জিয়াউর রহমানের খালকাটা কর্মসূচি: ইতিহাস, বাস্তবতা ও বর্তমান প্রাসঙ্গিকতা.. | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

জিয়াউর রহমানের খালকাটা কর্মসূচি: ইতিহাস, বাস্তবতা ও বর্তমান প্রাসঙ্গিকতা..

Salauddin Akbar avatar   
Salauddin Akbar
জিয়াউর রহমানের খালকাটা কর্মসূচি: ইতিহাস, বাস্তবতা ও বর্তমান প্রাসঙ্গিকতা..
জিয়াউর রহমানের খালকাটা কর্মসূচি: ইতিহাস, বাস্তবতা ও বর্তমান প্রাসঙ্গিকতা..
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি কক্সবাজারের পিএমখালীতে পাতলী খাল পুনঃখনন কর্মসূচির উদ্বোধনের মাধ্যমে দেশের খাল পুনরুদ্ধার উদ্যোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে।..

- সালাউদ্দিন আকবর 

বাংলাদেশের ইতিহাসে উন্নয়নমূলক উদ্যোগগুলোর মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হলো প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এর ‘খালকাটা কর্মসূচি’। স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে পুনর্গঠনের জন্য তিনি যে বাস্তবমুখী পদক্ষেপগুলো নিয়েছিলেন, তার মধ্যে এই উদ্যোগটি বিশেষভাবে আলোচিত।

খালকাটা কর্মসূচির পটভূমি

১৯৭০-এর দশকের শেষভাগে বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতি ছিল প্রধানত কৃষিনির্ভর। কিন্তু সেচব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, জলাবদ্ধতা এবং বন্যার কারণে কৃষি উৎপাদন বারবার বাধাগ্রস্ত হতো। এই বাস্তবতায় জিয়াউর রহমান একটি সহজ কিন্তু কার্যকর সমাধান সামনে আনেন—দেশজুড়ে খাল খনন ও সংস্কার।

কর্মসূচির উদ্দেশ্য

খালকাটা কর্মসূচির মূল লক্ষ্য ছিল—

  • সেচব্যবস্থার উন্নয়ন

  • অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশনের সুযোগ তৈরি

  • কৃষিজমির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি

  • গ্রামীণ বেকার জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান সৃষ্টি

এই কর্মসূচির মাধ্যমে একইসাথে কৃষি ও কর্মসংস্থানের সমস্যা মোকাবেলার চেষ্টা করা হয়, যা সেই সময়ের জন্য ছিল অত্যন্ত দূরদর্শী চিন্তা।

খালকাটা কর্মসূচির লক্ষ্যগুলোর বিস্তারিত ব্যাখ্যা

১. সেচব্যবস্থার উন্নয়ন

বাংলাদেশের কৃষি অনেকটাই প্রাকৃতিক বৃষ্টির ওপর নির্ভরশীল ছিল। খাল খনন ও সংস্কারের মাধ্যমে নদী, পুকুর বা জলাধার থেকে পানি সহজে জমিতে পৌঁছানো সম্ভব হয়। এতে শুকনো মৌসুমেও কৃষকরা ফসল ফলাতে পারেন।
এই উন্নত সেচব্যবস্থা—

  • এক ফসলি জমিকে বহু ফসলি জমিতে রূপান্তর করে

  • বোরো ধানসহ শুষ্ক মৌসুমের ফসল উৎপাদনে সহায়তা করে

  • কৃষকের পানি নির্ভরতা কমিয়ে নিয়ন্ত্রণযোগ্য সেচব্যবস্থা গড়ে তোলে

২. অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশনের সুযোগ তৈরি

বর্ষা মৌসুমে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের কারণে অনেক এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়, যা ফসলের জন্য ক্ষতিকর। খালকাটা কর্মসূচির মাধ্যমে এই অতিরিক্ত পানি দ্রুত নিষ্কাশনের পথ তৈরি হয়।
এর ফলে—

  • জমিতে পানি জমে থাকার সময় কমে যায়

  • ফসল নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি কমে

  • বসতবাড়ি ও গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষা পায়

  • বন্যার ক্ষয়ক্ষতি আংশিকভাবে নিয়ন্ত্রণে আসে

৩. কৃষিজমির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি

যখন জমিতে সঠিক সময়ে পানি পৌঁছায় এবং অতিরিক্ত পানি দ্রুত সরে যায়, তখন মাটির উর্বরতা ও ফসলের বৃদ্ধি উভয়ই উন্নত হয়।
এই কর্মসূচির কারণে—

  • জমিতে বছরে একাধিক ফসল ফলানো সম্ভব হয়

  • ফসলের গুণগত মান উন্নত হয়

  • কৃষকের আয় বৃদ্ধি পায়

  • খাদ্য উৎপাদন বাড়ে, যা জাতীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে

৪. গ্রামীণ বেকার জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান সৃষ্টি

খাল খনন ও সংস্কারের কাজ ছিল শ্রমনির্ভর। ফলে গ্রামে বসবাসরত বেকার ও অর্ধ-বেকার মানুষ এই কাজে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পেতেন।
এর মাধ্যমে—

  • স্বল্প সময়ের জন্য হলেও আয়ের সুযোগ তৈরি হয়

  • দরিদ্র মানুষের জীবনমান কিছুটা উন্নত হয়

  • গ্রামীণ অর্থনীতিতে অর্থের প্রবাহ বাড়ে

  • মানুষ উন্নয়নমূলক কাজে সরাসরি অংশগ্রহণের সুযোগ পায়

 

সব মিলিয়ে, খালকাটা কর্মসূচির লক্ষ্যগুলো ছিল একে অপরের সাথে সম্পর্কযুক্ত। সেচ, পানি নিষ্কাশন, উৎপাদনশীলতা ও কর্মসংস্থান—এই চারটি দিক একসাথে উন্নত করার মাধ্যমে একটি টেকসই গ্রামীণ অর্থনীতি গড়ে তোলাই ছিল এর মূল উদ্দেশ্য।

বাস্তবায়ন পদ্ধতি

এই উদ্যোগটি মূলত স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণের মাধ্যমে পরিচালিত হতো। সরকার প্রয়োজনীয় নির্দেশনা ও সহায়তা দিত, আর গ্রামবাসীরা সম্মিলিতভাবে খাল খনন বা পুরোনো খাল সংস্কারে অংশ নিতেন। এতে একদিকে যেমন সরকারি ব্যয় কম ছিল, অন্যদিকে জনগণের মধ্যে মালিকানাবোধও তৈরি হতো।

সুফল

খালকাটা কর্মসূচির ফলে গ্রামীণ জীবনে বেশ কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যায়—

  • অনেক এলাকায় সেচের সুযোগ বৃদ্ধি পায়

  • বন্যা ও জলাবদ্ধতা কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসে

  • কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পায়

  • দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য সাময়িক কর্মসংস্থান তৈরি হয়

এছাড়া, এই কর্মসূচি গ্রামীণ সমাজে সম্মিলিত উদ্যোগের এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।

খালকাটা কর্মসূচির সুফল: বিস্তারিত আলোচনা

১. অনেক এলাকায় সেচের সুযোগ বৃদ্ধি পায়

খাল খনন ও সংস্কারের ফলে নদী, খাল বা জলাধারের পানি সহজে কৃষিজমিতে পৌঁছাতে শুরু করে। আগে যেখানে কৃষকরা কেবল বর্ষার পানির ওপর নির্ভর করতেন, সেখানে এখন তারা নিয়ন্ত্রিত সেচব্যবস্থা ব্যবহার করতে পারেন।
এর ফলে—

  • শুষ্ক মৌসুমেও জমি চাষের উপযোগী হয়

  • এক ফসলি জমি দুই বা তিন ফসলি জমিতে পরিণত হয়

  • কৃষকরা পরিকল্পিতভাবে চাষাবাদ করতে পারেন
    এটি কৃষির স্থিতিশীলতা বাড়ায় এবং প্রাকৃতিক অনিশ্চয়তার ঝুঁকি কমায়।

২. বন্যা ও জলাবদ্ধতা কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসে

বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বর্ষায় অতিরিক্ত পানি জমে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। খালগুলো এই অতিরিক্ত পানি দ্রুত নিষ্কাশনের পথ তৈরি করে।
ফলস্বরূপ—

  • জমিতে দীর্ঘদিন পানি জমে থাকার সমস্যা কমে

  • ফসল নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি হ্রাস পায়

  • গ্রামীণ রাস্তা ও বসতবাড়ি রক্ষা পায়

  • স্থানীয় পর্যায়ে ছোটখাটো বন্যার প্রভাব কমে আসে
    যদিও বড় বন্যা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়, তবুও ক্ষয়ক্ষতি কমাতে এই খালগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

৩. কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পায়

সেচ ও পানি নিষ্কাশন—এই দুই সুবিধা একসাথে পাওয়ার ফলে কৃষিজমির উৎপাদনশীলতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।
এর মাধ্যমে—

  • একই জমিতে বছরে একাধিক ফসল উৎপাদন সম্ভব হয়

  • ফসলের গুণগত মান উন্নত হয়

  • কৃষকের আয় বৃদ্ধি পায়

  • খাদ্য নিরাপত্তা জোরদার হয়
    এটি শুধু ব্যক্তিগত নয়, জাতীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।

৪. দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য সাময়িক কর্মসংস্থান তৈরি হয়

খালকাটা কর্মসূচি ছিল শ্রমনির্ভর, ফলে গ্রামীণ দরিদ্র ও বেকার মানুষ সহজেই এতে অংশগ্রহণ করতে পারতেন।
এর ফলে—

  • তাৎক্ষণিক আয়ের সুযোগ সৃষ্টি হয়

  • দরিদ্র পরিবারের অর্থনৈতিক চাপ কিছুটা লাঘব হয়

  • স্থানীয় অর্থনীতিতে অর্থের প্রবাহ বাড়ে

  • মানুষ উন্নয়নমূলক কাজে যুক্ত হয়ে সামাজিক বন্ধনও দৃঢ় করে

সব মিলিয়ে, খালকাটা কর্মসূচির সুফলগুলো ছিল বহুমাত্রিক। এটি শুধু কৃষি উন্নয়নেই নয়, বরং গ্রামীণ জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক গতিশীলতা বৃদ্ধিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

সীমাবদ্ধতা ও সমালোচনা

তবে এই কর্মসূচি সম্পূর্ণভাবে সমালোচনামুক্ত ছিল না। কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায়—

  • খালগুলোর যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাব

  • পরিকল্পনার অভাবে কিছু খাল দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর থাকেনি

  • স্থানীয় পর্যায়ে সমন্বয়ের ঘাটতি

এসব কারণে অনেক এলাকায় এর সুফল দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।

 

বর্তমান সরকারের খাল খনন ও পুনঃখনন কর্মসূচির ফলপ্রসূতার বাস্তব অবস্থান :

বিশেষ করে যেভাবে এটি অতীতের উদ্যোগের সাথে সংযোগ তৈরি করছে এবং শহর ও গ্রামে পানির জলাবদ্ধতা, পরিবেশ ও কৃষি ব্যবস্থাপনার সমস্যাগুলোর সমাধানে ভূমিকা রাখছে। 

সম্প্রতি কক্সবাজারের পিএমখালীতে পাতলী খাল পুনঃখনন কর্মসূচির উদ্বোধনের মাধ্যমে দেশের খাল পুনরুদ্ধার উদ্যোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিমানবন্দর থেকে সড়কপথে পিএমখালী পৌঁছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বৃষ্টিস্নাত পরিবেশেই কোদাল দিয়ে পাতলী খালের পুনঃখনন কাজের আনুষ্ঠানিক সূচনা করেন। পরে তিনি খালের পাড়ে একটি খেজুরগাছের চারা রোপণ করেন, যা পরিবেশ সংরক্ষণ ও সবুজায়নের প্রতীকী বার্তা বহন করে।

এ উপলক্ষে পাতলী গ্রামের শত শত মানুষ সকাল থেকেই টানা বৃষ্টিকে উপেক্ষা করে খালের পাড়ে জড়ো হন। প্রধানমন্ত্রী সেখানে পৌঁছালে উপস্থিত জনতা হাত নেড়ে তাঁকে শুভেচ্ছা জানান এবং “প্রধানমন্ত্রীর আগমন, শুভেচ্ছা স্বাগতম” স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। সাধারণ মানুষের এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে খাল, নদী ও জলপথ পুনরুদ্ধারের বিষয়টি এখনো গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত।

ঘটনাটি অনেকের কাছেই স্মরণ করিয়ে দেয় রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সেই ঐতিহাসিক খালকাটা কর্মসূচির কথা। স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, জলাবদ্ধতা নিরসন এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখতে খাল পুনঃখননকে তিনি জাতীয় উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে খাল খনন ও পুনঃখননের যে গণমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছিল, তা শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন নয়, বরং জনগণকে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার একটি সফল উদাহরণ হিসেবেও বিবেচিত হয়।

আজ জলবায়ু পরিবর্তন, অনিয়ন্ত্রিত দখল, ভরাট ও নাব্যতা সংকটের কারণে দেশের অসংখ্য খাল অস্তিত্ব হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে। ফলে খাল পুনঃখনন ও জলপ্রবাহ পুনরুদ্ধারের প্রশ্নটি আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। পিএমখালীর পাতলী খাল পুনঃখননের উদ্যোগ তাই শুধু একটি স্থানীয় উন্নয়ন প্রকল্প নয়; এটি বাংলাদেশের ঐতিহাসিক খাল পুনরুদ্ধার আন্দোলনের ধারাবাহিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, যা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে টেকসই কৃষি, পরিবেশ সংরক্ষণ ও গ্রামীণ উন্নয়নের জন্য খাল বাঁচানো আজও সমান জরুরি।

১. খাল খনন কর্মসূচির পুনরুজ্জীবন ও ঐতিহাসিক সংযোগ

বর্তমানে দেশে একটি ব্যাপক নদী‑খাল‑জলাধার খনন ও পুনঃখনন কর্মসূচি চলছে, যার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়েছে দিনাজপুরের সাহাপাড়া খালে। এর মাধ্যমে সরকারি উদ্যোগ আবারও গ্রামীণ জলের ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ শুরু করেছে। এই কর্মসূচিকে অনেকেই অতীতের উন্নয়ন উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় দেখা হচ্ছে, কারণ ১৯৭০‑৮০ দশকে জিয়াউর রহমান ‑এর আমলে যে অধিক খাল খননের উদ্যোগ শুরু হয়েছিল, সেটির পুনরুদ্ধারের মতো মনে করছেন অনেকে। 

এ ক্ষেত্রেই বলা হচ্ছে বর্তমান খাল খনন কর্মসূচির উদ্বোধনের সঙ্গে ঐতিহাসিক “খালকাটা” উদ্যোগের সেতুবন্ধন তৈরি হচ্ছে।

২. জলাবদ্ধতা ও পানি ব্যবস্থাপনায় উন্নতি

বর্তমান কর্মসূচির মূল লক্ষ্যগুলোর মধ্যে আছে—

  • শহর ও গ্রামে বর্ষায় জমে থাকা পানি দ্রুত নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা

  • নদী, খাল ও জলাধারগুলোকে কার্যকর পানি চলাচলে সক্ষম করা

  • শহুরে ও গ্রামীণ অঞ্চলে বন্যা ও পানির স্তর বৃদ্ধির প্রভাবে হওয়া জটিলতা কমানো

এটা সামনে আনা হয়েছে পানি ব্যবস্থাপনা ও কৃষিজমির সেচ সুবিধা উন্নত করার জন্য। 

এ ধরনের কর্মসূচি বাস্তবায়িত হলে জলাবদ্ধতা কমে যেতে পারে, বিশেষ করে বর্ষায় রাস্তা, বাসা ও ক্ষেতের পানি দ্রুত নেমে যেতে পারে। এই কাজটি শহরে ও গ্রামে পানির সমস্যার ওপর সরাসরি ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।

৩. কৃষি উৎপাদন এবং সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন

সরকারি পরিকল্পনায় ১৮০ দিনের মধ্যে হাজার হাজার কিলোমিটার খাল খনন/পুনঃখনন করা হচ্ছে, যার মধ্যে আছে কৃষিজমিতে সেচ সুবিধা বাড়ানো। সেচ ব্যবস্থার উন্নতির ফলে—

  • শুষ্ক মৌসুমে পানি নিয়ে কৃষিকাজ সহজ হবে

  • এক বা দু’টি ফসল উৎপাদনের পরিবর্তে বহু ফসল সম্ভব হতে পারে

  • জমির জলসেচ এবং নিষ্কাশনের ভারসাম্য আরও ভালো হবে

এসব উদ্যোগ দরিদ্র কৃষকদের আয় বাড়াতে সাহায্য করবে এবং খাদ্য উৎপাদনের স্থিতিশীলতাও উন্নত করবে। 

৪. পরিবেশ‑সুরক্ষা ও টেকসই ব্যবস্থাপনা

খাল খননের সময় পরিবেশ সচেতন কাজগুলোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সরকারি বক্তব্যে বলা হয়েছে এই কর্মসূচি পরিবেশ‑সংরক্ষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। খাল ও জলাধারগুলো পুনরুদ্ধার করলে—

  • জলের স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরতে পারে

  • প্রাকৃতিক জলচক্রের ভারসাম্য ফিরে আসতে পারে

  • জলজ পরিবেশের ক্ষতির ঝুঁকি কমে যেতে পারে

এ ব্যাপারে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি বলেছেন, কর্মসূচির মাধ্যমে সরকারের দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হচ্ছে। 

৫. স্থানীয় কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রভাব

খাল খননের কাজে শ্রমিক নিয়োগ করা হচ্ছে, যা সাময়িক কর্মসংস্থান তৈরি করে। বিভিন্ন সরকারি কর্মসূচির মাধ্যমে যেমন কাজের বিনিময় খাদ্য , কাজের বিনিময়ে অর্থ এবং টিআর- রাজনীতি রিলিফ কার্যক্রমের আওতায় খাল খননের কাজের সঙ্গে স্থানীয় মানুষ যুক্ত হচ্ছে এবং সেখানে অর্থের প্রবাহ তৈরি হচ্ছে, যা গ্রামীণ অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক। 

বর্তমান খাল খনন কর্মসূচির লক্ষ্যগুলোর বিস্তারিত ব্যাখ্যা

১. বর্ষায় শহর ও গ্রামে জলাবদ্ধতা কমানো

বর্ষার সময় বাংলাদেশে শহর ও গ্রামে ব্যাপক জলাবদ্ধতার সমস্যা দেখা দেয়। খাল খনন ও পুনঃখননের মাধ্যমে—

  • নদী, খাল ও জলাধারগুলোর পানি দ্রুত নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে

  • শহরের রাস্তাঘাট, বাসা ও ব্যবসায়িক এলাকা বর্ষায় ডুবে না

  • গ্রামীণ অঞ্চলে জমির উপর অতিরিক্ত পানি জমে থাকাকে প্রতিরোধ করা হচ্ছে

ফলস্বরূপ, মানুষের জীবনযাত্রায় অচলতা কমে এবং ফসলের ক্ষতির ঝুঁকি কমে যায়। এছাড়াও, শহরের বন্যা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে, যা স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ঝুঁকিও হ্রাস করে।

২. কৃষিজমিতে উন্নত সেচব্যবস্থা নিশ্চিত করা

খাল খননের ফলে সেচের পানি সরাসরি কৃষিজমিতে পৌঁছায়, যা কৃষকদের জন্য এক বড় সুবিধা। এতে—

  • শুকনো মৌসুমে ফসল চাষ সম্ভব হচ্ছে

  • এক বা দু’টি ফসলের পরিবর্তে বহু ফসল উৎপাদন করা যায়

  • মাটির উর্বরতা ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পায়

  • কৃষকরা পানির অভাবে ফসল নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি কমাতে সক্ষম হয়

উন্নত সেচ ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য নিরাপত্তা এবং কৃষকের আয় বৃদ্ধিতেও সহায়ক।

৩. পরিবেশ‑সুরক্ষা ও প্রাকৃতিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা

খাল পুনঃখননের সময় পরিবেশের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

  • খাল ও নদীর পানি চলাচলের স্বাভাবিক প্রবাহ পুনঃস্থাপন করা হচ্ছে

  • জলজ প্রাণী ও মাছের আবাসস্থল পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে

  • বন্যা ও জলের স্তর বৃদ্ধি মোকাবেলায় প্রাকৃতিক ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা হচ্ছে

ফলে জলচক্রের ভারসাম্য বজায় থাকে, পরিবেশগত ক্ষতি কমে এবং টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত হয়।

৪. স্থানীয় অর্থনীতি ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করা

খাল খনন ও সংস্কার প্রকল্পগুলো শ্রমনির্ভর হওয়ায়—

  • গ্রামীণ দরিদ্র ও বেকার জনগণ সাময়িক কর্মসংস্থানের সুযোগ পায়

  • স্থানীয় অর্থনীতিতে নগদ প্রবাহ বৃদ্ধি পায়

  • কৃষি ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায় শ্রমিকদের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়

এইভাবে কর্মসূচি শুধু জল ব্যবস্থাপনা নয়, বরং সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নেও সহায়ক ভূমিকা রাখে।

সব মিলিয়ে, বর্তমান খাল খনন কর্মসূচি অতীতের “খালকাটা” উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় গ্রামীণ ও শহুরে জীবনের পানি ব্যবস্থাপনা, কৃষি উন্নয়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য একটি সমন্বিত উদ্যোগ হিসেবে কাজ করছে।

অতীতের বাস্তবমুখী উদ্যোগ, যেমন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এর খালকাটা কর্মসূচি, দীর্ঘদিন ধরে দেশের গ্রামীণ অর্থনীতি ও পানি ব্যবস্থাপনার ইতিহাসে একটি মাইলফলক হিসেবে রয়ে গেছে। বর্তমান সময়ে যখন সরকার পুনরায় খাল খনন ও পুনঃখননের উদ্যোগ নিচ্ছে, তখন দেখা যাচ্ছে যে সেই প্রাথমিক ভাবনা ও লক্ষ্যগুলো আধুনিক প্রযুক্তি ও পরিকল্পনার সঙ্গে মিলিয়ে আবারও বাস্তবায়িত হচ্ছে।

এ ক্ষেত্রে সাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক সালাউদ্দিন আকবর -এর কথাটিই যেন সত্য প্রমাণ—“স্বপ্ন যখন খসে পড়ে, তখন স্বপ্নবাজরাই তা তুলে ধরে।” অতীতের স্বপ্ন যখন দীর্ঘ সময়ের জন্য স্থবির হয়েছিল, বর্তমান প্রজন্মের উদ্যোগ জনাব, তারেক রহমান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী  এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের হাত ধরে তা নতুন উদ্যমে জীবন্ত হয়ে উঠেছে। খাল খননের আধুনিক উদ্যোগ, গ্রামীণ জলাবদ্ধতা কমানো, কৃষিজমিতে সেচ সুবিধা বৃদ্ধি এবং স্থানীয় কর্মসংস্থান তৈরি—সবই সেই স্বপ্নের পুনর্জীবন, যা একটি দেশের টেকসই উন্নয়নের পথে অনুপ্রেরণা যোগাচ্ছে।

 

উপসংহার 

প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান -এর খালকাটা কর্মসূচি ছিল একটি সময়োপযোগী ও বাস্তবমুখী উন্নয়ন উদ্যোগ, যা বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। যদিও এর কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল, তবুও এটি প্রমাণ করে—সঠিক পরিকল্পনা ও জনগণের অংশগ্রহণ থাকলে স্বল্প ব্যয়ে বড় পরিবর্তন সম্ভব।

এই কর্মসূচি আজও একটি উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়, বিশেষ করে স্থানীয় সম্পদ ও শ্রমশক্তিকে কাজে লাগিয়ে উন্নয়ন অর্জনের ক্ষেত্রে।

 

লেখক, কবি ও প্রাবন্ধিক 

ঢাকা ।

তথ্য সংগ্রহ :

 

Nessun commento trovato


News Card Generator