চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার পাহাড়তলী ইউনিয়নের চৌমুহনী বাজারে প্রকাশ্য দিবালোকে যুবদল নেতা মাসুদুল হক চৌধুরী মাসুদকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় রহস্য ক্রমেই ঘনীভূত হচ্ছে। ঘটনার তিন দিন পর নিহতের বড় ভাই পেয়ারুল হক চৌধুরী স্বপন বাদী হয়ে ১১ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও ৭-৮ জনকে আসামি করে মোট ১৯ জনের বিরুদ্ধে রাউজান থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেছেন।
তবে হত্যাকাণ্ডের পর এখন পর্যন্ত মূল হামলাকারীদের কাউকে গ্রেফতার করা না হলেও র্যাব একজনকে আটক করেছে। আটক ব্যক্তির নাম রায়হান। তিনি রাউজানের পেয়াদা পাড়া এলাকার বাসিন্দা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সিসিটিভি ফুটেজে তাকে নিহত মাসুদের প্যান্টের পকেট থেকে মানিব্যাগ নিতে দেখা যায়। স্থানীয়দের অভিযোগ, আটক রায়হান মানসিক ভারসাম্যহীন প্রকৃতির ব্যক্তি। ফলে প্রকৃত খুনিরা এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকায় নিহতের পরিবার, রাজনৈতিক সহকর্মী ও স্থানীয় জনগণের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ বিরাজ করছে।
গত ১৩ জুন দুপুর ১টা ২০ মিনিটে রাউজানের ব্যস্ত চৌমুহনী বাজার এলাকায় সংঘটিত হয় আলোচিত এ হত্যাকাণ্ড। নিহত মাসুদুল হক চৌধুরী রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। একই সঙ্গে তিনি এলাকায় একজন পরিচিত রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যক্তিত্ব হিসেবেও পরিচিত ছিলেন।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র ও সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, হামলাকারীরা অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে হত্যামিশন পরিচালনা করে। তারা দুপুর ১টা ১০ মিনিটের দিকে এলাকায় প্রবেশ করে এবং হত্যাকাণ্ড সংঘটনের পর ১টা ২৩ মিনিট ৪৬ সেকেন্ডে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। অর্থাৎ পুরো অপারেশনটি ১৫ মিনিটেরও কম সময়ে সম্পন্ন হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ বাঁচাতে দৌড়ে একটি ওষুধের দোকানের সামনে এসে লুটিয়ে পড়েন মাসুদ। পরে কয়েকজন অস্ত্রধারী তার কাছে গিয়ে খুব কাছ থেকে পুনরায় গুলি চালিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করে। এরপর কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছুড়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করে একটি সিএনজি অটোরিকশাযোগে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে তারা।
হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের তৎপরতা আশপাশের একাধিক সিসিটিভি ক্যামেরায় ধরা পড়েছে। ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ ও স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, অস্ত্রধারী পাঁচজনের মধ্যে চারজনের পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। তারা হলেন দিদারুল আলম, মো. ইলিয়াছ ওরফে ধামা ইলিয়াছ, আবছার এবং মো. ইউছুফ।
স্থানীয় সূত্র ও পুলিশ জানায়, হামলাকারীদের মধ্যে তিনজনের হাতে পিস্তল এবং দুজনের হাতে শটগান ছিল। এছাড়া তাদের সহায়তায় একটি ব্যাকআপ টিমও সক্রিয় ছিল বলে জানা গেছে। ওই দলে মো. পারভেজ ও মো. আইয়ুব নামে আরও দুই ব্যক্তি ছিলেন বলে স্থানীয়দের দাবি।
স্থানীয়ভাবে শনাক্ত হওয়া পাঁচ অস্ত্রধারীর সবাই বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে অভিযোগ উঠেছে, যা ঘটনাটিকে ঘিরে নতুন আলোচনা ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।
সূত্রমতে, অস্ত্রধারী পাঁচজনসহ মোট সাতজনই বিদেশে অবস্থানরত শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদের অনুসারী রায়হান বাহিনীর সদস্য। বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গুরুত্বসহকারে খতিয়ে দেখছে বলে জানা গেছে।
সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণে দেখা যায়, গোলাপি রঙের শার্ট পরিহিত শটগানধারী ব্যক্তি ধামা ইলিয়াছ, কালো টি-শার্ট পরিহিত শটগানধারী আবছার এবং জলপাই রঙের টি-শার্ট পরিহিত পিস্তলধারীদের মধ্যে ছিলেন মো. ইউছুফ ও দিদারুল আলম। স্থানীয়দের দাবি, শনাক্ত ব্যক্তিদের কয়েকজন ইউনিয়ন পর্যায়ের বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত।
১৪ জুন বিকেল ৫টা ২৫ মিনিটে রাঙ্গুনিয়ার বেতাগী চম্পাতলী মাঠে নিহত মাসুদের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধি এবং বিপুলসংখ্যক সাধারণ মানুষ অংশ নেন। পরে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
জানাজায় অংশ নেওয়া উত্তর জেলা যুবদলের নেতারা বলেন, “খুনিরা যতই প্রভাবশালী হোক না কেন, তাদের দ্রুত গ্রেফতার করে আইনের আওতায় এনে বিচার নিশ্চিত করতে হবে। প্রকাশ্যে একজন রাজনৈতিক নেতাকে হত্যা করা হলেও এখনো মূল আসামিদের গ্রেফতার না করায় মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।”
চট্টগ্রামের সহকারী পুলিশ সুপার (রাঙ্গুনিয়া সার্কেল) মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন বলেন, “অস্ত্র হাতে থাকা পাঁচজনকে শনাক্ত করা গেলেও হত্যাকাণ্ডে আরও ব্যক্তি জড়িত থাকতে পারে। তদন্তের স্বার্থে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা যাচ্ছে না।”
তিনি আরও বলেন, “নিহত মাসুদ বালু ব্যবসা ও রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। প্রাথমিকভাবে বালু ব্যবসা-সংক্রান্ত বিরোধকে হত্যার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে রাজনৈতিক বিরোধ কিংবা অন্য কোনো কারণ রয়েছে কি না, সেটিও গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে।”
অন্যদিকে নিহতের পরিবারের দাবি, মাসুদুল হক চৌধুরী আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এলাকায় তার জনপ্রিয়তা ও রাজনৈতিক প্রভাব বাড়তে থাকায় পরিকল্পিতভাবে তাকে নির্বাচনের মাঠ থেকে সরিয়ে দিতে এ হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পাহাড়তলীর এক ব্যবসায়ী জানান, রাউজানের আলোচিত সন্ত্রাসী ফজলুল হক ওরফে ফজল হক দীর্ঘদিন বিদেশে থাকার পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেশে ফিরে আসেন। বর্তমানে তিনি বালুর ব্যবসা, মাটি কাটা ও চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। নিহত মাসুদও বালু ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। ফলে ব্যবসায়িক বিরোধ থেকেই হত্যাকাণ্ডের সূত্রপাত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তিনি দাবি করেন, প্রায় এক মাস আগে বিরোধের জেরে ফজল হকের দুটি ড্রেজার ডুবিয়ে দেওয়া হয়। অন্যদিকে ফজল গ্রুপ মাসুদের একটি এক্সকাভেটরে আগুন দেয় বলেও এলাকায় আলোচনা রয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, “মাসুদ বেতাগী বালুমহাল নিয়ন্ত্রণ করতেন। আগে তিনি ও ফজল একই গ্রুপে ছিলেন। রাউজান-রাঙ্গুনিয়া বালুমহাল থেকে প্রতি মাসে বিপুল অঙ্কের চাঁদা বিদেশে অবস্থানরত সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদের কাছে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “সিসিটিভি ফুটেজে সাজ্জাদ বাহিনীর অস্ত্রধারীদের গুলি চালাতে দেখা গেছে। মাসুদের সঙ্গে সাজ্জাদ গ্রুপের বিরোধ নাকি অন্য কোনো কারণে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।”
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বেতাগী ও খেলাঘাট এলাকার কয়েকটি বালুমহাল এবং বালু পরিবহন কার্যক্রমের সঙ্গে মাসুদ জড়িত ছিলেন। গত বছরের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ওই ব্যবসায় তার প্রভাব বৃদ্ধি পায়। ফলে ব্যবসায়িক স্বার্থ, আধিপত্য বিস্তার এবং অর্থনৈতিক বিরোধ থেকেও হত্যাকাণ্ডের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে বলে তাদের ধারণা।
তবে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, ব্যবসায়িক বিরোধ কিংবা ব্যক্তিগত শত্রুতা—কোন কারণটি এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে কাজ করেছে, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ফলে ঘটনার প্রকৃত কারণ নিয়ে এলাকায় নানা আলোচনা ও জল্পনা-কল্পনা চলছে।
সচেতন মহলের মতে, এ ধরনের প্রকাশ্য হত্যাকাণ্ড শুধু একজন রাজনৈতিক নেতার মৃত্যু নয়, বরং জননিরাপত্তার জন্যও একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। তারা দ্রুত, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত রহস্য উদঘাটন এবং জড়িতদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।
এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। যেকোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। পাশাপাশি গোয়েন্দা নজরদারিও বাড়ানো হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।