নতুন শিক্ষাক্রমে প্রথাগত পরীক্ষা পদ্ধতির পরিবর্তে শিখনকালীন মূল্যায়নের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, যা ২০২৩ শিক্ষাবর্ষ থেকে ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণিতে এবং ২০২৪ শিক্ষাবর্ষ থেকে অষ্টম ও নবম শ্রেণিতে বাস্তবায়িত হচ্ছে। এই পরিবর্তন শিক্ষার্থীদের মধ্যে পরীক্ষাভীতি কমানোর একটি মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে এলেও, মাঠ পর্যায়ের চিত্র ভিন্ন বার্তা দিচ্ছে। সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক আয়োজিত এক কর্মশালায় বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান ও শিক্ষকরা নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতির প্রয়োগ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, যেখানে বলা হয়েছে যে, শিক্ষার্থীদের ওপর ধারাবাহিক মূল্যায়নের চাপ একদিকে যেমন নতুন ধরনের মানসিক চাপ সৃষ্টি করছে, তেমনি শিক্ষকদের জন্য অতিরিক্ত প্রশাসনিক ও দাপ্তরিক কাজ বাড়াচ্ছে, যা মূল শিক্ষাদানের সময়কে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এটি কেবল শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের কর্মঘণ্টাই বাড়ায়নি, বরং মূল্যায়নের মান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে, যা পরীক্ষাভীতি দূর করার পরিবর্তে নতুন এক সংকট তৈরি করছে।

নতুন শিক্ষাক্রমের ধারাবাহিক মূল্যায়নে শিক্ষকরা প্রতিটি শিক্ষার্থীর প্রতিটি সেশন ও অ্যাসাইনমেন্টের ওপর নিবিড় নজর রাখছেন, যা তাত্ত্বিকভাবে একটি প্রগতিশীল ধারণা। তবে বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যেখানে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায়শই ৪০-৫০ জন বা তারও বেশি, সেখানে প্রতিটি শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত শিখনফল নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা এবং সে অনুযায়ী প্রামাণ্য রেকর্ড সংরক্ষণ করা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। BANBEIS (বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো)-এর তথ্য অনুযায়ী, মাধ্যমিক স্তরে প্রতি শিক্ষকের বিপরীতে শিক্ষার্থীর গড় সংখ্যা প্রায় ৩০ এর বেশি, যা আদর্শ অনুপাতের চেয়ে অনেক বেশি। এই পরিস্থিতিতে শিক্ষকরা তাদের নির্ধারিত পাঠদানের বাইরেও বিপুল সংখ্যক ডেটা এন্ট্রি, রেকর্ড সংরক্ষণ এবং প্রতিবেদন তৈরিতে ব্যস্ত থাকছেন। ফলে, মূল্যায়নের উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে এবং অনেক শিক্ষক বাধ্য হচ্ছেন অপর্যাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে শিক্ষার্থীদের নম্বর প্রদান করতে, যা মূল্যায়নের বিশ্বাসযোগ্যতা ও বস্তুনিষ্ঠতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে। এটি শিক্ষার্থীদের মধ্যে পরীক্ষাভীতির পরিবর্তে ধারাবাহিক মূল্যায়নে ভালো করার একটি নিরন্তর প্রতিযোগিতা ও মানসিক চাপ সৃষ্টি করছে, যা তাদের সৃজনশীলতাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।

শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের অপর্যাপ্ততা এবং ডিজিটাল অবকাঠামোর অভাবও এই নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতির বাস্তবায়নে বড় বাধা হিসেবে দেখা দিয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর যৌথভাবে শিক্ষকদের জন্য বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আয়োজন করলেও, এগুলোর ব্যাপ্তি ও গভীরতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অনেক শিক্ষকই অভিযোগ করেছেন যে, তারা মূল্যায়নের নতুন পদ্ধতি সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করতে পারেননি। বিশেষ করে, প্রান্তিক পর্যায়ের বিদ্যালয়গুলোতে ডিজিটাল ডিভাইস ও ইন্টারনেট সংযোগের অপ্রতুলতার কারণে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ডেটা এন্ট্রি ও রিপোর্ট তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়ছে। জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) তাদের দক্ষতাভিত্তিক প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে ব্যবহারিক প্রয়োগের ওপর জোর দিলেও, সাধারণ শিক্ষার ক্ষেত্রে এই ধরনের ব্যবহারিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তার অভাব প্রকট। এর ফলে, শিক্ষকরা মূল্যায়নের প্রক্রিয়াকে একটি বোঝা হিসেবে দেখছেন, যা তাদের পেশাদারিত্বে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে এবং একই সাথে শিক্ষার্থীদের মধ্যে মূল্যায়নের প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে বিভ্রান্তি তৈরি করছে। এই পরিস্থিতিতে, শিখনকালীন মূল্যায়নের নামে শিক্ষার্থীদের ওপর প্রতিনিয়ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে, যা তাদের মধ্যে পরীক্ষাভীতির এক নতুন সংস্করণ তৈরি করছে।

শিক্ষাবর্ষ শিক্ষাক্রমে অন্তর্ভুক্ত শ্রেণি মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা (আনুমানিক) শিক্ষক প্রশিক্ষণের হার (শতকরা) ডিজিটাল মূল্যায়ন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারকারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (শতকরা)
২০২৩ ষষ্ঠ, সপ্তম ৩২ লাখ ৬১% ৪৫%
২০২৪ অষ্টম, নবম ৩৮ লাখ ৪২% ২৬%

উৎস: শিক্ষা মন্ত্রণালয়, BANBEIS, বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন

সুপারিশ

  • শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক জাতীয় শিক্ষাক্রম রূপরেখা-২০২১ এর মূল্যায়ন নির্দেশিকা পুনর্বিবেচনা করে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ও শিক্ষকের কর্মঘণ্টার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি বাস্তবসম্মত মূল্যায়ন কাঠামো প্রণয়ন করা উচিত, যা শিক্ষকদের ওপর থেকে অতিরিক্ত প্রশাসনিক চাপ কমাবে এবং মূল্যায়নের গুণগত মান নিশ্চিত করবে।
  • BANBEIS এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর-এর যৌথ উদ্যোগে প্রান্তিক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ডিজিটাল অবকাঠামো (কম্পিউটার, ইন্টারনেট সংযোগ) ও অনলাইন মূল্যায়ন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারে শিক্ষকদের জন্য নিবিড় ও ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আয়োজন করতে হবে, যেখানে NSDA-এর দক্ষতাভিত্তিক প্রশিক্ষণের মডেল অনুসরণ করে শিক্ষকদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধি করা হবে।
  • বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC) এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় যৌথভাবে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া ও শিক্ষক প্রশিক্ষণের মান উন্নয়নে একটি সমন্বিত নীতি প্রণয়ন করবে, যাতে নতুন শিক্ষাক্রমের শিখনকালীন মূল্যায়নের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও জ্ঞানসম্পন্ন শিক্ষক তৈরি হয় এবং শিক্ষকদের পেশাগত মানোন্নয়নের জন্য নিয়মিত রিফ্রেশার কোর্স বাধ্যতামূলক করা হয়।

✍️ নিবন্ধ লেখক: কাজী মাকসুদুল হক

কাজী মাকসুদুল হক 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা কারিকুলাম। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

कोई टिप्पणी नहीं मिली


News Card Generator