কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নাকি কৃত্রিম নির্ভরতা? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নাকি কৃত্রিম নির্ভরতা?

Salauddin Akbar avatar   
Salauddin Akbar
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নাকি কৃত্রিম নির্ভরতা?
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নাকি কৃত্রিম নির্ভরতা?
ছবি: সংগৃহীত
এআই কি মানুষের মস্তিষ্কের সহচর, নাকি তার অলসতার অভিভাবক?
- সালাউদ্দিন আকবর , ঢাকা..

মানুষ একদিন আকাশে উড়তে চেয়েছিল, তাই বিমান আবিষ্কার করেছে। দূরের মানুষের সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিল, তাই টেলিফোন এসেছে। জ্ঞানের পরিধি বাড়াতে চেয়েছিল, তাই সৃষ্টি হয়েছে কম্পিউটার। সেই ধারাবাহিকতার সর্বশেষ বিস্ময়ের নাম— কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। 

কিন্তু প্রশ্ন হলো, এআই কি মানুষের মস্তিষ্কের সহচর, নাকি তার অলসতার অভিভাবক?

সৃজনশীলতা ও চিন্তার সংকট:

একসময় কবি শব্দ খুঁজতেন রাত জেগে, গীতিকার ছন্দের জন্য হাঁটতেন নদীর পাড়ে, বিজ্ঞানী বছরের পর বছর গবেষণাগারে কাটাতেন, সাহিত্যিক একটি চরিত্র নির্মাণে জীবন থেকে জীবন ধার করতেন। সৃষ্টির পেছনে ছিল ঘাম, ধৈর্য, কল্পনা এবং মস্তিষ্কের নিরবচ্ছিন্ন অনুশীলন।

আজ একটি নির্দেশনা লিখলেই এআই কবিতা লিখে দেয়, গান তৈরি করে দেয়, প্রবন্ধ সাজিয়ে দেয়। প্রযুক্তির এই সক্ষমতা বিস্ময়কর, কিন্তু এর আড়ালে লুকিয়ে আছে এক নীরব বিপদ— চিন্তার পেশি ক্ষয় হওয়ার আশঙ্কা।

যে হাত একসময় কলম ধরত, সে হাত এখন কেবল নির্দেশনা লিখছে। যে মস্তিষ্ক বিশ্লেষণ করত, সে মস্তিষ্ক কখনো কখনো উত্তর খোঁজার আগেই উত্তর পেয়ে যাচ্ছে। ফলে জ্ঞান অর্জনের পরিবর্তে তৈরি হচ্ছে জ্ঞান-নির্ভরতার এক নতুন সংস্কৃতি।

 

শিক্ষার্থীদের এআই নির্ভরতা ও চাকরিক্ষেত্রে এআই :

বিশেষ করে শিক্ষাক্ষেত্রে এআইয়ের প্রভাব এখন সবচেয়ে বেশি আলোচিত। অনেক শিক্ষার্থী গবেষণা, অ্যাসাইনমেন্ট কিংবা সৃজনশীল লেখার ক্ষেত্রে এআইকে সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করছে। এটি সময় বাঁচাচ্ছে এবং নতুন ধারণা খুঁজে পেতে সাহায্য করছে। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, অনেকেই নিজেরা চিন্তা না করেই এআই-নির্ভর উত্তর জমা দিচ্ছে। ফলে মুখস্থ বিদ্যার পরিবর্তে তৈরি হচ্ছে 'প্রস্তুত জ্ঞানের' সংস্কৃতি। যে শিক্ষার্থী একসময় একটি উত্তরের জন্য পাঁচটি বই ঘাঁটত, সে আজ কখনো কখনো একটি প্রশ্ন লিখেই সম্পূর্ণ উত্তর পেয়ে যাচ্ছে। এতে শেখার গতি বাড়লেও চিন্তার গভীরতা কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

চাকরিক্ষেত্রেও এআই এক নতুন বাস্তবতা সৃষ্টি করেছে। অনেক নিয়মিত ও পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ এখন যন্ত্রের মাধ্যমে দ্রুত সম্পন্ন হচ্ছে। ফলে কিছু পেশায় কর্মসংস্থানের ধরন বদলে যাচ্ছে। তবে একই সঙ্গে সৃষ্টি হচ্ছে নতুন নতুন দক্ষতাভিত্তিক কাজের সুযোগও। যারা প্রযুক্তিকে বুঝে নিজেদের দক্ষতা বাড়াতে পারছেন, তারা এগিয়ে যাচ্ছেন। আর যারা পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে ব্যর্থ হচ্ছেন, তারা পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কায় রয়েছেন। তাই এআইকে প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং দক্ষতা বৃদ্ধির একটি শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে দেখা উচিত।

এআইকে দোষারোপ করলেই হবে না , তার ভালো ও খারাপ ব্যবহার:

এআইকে দোষারোপ করলেই সত্যের পূর্ণাঙ্গ প্রতিচ্ছবি পাওয়া যাবে না।

ছুরি দিয়ে যেমন ফলও কাটা যায়, আবার অপরাধও সংঘটিত হতে পারে; এআইও তেমনই একটি নিরপেক্ষ যন্ত্র। একজন প্রকৃত গবেষক এআইকে ব্যবহার করছেন তথ্যভাণ্ডার হিসেবে, একজন দক্ষ লেখক ব্যবহার করছেন ভাবনা শানিত করার সহায়ক হিসেবে, একজন চিকিৎসক ব্যবহার করছেন বিশ্লেষণগত সহকারী হিসেবে। আবার অন্যদিকে কেউ কেউ এটিকে নকলের কারখানা বানিয়ে ফেলছেন।

আজ কেউ গবেষণার গভীরতা বাড়াতে এআই ব্যবহার করে ডক্টরেট অর্জন করছেন, আবার কেউ সামাজিক মাধ্যমে মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছেন। কেউ আইনের জটিল তথ্য বিশ্লেষণ করে ন্যায়বিচারের পথ খুঁজছেন, আবার কেউ কৃত্রিম ছবি ও ভিডিও তৈরি করে মানুষের সম্মানহানি করছেন।

চিকিৎসা ও গবেষণায় এআইয়ের ইতিবাচক ভূমিকা:

চিকিৎসা, বিজ্ঞান ও গবেষণার জগতে এআই ইতোমধ্যে আশীর্বাদ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। চিকিৎসকেরা জটিল রোগ শনাক্তকরণে, গবেষকেরা বিপুল তথ্য বিশ্লেষণে এবং বিজ্ঞানীরা নতুন সম্ভাবনা অনুসন্ধানে এআইয়ের সহায়তা নিচ্ছেন। যে তথ্য বিশ্লেষণে আগে মাসের পর মাস সময় লাগত, তা এখন অনেক ক্ষেত্রে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সম্ভব হচ্ছে। ফলে জ্ঞানের নতুন দুয়ার উন্মোচিত হচ্ছে এবং মানবকল্যাণে গবেষণার গতি বাড়ছে।

ডিপফেক ও ভুয়া তথ্যের ঝুঁকি :

প্রযুক্তির এই উজ্জ্বল দিকের পাশাপাশি রয়েছে এক অন্ধকার ছায়াও। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে এখন এমন ছবি, ভিডিও ও অডিও তৈরি করা সম্ভব, যা বাস্তবের সঙ্গে পার্থক্য করা কঠিন। ডিপফেক প্রযুক্তি ব্যবহার করে কারও বক্তব্য বিকৃত করা, মিথ্যা ঘটনা প্রচার করা কিংবা ব্যক্তিগত সম্মানহানি ঘটানো আজ বৈশ্বিক উদ্বেগের বিষয়। একটি ভুয়া ভিডিও কখনো কখনো সত্যের চেয়েও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং সমাজে বিভ্রান্তি, অবিশ্বাস ও অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে। তাই এআই ব্যবহারের পাশাপাশি তথ্য যাচাই, ডিজিটাল সচেতনতা এবং নৈতিকতার চর্চাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। প্রযুক্তি এখানে অপরাধী নয়; অপরাধী হলো ব্যবহারকারীর উদ্দেশ্য।

প্রযুক্তি নয়, ব্যবহারকারীই নির্ধারক :

একজন প্রকৃত কবি এআইকে ব্যবহার করেন অভিধান হিসেবে, ভাবনার সহচর হিসেবে। কিন্তু একজন নকলবাজ এআইকে ব্যবহার করেন শর্টকাট হিসেবে। ফলাফলও তাই ভিন্ন হয়। প্রথমজন সৃষ্টি করেন শিল্প, দ্বিতীয়জন তৈরি করেন শব্দের জঞ্জাল।

আমাদের মনে রাখতে হবে, এআই মানুষের সৃষ্টি। মানুষের মেধা, গবেষণা ও কল্পনার ফসল। তাই এআই কখনো মানুষের শ্রেষ্ঠত্বকে অতিক্রম করতে পারে না, যদি মানুষ নিজের চিন্তাশক্তিকে সচল রাখে। কিন্তু যদি মানুষ চিন্তা করা ছেড়ে দেয়, তবে সে নিজেই নিজের ওপর প্রযুক্তির আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করবে।

যুদ্ধক্ষেত্রে এআই বিজয়ের কৌশল দিতে পারে, কিন্তু সৈনিকের সাহস দিতে পারে না। চিকিৎসাবিজ্ঞানে তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারে, কিন্তু মানবিক সহমর্মিতা দিতে পারে না। কবিতা লিখে দিতে পারে, কিন্তু হৃদয়ের ক্ষত অনুভব করতে পারে না।

তাই এআইকে ব্যবহার করুন জ্ঞানের গ্রন্থাগার হিসেবে, চিন্তার বিকল্প হিসেবে নয়। একে রাখুন গবেষণার টেবিলে, কিন্তু বসতে দেবেন না আপনার মস্তিষ্কের সিংহাসনে।

যেমন সুস্থ শরীর গড়তে প্রয়োজন সুষম খাদ্য, তেমনি প্রযুক্তিকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে প্রয়োজন শিক্ষা, দক্ষতা ও নৈতিকতা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তখনই আশীর্বাদ, যখন মানুষের স্বাভাবিক বুদ্ধিমত্তা তার নেতৃত্বে থাকে।

অন্যথায় আমরা হয়তো প্রযুক্তিগতভাবে আধুনিক হবো, কিন্তু চিন্তার দিক থেকে ক্রমশ দরিদ্র হয়ে পড়ব।

সভ্যতার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এআইয়ের ওপর নয়, বরং এআই ব্যবহারকারী মানুষের প্রজ্ঞার ওপর।

 

লেখক ও প্রাবন্ধিক 

বশিলা , মোহাম্মদপুর , ঢাকা 

コメントがありません


News Card Generator