জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলার রামরামপুর সীমান্তে ১০৮২ নম্বর আন্তর্জাতিক পিলার সংলগ্ন শূন্যরেখায় দীর্ঘ ২৪ ঘণ্টা মানবেতর জীবন কাটানোর পর ষষ্ঠী চন্দ্র বর্মন নামের ৬৮ বছর বয়সী এক ব্যক্তিকে উদ্ধার করা হয়েছে। গত বুধবার সকালে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের বিরুদ্ধে তাকে জোরপূর্বক বাংলাদেশে পুশইনের অভিযোগ ওঠে, যা সীমান্ত এলাকায় চরম উত্তজনা ও নিরাপত্তার সংকট তৈরি করে। স্থানীয় বাসিন্দা ও সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কঠোর অবস্থানের মুখে বিএসএফের সেই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে ওই ব্যক্তি দীর্ঘ সময় শূন্যরেখায় আটকা পড়েন। অবশেষে বৃহস্পতিবার সকালে বকশীগঞ্জ থানা পুলিশ ও ৩৫ বিজিবির ধানুয়া-কামালপুর কোম্পানি যৌথভাবে তাকে উদ্ধার করে থানা হেফাজতে নিয়ে আসে এবং পরবর্তীতে আইনি প্রক্রিয়া শেষে তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে। এই ঘটনাটি আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইন ও মানবিক নীতিমালার চরম লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা সীমান্ত অঞ্চলের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
ভুক্তভোগী ষষ্ঠী চন্দ্র বর্মনের পারিবারিক সূত্র অনুযায়ী, তিনি প্রায় দুই মাস আগে রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার চান্দলাই গ্রাম থেকে রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়েছিলেন। দীর্ঘ সময় ধরে পরিবারের সদস্যরা তার কোনো সন্ধান না পেয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। উদ্ধার হওয়ার পর তার পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, কোনো ধরনের আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া হঠাৎ তাকে বিএসএফের মাধ্যমে সীমান্তে ঠেলে দেওয়া হয়, যা তার শারীরিক ও মানসিক অবস্থার চরম অবনতি ঘটিয়েছে। দীর্ঘ সময় শূন্যরেখায় অভুক্ত ও অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে থাকায় তিনি শারীরিকভাবে অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েছেন। ভুক্তভোগীর ছোট ভাই ভবানী চন্দ্র বর্মন অভিযোগ করেন, নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে যে পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে তাকে যেতে হয়েছে, তা অমানবিক। সীমান্ত এলাকায় বিএসএফের এ ধরনের একতরফা পদক্ষেপ সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
উদ্ধার পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া ও হস্তান্তর অনুষ্ঠানে উপস্থিত বকশীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মকবুল হোসেন ও ৩৫ বিজিবির ধানুয়া-কামালপুর কোম্পানি কমান্ডার বিল্লাল হোসেন জানিয়েছেন, ঘটনার পরপরই বিজিবি ও পুলিশ প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে ছিল। বিএসএফের অবৈধ পুশইন প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে বিজিবি তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ জানায়, যার ফলে বড় ধরনের কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ছাড়াই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে। বিজিবি ও পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, উদ্ধারকৃত ব্যক্তির পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পরই আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, প্রায়ই সীমান্ত দিয়ে এই ধরনের পুশইন প্রচেষ্টার ঘটনা ঘটে থাকে, যা বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যকার বিদ্যমান সম্পর্ক ও সীমান্ত চুক্তির পরিপন্থী। ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে সীমান্ত এলাকায় টহল আরও জোরদার করা এবং কূটনৈতিক পর্যায়ে আলোচনার মাধ্যমে সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
এই ঘটনাটি সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি বড় ধরনের সতর্কবার্তা বহন করছে। যদিও ষষ্ঠী চন্দ্র বর্মনকে অক্ষত অবস্থায় পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়েছে, তবে ভবিষ্যতে এ ধরনের কর্মকাণ্ড সীমান্ত অঞ্চলের জনজীবনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে পুশইন নিয়ে সৃষ্ট উত্তেজনা প্রায়ই সীমান্তবর্তী জনপদগুলোতে অস্থিরতা তৈরি করে, যা সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক যাতায়াত ও কৃষিকাজকে ব্যাহত করে। আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই ব্যক্তিকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিলেও তার নিখোঁজ হওয়ার রহস্য এবং কীভাবে তিনি বিএসএফের হেফাজতে পৌঁছালেন, তা নিয়ে তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে সীমান্ত এলাকায় নজরদারি বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও, কূটনৈতিক পর্যায়ে কার্যকর সমাধান ছাড়া এ ধরনের মানবিক সংকট নিরসন করা কঠিন হয়ে পড়বে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।