তিস্তা নদী ও উজানের আগ্রাসন: শুষ্ক মরা গাংয়ে মরুপৃষ্ঠের নিদারুণ ভবিষ্যৎ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

তিস্তা নদী ও উজানের আগ্রাসন: শুষ্ক মরা গাংয়ে মরুপৃষ্ঠের নিদারুণ ভবিষ্যৎ

সায়েম মালিক  avatar   
সায়েম মালিক
তিস্তা নদী ও উজানের আগ্রাসন: শুষ্ক মরা গাংয়ে মরুপৃষ্ঠের নিদারুণ ভবিষ্যৎ
তিস্তা নদী ও উজানের আগ্রাসন: শুষ্ক মরা গাংয়ে মরুপৃষ্ঠের নিদারুণ ভবিষ্যৎ
ছবি: সংগৃহীত
কলামিস্ট: সায়েম মালিক | জ্যেষ্ঠ বিষয়ভিত্তিক গবেষক (খাত: পানি সম্পদ ও আন্তর্জাতিক নদী ব্যবস্থাপনা)
📰 বিশেষ মতামত ও কলাম

কলামিস্ট: সায়েম মালিক | জ্যেষ্ঠ বিষয়ভিত্তিক গবেষক (খাত: পানি সম্পদ ও আন্তর্জাতিক নদী ব্যবস্থাপনা)

অধ্যায় ১: তিস্তা: প্রবাহমান জীবন থেকে বিপন্ন অস্তিত্ব - নদী অববাহিকার ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক প্রেক্ষাপট

অধ্যায় ১: তিস্তা: প্রবাহমান জীবন থেকে বিপন্ন অস্তিত্ব - নদী অববাহিকার ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক প্রেক্ষাপট

২০২৩ সালের শুষ্ক মৌসুমে তিস্তা নদীর বাংলাদেশ অংশের প্রবাহ সর্বনিম্ন রেকর্ড ছুঁয়েছিল, যা বিগত অর্ধ-শতাব্দীর মধ্যে নজিরবিহীন। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (BWDB) গেজ স্টেশনসমূহের তথ্য অনুযায়ী, তিস্তা ব্যারেজ পয়েন্টে প্রবাহ ১০০০ কিউসেকের নিচে নেমে এসেছিল, যা স্বাভাবিক শুষ্ক মৌসুমের গড় প্রবাহের (৪০০০-৫০০০ কিউসেক) এক-পঞ্চমাংশেরও কম। এই প্রবাহের স্বল্পতা কেবল একটি সাময়িক সংকট নয়, বরং তিস্তা অববাহিকার ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক প্রেক্ষাপটে গভীরতর পরিবেশগত এবং আর্থ-সামাজিক পরিবর্তনের একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত। একসময় যা ছিল এই অঞ্চলের প্রাণবন্ত সংস্কৃতি ও অর্থনীতির মূলভিত্তি, তা আজ উজানের অনিয়ন্ত্রিত পানি প্রত্যাহার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের দ্বিমুখী চাপে এক বিপন্ন অস্তিত্বের মুখোমুখি।

ঐতিহাসিক বিবর্তন ও ভৌগোলিক গুরুত্ব

তিস্তা নদী, যার উৎপত্তিস্থল হিমালয়ের পাউহুনরি হিমবাহে, সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে প্রবেশ করেছে। এই নদী কেবল একটি জলধারা নয়, বরং এটি এই অঞ্চলের সভ্যতা, সংস্কৃতি এবং কৃষিনির্ভর অর্থনীতির ধমনী। ঐতিহাসিক নথি ও প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা থেকে জানা যায়, প্রায় ৬০০ খ্রিস্টাব্দ থেকেই তিস্তা অববাহিকায় মানব বসতি গড়ে উঠতে শুরু করে, যা পরবর্তীতে একটি সমৃদ্ধ কৃষিভিত্তিক সমাজ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্র হিসেবে বিকশিত হয়। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগ পর্যন্ত তিস্তা তার নিজস্ব গতিপথ ধরে ব্রহ্মপুত্রে মিলিত হলেও, ১৮৯৭ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্প এবং ১৯১৮ সালের বন্যার ফলে এর গতিপথ পরিবর্তিত হয়ে যমুনায় পতিত হয়। এই ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তন নদীর অববাহিকায় ব্যাপক প্রভাব ফেলে এবং নতুন পলিমাটি সমৃদ্ধ ভূমি তৈরি করে, যা কৃষির জন্য অত্যন্ত উর্বর প্রমাণিত হয়।

ভৌগোলিকভাবে, তিস্তা অববাহিকা বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় ১৩,৭০০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। এই অঞ্চল মূলত পলিমাটি সমৃদ্ধ সমভূমি দ্বারা গঠিত, যা ধান, পাট, গম, ভুট্টা এবং বিভিন্ন সবজি চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) এবং বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI)-এর গবেষণায় দেখা গেছে, তিস্তা অববাহিকার মাটি বিশেষত ধান ও ভুট্টা চাষের জন্য অত্যন্ত কার্যকর। নদীটি তার প্রবাহের মাধ্যমে এই অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ পানির স্তরকে সচল রাখে এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ করে। পরিবেশ মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত 'বাংলাদেশ পরিবেশ সমীক্ষা ২০২২' অনুযায়ী, তিস্তা অববাহিকায় প্রায় ২৫০ প্রজাতির মাছ এবং শতাধিক প্রজাতির জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণী রয়েছে, যা নদীর বাস্তুতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

নদী অববাহিকার জীববৈচিত্র্য ও কৃষি অর্থনীতি

তিস্তা অববাহিকার অর্থনীতি মূলত কৃষিভিত্তিক। ডিরেক্টরেট জেনারেল অব এগ্রিকালচারাল এক্সটেনশন (DAE) এর তথ্যমতে, রংপুর, নীলফামারী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম এবং গাইবান্ধা জেলার উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কৃষিভূমি তিস্তা সেচ প্রকল্পের আওতাধীন। এই প্রকল্পের মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে প্রায় ১.৫ লক্ষ হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা প্রদান করা হয়, যা বোরো ধান এবং রবিশস্য উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC) কর্তৃক পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, তিস্তার পানি ব্যবহার করে এই অঞ্চলে খাদ্যশস্য উৎপাদন জাতীয় গড় উৎপাদনকে ছাড়িয়ে যায়।

তবে, উজানের আগ্রাসী পানি প্রত্যাহার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এই অঞ্চলের কৃষি ও জীববৈচিত্র্যকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করছে। শুষ্ক মৌসুমে নদীর প্রবাহ কমে যাওয়ায় সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে, যা খাদ্য নিরাপত্তা এবং কৃষকদের জীবিকাকে হুমকিতে ফেলছে। নিম্নলিখিত সারণীতে তিস্তা অববাহিকার প্রধান ফসলের উৎপাদন এবং সেচ কভারেজের একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরা হলো:

ফসলের প্রকার ২০২০-২১ অর্থ বছরে উৎপাদন (মেট্রিক টন) সেচ কভারেজ (লক্ষ হেক্টর) নদীর বর্তমান প্রবাহের প্রভাব
বোরো ধান ৩.৫ মিলিয়ন ১.২ প্রবাহ স্বল্পতার কারণে উৎপাদন হ্রাস
ভুট্টা ১.৮ মিলিয়ন ০.৪ সেচ সংকটে ফলন ব্যাহত
আলু ১.০ মিলিয়ন ০.১ ভূগর্ভস্থ পানির উপর চাপ বৃদ্ধি
উৎস: ডিরেক্টরেট জেনারেল অব এগ্রিকালচারাল এক্সটেনশন (DAE) ও বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC) এর বার্ষিক প্রতিবেদন, ২০২২-২৩।

আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ নীতিগত প্রেক্ষাপট

তিস্তা নদীর পানি বণ্টন একটি জটিল আন্তর্জাতিক বিষয়, যা ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। যদিও ১৯৯৬ সালের গঙ্গা চুক্তি একটি সফল উদাহরণ, তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি এখনও অধরা। উজানের দেশ ভারতের কর্তৃক গজলডোবা ব্যারেজের মাধ্যমে একতরফা পানি প্রত্যাহারের ফলে বাংলাদেশের অংশে শুষ্ক মৌসুমে পানির তীব্র সংকট সৃষ্টি হয়েছে। এই একতরফা পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক নদী আইন এবং 'নো হার্ম রুল'-এর পরিপন্থী। বাংলাদেশের 'জাতীয় পানি নীতি ১৯৯৯' এবং 'বাংলাদেশ পানি আইন ২০১৩' উভয়ই দেশের অভ্যন্তরীণ পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনার উপর গুরুত্বারোপ করে এবং আন্তর্জাতিক নদীর ক্ষেত্রে ন্যায়সঙ্গত ও সমতাপূর্ণ বণ্টনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। পরিবেশ মন্ত্রণালয় এবং পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় যৌথভাবে এই সংকট নিরসনে বিভিন্ন সময় আন্তর্জাতিক ফোরামে আলোচনা করলেও, ফলপ্রসূ সমাধান এখনো অধরা।

তিস্তা নদীর এই ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, এটি কেবল একটি নদীর সংকট নয়, বরং এটি একটি অঞ্চলের সামগ্রিক বাস্তুতন্ত্র, অর্থনীতি এবং জনজীবনের সংকট। প্রবাহমান জীবন থেকে বিপন্ন অস্তিত্বের এই রূপান্তর কেবল প্রাকৃতিক নয়, বরং মানবসৃষ্ট কারণ ও নীতিগত জটিলতার এক নিদারুণ ফল।

অধ্যায় ২: উজানের আগ্রাসন ও আন্তর্জাতিক জলনীতি: তিস্তার জলবণ্টন সংকটের গভীরে

অধ্যায় ২: উজানের আগ্রাসন ও আন্তর্জাতিক জলনীতি: তিস্তার জলবণ্টন সংকটের গভীরে

তিস্তা নদী, যা সিকিমের হিমবাহ থেকে উৎপন্ন হয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নদী হিসেবে বিবেচিত। এর জলবণ্টন নিয়ে দীর্ঘদিনের সংকট কেবল আঞ্চলিক নয়, আন্তর্জাতিক জলনীতির প্রেক্ষাপটেও জটিলতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। উজানের দেশ ভারতের একতরফা জল প্রত্যাহার তিস্তার ভাটি অঞ্চলের পরিবেশ, কৃষি ও জনজীবনকে এক ভয়াবহ শুষ্কতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক জল আইন ও নীতিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

২.১ উজানের আগ্রাসন: তিস্তার জলের প্রবাহে ভারতীয় নিয়ন্ত্রণ

তিস্তার উজানে ভারত কর্তৃক নির্মিত গজলডোবা বাঁধ (Gazoldoba Barrage) এই সংকটের মূল কারণ। পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলার মালবাজার মহকুমার গজলডোবায় অবস্থিত এই বাঁধের মাধ্যমে তিস্তার জল প্রবাহকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়, যা শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশের দিকে প্রবাহিত জলের পরিমাণকে নগণ্য পর্যায়ে নামিয়ে আনে। বিগত কয়েক দশক ধরে, বিশেষ করে নভেম্বর থেকে মে মাস পর্যন্ত, তিস্তার জলপ্রবাহে অস্বাভাবিক হ্রাস পরিলক্ষিত হচ্ছে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (BWDB) তথ্য অনুযায়ী, শুষ্ক মৌসুমে দোয়ানি পয়েন্টে তিস্তার স্বাভাবিক প্রবাহ যেখানে ৫,০০০ কিউসেকের বেশি থাকার কথা, সেখানে তা প্রায়শই ৫০০-১,০০০ কিউসেকের নিচে নেমে আসে। এমনকি কোনো কোনো বছর তা ২০০-৩০০ কিউসেকেও নেমে আসার নজির রয়েছে, যা নদীর বাস্তুতন্ত্র ও ভাটি অঞ্চলের কৃষিক্ষেত্রে এক বিপর্যয় ডেকে এনেছে। ভারতের এই একতরফা জল প্রত্যাহার মূলত দুটি প্রধান উদ্দেশ্য সাধন করে: পশ্চিমবঙ্গের সেচ ব্যবস্থা ও জলবিদ্যুৎ উৎপাদন। তিস্তা ক্যানাল প্রজেক্টের মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গের বিস্তীর্ণ কৃষি জমিতে সেচ সুবিধা প্রদান করা হয়, যার ফলে তিস্তার জল বাংলাদেশের দিকে প্রবাহিত হতে পারে না। এর পরিণতিতে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের প্রায় ১.১০ মিলিয়ন হেক্টর কৃষি জমিতে সেচ কার্যক্রমে মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটছে।

২.২ আন্তর্জাতিক জলনীতি ও তিস্তার জলবণ্টন: এক অসম সমীকরণ

আন্তর্জাতিক নদীগুলোর জলবণ্টন নিয়ে বেশ কিছু নীতি ও আইন প্রচলিত আছে, যার মধ্যে 'রিপ্যারিয়ান রাইটস' (Riparian Rights) এবং 'নো হার্ম রুল' (No Harm Rule) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। রিপ্যারিয়ান রাইটস অনুযায়ী, একটি নদীর অববাহিকায় অবস্থিত সকল দেশ নদীর জলের ন্যায্য ও যুক্তিসঙ্গত অংশীদার। অন্যদিকে, নো হার্ম রুল স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে, উজানের কোনো দেশ এমন কোনো কার্যক্রম গ্রহণ করতে পারবে না যা ভাটির দেশের উপর উল্লেখযোগ্য নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তিস্তার ক্ষেত্রে ভারতের একতরফা জল প্রত্যাহার এই উভয় নীতিরই সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক নদীসমূহের অ-নাবিক ব্যবহার সংক্রান্ত কনভেনশন (UN Convention on the Law of the Non-Navigational Uses of International Watercourses, 1997) এই নীতিগুলোকে আরও সুসংহত করেছে। এই কনভেনশন যদিও ভারত বা বাংলাদেশ কর্তৃক অনুমোদিত নয়, তবে এটি আন্তর্জাতিক জল আইন অনুশীলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত। কনভেনশনের ৫ ও ৬ নম্বর অনুচ্ছেদ ন্যায্য ও যুক্তিসঙ্গত ব্যবহারের (Equitable and Reasonable Utilization) উপর জোর দেয় এবং ৭ নম্বর অনুচ্ছেদ অন্য অববাহিকাভুক্ত দেশের উপর কোনো উল্লেখযোগ্য ক্ষতিসাধন না করার (Obligation Not to Cause Significant Harm) কথা বলে। ১৯৯৬ সালে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত গঙ্গা জলবণ্টন চুক্তি একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেও, তিস্তার ক্ষেত্রে অনুরূপ কোনো চুক্তি এখনো কার্যকর হয়নি। ২০১১ সালে একটি অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি স্বাক্ষরের চেষ্টা করা হলেও, পশ্চিমবঙ্গের আপত্তির কারণে তা ভেস্তে যায়। এই অচলাবস্থা আন্তর্জাতিক জলনীতির প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তবতার এক বড় ফারাক তৈরি করেছে।

২.৩ পরিবেশগত প্রভাব ও কৃষি খাতের ওপর বিপর্যয়

তিস্তার জলের প্রবাহে অস্বাভাবিক হ্রাসের কারণে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে পরিবেশগত ভারসাম্য মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। নদীর গভীরতা কমে যাওয়া, পলি জমা হওয়া এবং নদীবক্ষের শুষ্কতা জীববৈচিত্র্যের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তিস্তা অববাহিকার মৎস্য সম্পদ প্রায় বিলুপ্তির পথে, যা স্থানীয় জেলেদের জীবন-জীবিকায় মারাত্মক আঘাত হেনেছে। পরিবেশ মন্ত্রণালয় এবং DAE (Department of Agricultural Extension)-এর যৌথ সমীক্ষা অনুযায়ী, শুষ্ক মৌসুমে তিস্তা অববাহিকার ভূগর্ভস্থ জলের স্তর অস্বাভাবিকভাবে নিচে নেমে যাচ্ছে, যা পানীয় জল ও সেচ ব্যবস্থার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। কৃষি ক্ষেত্রে তিস্তার জলের অপর্যাপ্ততার কারণে শস্য উৎপাদনে ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। BRRI (Bangladesh Rice Research Institute) এবং BARI (Bangladesh Agricultural Research Institute)-এর গবেষণা মতে, তিস্তা সেচ প্রকল্পের আওতাধীন এলাকার কৃষকরা বোরো ধান চাষে মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। জলের অভাবে বোরো ধানের ফলন ৪০-৫০% পর্যন্ত কমে গেছে, যা খাদ্য নিরাপত্তায় বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে। BARC (Bangladesh Agricultural Research Council) কর্তৃক প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তিস্তা নদীর উপর নির্ভরশীল প্রায় ৭০০,০০০ কৃষক পরিবার সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সারণী ২.১: তিস্তা সেচ প্রকল্পের আওতাধীন এলাকায় বোরো ধান উৎপাদন ও জল প্রাপ্যতার তুলনামূলক চিত্র (২০২০-২০২৫) | অর্থ বছর | তিস্তা সেচ প্রকল্পের আওতাধীন এলাকা (হেক্টর) | বোরো ধান উৎপাদন (মেট্রিক টন) | তিস্তায় গড় জলপ্রবাহ (নভেম্বর-এপ্রিল, কিউসেক) | জল প্রাপ্যতার কারণে ক্ষতির পরিমাণ (আনুমানিক) | | :------- | :------------------------------------- | :--------------------------- | :------------------------------------- | :---------------------------------------------------------------------------------------------------------- | | ২০২০-২১ | ১,১০,০০০ | ৪,৫০,০০০ | ৮৫০ | ৩৫% | | ২০২১-২২ | ১,১০,০০০ | ৪,৩০,০০০ | ৭২০ | ৪২% | | ২০২২-২৩ | ১,১০,০০০ | ৪,০০,০০০ | ৬০০ | ৪৫% | | ২০২৩-২৪ | ১,১০,০০০ | ৩,৮০,০০০ | ৫৫০ | ৪৮% | | ২০২৪-২৫ | ১,১০,০০০ | ৩,৬০,০০০ | ৫০০ | ৫০% | *উৎস: DAE, BRRI, BWDB (২০২৫ সালের তথ্য প্রক্ষেপিত)* FAO (Food and Agriculture Organization) এর রিপোর্ট অনুযায়ী, জলের অভাব ও শুষ্কতার কারণে এই অঞ্চলের কৃষকদের খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টির উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। কৃষকদের জীবনযাত্রার মান হ্রাস পাচ্ছে এবং দারিদ্র্য বাড়ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।

২.৪ ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ ও নীতিগত জটিলতা

তিস্তা জলবণ্টন সংকট নিরসনে নীতিগত ও কূটনৈতিক পর্যায়ে আরও জোরালো পদক্ষেপ অপরিহার্য। যদিও আন্তঃসীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনার জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো বৈশ্বিক আইন নেই, তবে আন্তর্জাতিক রীতিনীতি ও চুক্তিগুলো একটি কাঠামো প্রদান করে। তিস্তা চুক্তি বাস্তবায়নে বিদ্যমান রাজনৈতিক জটিলতা কাটিয়ে উঠতে উভয় দেশের মধ্যে আস্থা ও সহযোগিতার পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। বাংলাদেশের পরিবেশ মন্ত্রণালয় ও পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় এই সংকট নিরসনে বিভিন্ন সময়ে কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। তবে, ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের আপত্তির কারণে, একটি স্থায়ী সমাধান অধরাই রয়ে গেছে। এই অচলাবস্থা কেবল তিস্তার ভাটি অঞ্চলের জন্য নয়, সমগ্র আঞ্চলিক জল ব্যবস্থাপনার জন্য একটি উদ্বেগজনক দৃষ্টান্ত স্থাপন করছে। ভবিষ্যতের জন্য, এই অঞ্চলের জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং জলের চাহিদা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে তিস্তার জলবণ্টন সংকট আরও ঘনীভূত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অধ্যায় ৩: শুষ্ক তিস্তা, মৃত্তিকার হাহাকার: পরিবেশ-প্রতিবেশে মরুকরণের পদধ্বনি

অধ্যায় ৩: শুষ্ক তিস্তা, মৃত্তিকার হাহাকার: পরিবেশ-প্রতিবেশে মরুকরণের পদধ্বনি

অধ্যায় ৩: শুষ্ক তিস্তা, মৃত্তিকার হাহাকার: পরিবেশ-প্রতিবেশে মরুকরণের পদধ্বনি

তিস্তা নদীর উজানে অপরিকল্পিত পানি প্রত্যাহারের ফলে ভাটিতে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তার বহুমুখী প্রভাব এখন কেবল নদী অববাহিকার জীবনযাত্রায় সীমাবদ্ধ নেই; বরং তা সমগ্র পরিবেশ-প্রতিবেশে এক সুদূরপ্রসারী মরুকরণের পদধ্বনি তুলেছে। শুষ্ক তিস্তা এখন কেবল একটি জলশূন্য নদীর নাম নয়, এটি একটি বিপন্ন প্রতিবেশের প্রতীক, যেখানে মৃত্তিকার উর্বরতা হ্রাসের পাশাপাশি জীববৈচিত্র্য, কৃষি উৎপাদন এবং জনস্বাস্থ্যও মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

৩.১ পানিশূন্য তিস্তা ও কৃষি খাতে তার অভিঘাত

তিস্তার প্রধান অববাহিকা বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের কৃষি ব্যবস্থার মেরুদণ্ড। শুষ্ক মৌসুমে, বিশেষত নভেম্বর থেকে মে মাস পর্যন্ত, যখন তিস্তার প্রবাহ সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে, তখন সেচনির্ভর কৃষিকাজ এক বড় চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE)-এর তথ্য অনুযায়ী, তিস্তা অববাহিকার বৃহত্তর রংপুর, নীলফামারী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম এবং গাইবান্ধা জেলার বিশাল কৃষি জমি সেচের অভাবে প্রতি বছর ব্যাপক ক্ষতির শিকার হচ্ছে। নদী অববাহিকার কৃষকেরা পূর্বে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল ছিলেন না, কারণ তিস্তার উপরিভাগের পানি সেচের জন্য যথেষ্ট ছিল। কিন্তু বর্তমানে পৃষ্ঠপ্রবাহের অভাবে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ এতটাই বেড়েছে যে, গভীর ও অগভীর নলকূপের মাধ্যমে পানি উত্তোলন করে সেচকার্য চালানো হচ্ছে। এর ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে আরও ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করছে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI)-এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, তিস্তার পানি সংকটের কারণে বোরো ধানের উৎপাদন খরচ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, কারণ কৃষকদের সেচের জন্য অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বা ডিজেল খরচ করতে হচ্ছে।
সারণী ৩.১: তিস্তা অববাহিকায় বোরো ধানের উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি (২০২১-২২ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছর)
অর্থবছর সেচ খরচ (প্রতি একর, টাকা) মোট উৎপাদন খরচ (প্রতি একর, টাকা) উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির হার (বার্ষিক)
২০২১-২২ ৩,৫০০ ২৯,৫০০ -
২০২২-২৩ ৪,২০০ ৩২,০০০ ৮.৪৭%
২০২৩-২৪ ৪,৯০০ ৩৫,২০০ ১০.০০%
উৎস: DAE, BRRI (প্রাথমিক তথ্য, ২০২৪)
এই সারণী অনুযায়ী, সেচ খরচ এবং সামগ্রিক উৎপাদন খরচ উভয়ই ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা কৃষকদের জন্য এক বড় উদ্বেগের কারণ।

৩.২ মৃত্তিকার উর্বরতা হ্রাস ও মরুকরণের লক্ষণ

নদীর পানি প্রবাহ কমে যাওয়ায় পলিবাহিত পলিমাটি জমিতে আসা বন্ধ হয়ে গেছে। তিস্তার পলি মাটি কৃষি জমির উর্বরতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। এই পলি প্রাকৃতিক সার হিসেবে কাজ করত এবং মাটির গঠন উন্নত করত। বর্তমানে, এই পলি না আসায় এবং ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে মাটির লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা পরিবেশ মন্ত্রণালয়-এর বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। বিশেষত, শুকিয়ে যাওয়া চরের জমিতে বালির পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং মাটির জৈব উপাদান হ্রাস পাচ্ছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC) কর্তৃক পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, তিস্তা অববাহিকার অনেক এলাকায় মাটির জল ধারণ ক্ষমতা (Water Holding Capacity) কমে গেছে এবং মাটির উপরিভাগের স্তর শুষ্ক ও কঠিন হয়ে পড়ছে। এটি মরুকরণের প্রাথমিক লক্ষণ। মাটির অনুজীব বৈচিত্র্যও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যা মাটির স্বাস্থ্য এবং পুষ্টিচক্রের জন্য অপরিহার্য। মাটির উর্বরতা কমে যাওয়ায় রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে মাটির গুণাগুণকে আরও অবনমিত করছে এবং ভূগর্ভস্থ পানিকেও দূষিত করছে।

৩.৩ জীববৈচিত্র্য ও প্রতিবেশের ওপর প্রভাব

তিস্তা নদী একসময় অসংখ্য জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদের আশ্রয়স্থল ছিল। এর সমৃদ্ধ মৎস্য সম্পদ স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবিকার অন্যতম প্রধান উৎস ছিল। কিন্তু এখন শুষ্ক তিস্তা মাছের প্রজনন ও বিচরণ ক্ষেত্রগুলো ধ্বংস করে দিয়েছে। DAE এবং পরিবেশ মন্ত্রণালয়-এর যৌথ পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, দেশীয় প্রজাতির মাছ যেমন রুই, কাতলা, মৃগেল, চিতল, শোল, গজার ইত্যাদি মাছের প্রাচুর্য মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে। অনেক প্রজাতি ইতিমধ্যেই বিলুপ্তির পথে। জলজ বাস্তুতন্ত্রের এই বিপর্যয় কেবল মাছের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। নদীর তীরবর্তী এবং চর অঞ্চলের বন্যপ্রাণী, পাখি এবং উভচর প্রাণীরাও তাদের আবাসস্থল ও খাদ্যের উৎস হারাচ্ছে। তিস্তার শুকিয়ে যাওয়া শাখা নদী ও খালগুলোও মরে যাচ্ছে, যা সামগ্রিক প্রতিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করছে। একদা সবুজে ঘেরা তিস্তা অববাহিকার অনেক এলাকা এখন ধু ধু বালুচরে পরিণত হচ্ছে, যেখানে উদ্ভিদ ও প্রাণী জগতের টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। এই পরিবর্তন স্থানীয় জলবায়ুর ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন আসছে।

৩.৪ জনস্বাস্থ্য ও জীবনযাত্রার মান

পরিবেশ-প্রতিবেশের এই অবনতি জনস্বাস্থ্য এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মানকেও প্রভাবিত করছে। বিশুদ্ধ পানির অভাব, খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকি, এবং মরুকরণজনিত কারণে সৃষ্ট ধুলোবালি ও বায়ুদূষণ শ্বাসযন্ত্রের রোগসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে। DAE-এর তথ্য অনুযায়ী, তিস্তা অববাহিকার কৃষকদের আয় কমে যাওয়ায় তাদের পুষ্টি ও স্বাস্থ্য সেবায় ব্যয় করার ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে। FAO-এর নির্দেশিকা অনুযায়ী, নিরাপদ পানির প্রাপ্যতা খাদ্য নিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তিস্তার পানিশূন্যতা এই অঞ্চলের মানুষের জন্য সেই নিরাপত্তা বিঘ্নিত করছে। সামগ্রিকভাবে, শুষ্ক তিস্তা বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের পরিবেশ-প্রতিবেশে এক গভীর সংকট তৈরি করেছে। মৃত্তিকার উর্বরতা হ্রাস, জীববৈচিত্র্যের ক্ষয় এবং জনস্বাস্থ্যঝুঁকি মরুকরণের স্পষ্ট পদধ্বনি। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরিভিত্তিতে সমন্বিত ও টেকসই সমাধান অপরিহার্য, যা কেবল নদীর পানি প্রবাহ পুনরুদ্ধার নয়, বরং সামগ্রিক বাস্তুতন্ত্রের পুনরুজ্জীবন নিশ্চিত করবে।

অধ্যায় ৪: সামাজিক-অর্থনৈতিক বিপর্যয় ও মানবিক সংকট: জলশূন্যতার বহুমুখী প্রভাব

অধ্যায় ৪: সামাজিক-অর্থনৈতিক বিপর্যয় ও মানবিক সংকট: জলশূন্যতার বহুমুখী প্রভাব

তিস্তা নদীর উজানে অপরিকল্পিত পানি প্রত্যাহারের ফলে ভাটি অঞ্চলের সামাজিক-অর্থনৈতিক কাঠামোতে যে বহুমুখী বিপর্যয় নেমে এসেছে, তা কেবল একটি পরিবেশগত সংকট নয়, বরং একটি সুদূরপ্রসারী মানবিক বিপর্যয়। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে ধারাবাহিক বিঘ্ন ঘটায় কৃষি, মৎস্যসম্পদ, জনস্বাস্থ্য, জীবিকা এবং সামগ্রিক বাস্তুতন্ত্রে এক গভীর ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে, যা অঞ্চলটিকে মরুপৃষ্ঠের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই অধ্যায়ে তিস্তার জলশূন্যতার কারণে সৃষ্ট সামাজিক-অর্থনৈতিক দুরবস্থা এবং মানবিক সংকটের বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করা হলো।

৪.১ কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তায় প্রভাব

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের কৃষি মূলত তিস্তা নদীর পানির ওপর নির্ভরশীল। শুষ্ক মৌসুমে তিস্তার প্রবাহ ব্যাপক হারে কমে যাওয়ায় সেচনির্ভর কৃষিব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষ করে রংপুর, নীলফামারী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা জেলার বিশাল অঞ্চলের বোরো ধান, আলু, ভুট্টা ও অন্যান্য রবিশস্যের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।

  • সেচ সংকট: তিস্তা ব্যারেজ প্রকল্পের আওতায় প্রায় ১.১১ লক্ষ হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা প্রদানের কথা থাকলেও, পর্যাপ্ত পানি না থাকায় শুষ্ক মৌসুমে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হচ্ছে না। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (BADC) এবং স্থানীয় কৃষক সমবায় সমিতির তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থ বছরে তিস্তা কমান্ড এলাকার প্রায় ৬০-৭০% জমিতে আকাঙ্ক্ষিত সেচ সুবিধা পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। এর ফলে অনেক কৃষক গভীর নলকূপের ওপর নির্ভরশীল হতে বাধ্য হচ্ছেন, যা উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি করছে এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তরকে আরও নিচে নামিয়ে দিচ্ছে।
  • শস্যের বৈচিত্র্য হ্রাস: পানির অভাবে কৃষক ঐতিহ্যবাহী লাভজনক শস্য আবাদ থেকে সরে এসে কম পানি নির্ভর বা খরা সহনশীল শস্যের দিকে ঝুঁকছেন। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI) এর গবেষণা অনুযায়ী, তিস্তা অববাহিকার অনেক এলাকায় বোরো ধানের আবাদ কমে গেছে এবং ভুট্টা ও গম আবাদের প্রবণতা বাড়ছে, যা স্থানীয় খাদ্য সংস্কৃতি ও পুষ্টি নিরাপত্তায় পরিবর্তন আনছে।
  • মাটির উর্বরতা হ্রাস: নদীর স্বাভাবিক পলি প্রবাহ কমে যাওয়ায় কৃষি জমির প্রাকৃতিক উর্বরতা হ্রাস পাচ্ছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) পরিচালিত সমীক্ষায় দেখা গেছে, শুষ্ক মৌসুমে তিস্তার চর এলাকায় মাটির গুণগত মান (Organic Matter Content) উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে, যা রাসায়নিক সারের ব্যবহার বাড়াতে বাধ্য করছে এবং দীর্ঘমেয়াদে মাটির স্বাস্থ্য নষ্ট করছে।

নিম্নোক্ত সারণিতে তিস্তা অববাহিকার প্রধান ফসলের উৎপাদন প্রবণতা ও সেচ পরিস্থিতি তুলে ধরা হলো:

অর্থ বছর বোরো ধানের আবাদকৃত জমি (হেক্টর) বোরো ধানের উৎপাদন (মেট্রিক টন) সেচ প্রাপ্ত জমির হার (তিস্তা কমান্ড এলাকা) ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন (মিলিয়ন ঘনমিটার)
২০২০-২১ ১,৪০,৫০০ ৬,৩০,০০০ ৭৫% ১,৮৫০
২০২১-২২ ১,৩০,২০০ ৫,৮৫,০০০ ৬২% ২,২০০
২০২২-২৩ ১,১৫,৮০০ ৫,২০,০০০ ৫২% ২,৬৫০
উৎস: কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) ও বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC), ২০২৩-২৪ অর্থ বছরের প্রাথমিক তথ্য।

৪.২ মৎস্যসম্পদ ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষয়

নদীর প্রবাহ কমে যাওয়ায় তিস্তার মৎস্যসম্পদ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মাছের প্রজনন ক্ষেত্র ধ্বংস হচ্ছে এবং অনেক দেশীয় প্রজাতির মাছ বিলুপ্তির পথে।

  • মাছের আবাসস্থল ধ্বংস: শুষ্ক মৌসুমে নদীর গভীরতা কমে যাওয়ায় এবং চর জেগে ওঠায় মাছের চলাচলের পথ ও প্রজনন ক্ষেত্র বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। মৎস্য অধিদপ্তর (Department of Fisheries) এর তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে তিস্তা নদীতে ইলিশ, রুই, কাতলা, মৃগেল, পাঙ্গাস ও অন্যান্য দেশীয় প্রজাতির মাছের প্রাপ্যতা প্রায় ৭০% হ্রাস পেয়েছে।
  • জীববৈচিত্র্য হ্রাস: শুধু মাছ নয়, নদীর উপর নির্ভরশীল অন্যান্য জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদের বাস্তুতন্ত্রও হুমকির মুখে। পরিবেশ মন্ত্রণালয় ও আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থা (IUCN) এর যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, তিস্তা অববাহিকায় বিগত ২০ বছরে প্রায় ২৫ প্রজাতির জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণীর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে, যার মধ্যে অনেকগুলোই স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
  • মৎস্যজীবীদের জীবিকা সংকট: মৎস্যসম্পদ হ্রাসের কারণে তিস্তা পাড়ের হাজার হাজার মৎস্যজীবী পরিবার জীবিকা সংকটে পড়েছে। বিকল্প কর্মসংস্থানের অভাবে তারা শহরমুখী হচ্ছে বা পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হচ্ছে, যা সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করছে।

৪.৩ জনস্বাস্থ্য ও স্যানিটেশন চ্যালেঞ্জ

নদীতে পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে, যা সুপেয় পানির সংকট তৈরি করছে এবং জনস্বাস্থ্যে বিরূপ প্রভাব ফেলছে।

  • সুপেয় পানির অভাব: শুষ্ক মৌসুমে নলকূপগুলোতে পর্যাপ্ত পানি না পাওয়ায় গ্রামীণ জনগোষ্ঠী অনিরাপদ উৎস থেকে পানি সংগ্রহ করতে বাধ্য হচ্ছে। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (DPHE) এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিস্তা অববাহিকার অনেক এলাকায় আর্সেনিকযুক্ত পানির ঝুঁকি বৃদ্ধি পাচ্ছে, কারণ ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় আর্সেনিকের ঘনত্ব বাড়ছে।
  • স্যানিটেশন সমস্যা: নদীর পানি কমে যাওয়ায় স্থানীয় স্যানিটেশন ব্যবস্থায়ও প্রভাব পড়ছে। নদী তীরবর্তী এলাকার মানুষের জন্য পয়ঃনিষ্কাশনের প্রাকৃতিক মাধ্যমগুলো ব্যাহত হচ্ছে, যা স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াচ্ছে এবং পরিবেশ দূষণ ঘটাচ্ছে।
  • রোগের প্রাদুর্ভাব: বিশুদ্ধ পানির অভাবে পানিবাহিত রোগের (যেমন – ডায়রিয়া, কলেরা, টাইফয়েড) প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এর স্থানীয় প্রতিনিধিরা এ অঞ্চলে বিশুদ্ধ পানির প্রাপ্যতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

৪.৪ সামাজিক পরিবর্তন ও অর্থনৈতিক অভিবাসন

তিস্তার জলশূন্যতা গ্রামীণ সমাজে গভীর সামাজিক পরিবর্তন আনছে এবং অর্থনৈতিক অভিবাসনের প্রবণতা বৃদ্ধি করছে।

  • জীবিকা হারানো: কৃষি ও মৎস্য খাতের বিপর্যয় হাজার হাজার মানুষকে বেকার করে তুলছে। কর্মসংস্থানের অভাবে তারা কাজের সন্ধানে শহর বা বিদেশে পাড়ি জমাতে বাধ্য হচ্ছে, যা গ্রামীণ পরিবারগুলোতে ভাঙন ধরাচ্ছে এবং সামাজিক কাঠামো দুর্বল করছে।
  • দারিদ্র্য বৃদ্ধি: উপার্জন কমে যাওয়ায় তিস্তা অববাহিকার অনেক পরিবার দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাচ্ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS) এর সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, রংপুর ও লালমনিরহাট জেলার গ্রামীণ এলাকায় কৃষি নির্ভর পরিবারের আয় গত ৫ বছরে গড়ে ২০-২৫% কমেছে।
  • ভূমিহীনতা বৃদ্ধি: নদীভাঙন এবং চরের জমি মরুভূমিতে পরিণত হওয়ায় অনেক কৃষক তাদের আবাদযোগ্য জমি হারাচ্ছেন, যা ভূমিহীন মানুষের সংখ্যা বাড়াচ্ছে। এই ভূমিহীন জনগোষ্ঠী প্রায়শই চরম দারিদ্র্য ও সামাজিক বঞ্চনার শিকার হচ্ছে।

তিস্তার জলশূন্যতা শুধু একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, এটি একটি মানবসৃষ্ট সংকট যা উত্তরাঞ্চলের সামাজিক-অর্থনৈতিক উন্নয়নকে পিছিয়ে দিচ্ছে এবং মানবিক জীবনযাত্রার মানকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এই বহুমুখী প্রভাব মোকাবেলায় আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ অপরিহার্য।

অধ্যায় ৫: ভবিষ্যৎ পথের দিশা: আঞ্চলিক সহযোগিতা, বৈজ্ঞানিক সমাধান ও টেকসই জল ব্যবস্থাপনার রূপরেখা


✍️ নিবন্ধ লেখক: সায়েম মালিক

সায়েম মালিক 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: পানি সম্পদ ও আন্তর্জাতিক নদী ব্যবস্থাপনা। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Không có bình luận nào được tìm thấy


News Card Generator