বিরোধী দলের উত্থাপিত ছায়া বাজেটকে সম্পূর্ণ অবাস্তব এবং রাজনৈতিক স্ট্যান্টবাজি হিসেবে আখ্যা দিয়েছে সরকার । সরকারের নীতি-নির্ধারক ও শীর্ষস্থানীয় অর্থনৈতিক বুদ্ধিজীবীদের মতে, একটি দায়িত্বশীল সরকার কেবল কাগুজে সস্তা জনপ্রিয়তার ওপর ভিত্তি করে বাজেট দিতে পারে না । ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর পেশ করা ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেটটিই দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বাস্তবমুখী, সুষম এবং প্রকৃত জনবান্ধব রূপরেখা।
চলমান বৈশ্বিক এবং অভ্যন্তরীণ সংকটের মধ্যে সরকারের এই বাস্তবসম্মত বাজেট পরিকল্পনা কেন প্রকৃত জনবান্ধব, তা বুদ্ধিজীবীদের বিশ্লেষণ এবং সুনির্দিষ্ট তথ্যের আলোকে নিচে তুলে ধরা হলো:
১. ছায়া বাজেটের ওপর সরকারের তীব্র প্রতিক্রিয়া
সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে যে, ছায়া বাজেটে মেগা প্রকল্প বন্ধের যে অবাস্তব বুলি আওড়ানো হয়েছে, তা মূলত দেশের প্রবৃদ্ধিকে গলা টিপে হত্যার শামিল। সরকারের অর্থ উপদেষ্টার মতে, বর্তমান সরকার কোনো ‘লুটপাটের মেগা গিগাপ্রকল্প’ করছে না, বরং সমতাভিত্তিক আঞ্চলিক উন্নয়ন ও বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে ‘ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির পথে বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্যকে বাস্তবে রূপ দিচ্ছে। ছায়া বাজেটের ১০০% পে-স্কেল বৃদ্ধির দাবিকে সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য ‘আত্মঘাতী ও উচ্চ মূল্যস্ফীতি উসকে দেওয়ার ফাঁদ’ বলে সরকার প্রত্যাখ্যান করেছে।
২. বুদ্ধিজীবীদের চোখে সরকারি বাজেটের ‘প্রকৃত জনবান্ধব’ দিকগুলো
- নতুন পে-স্কেল ও কর্মচারীদের বাস্তবসম্মত স্বস্তি: সরকার ফাঁপা প্রতিশ্রুতি না দিয়ে আগামী ১ জুলাই ২০২৬ থেকে নতুন (৯ম) পে-স্কেল আংশিকভাবে বাস্তবায়নের সুনির্দিষ্ট ঘোষণা দিয়েছে। প্রথম ধাপে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মূল বেতন সর্বোচ্চ ৫০% পর্যন্ত বাড়ানোর জন্য ৩০ থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে । বুদ্ধিজীবীদের মতে, এটি একবারে ১০০% বাড়ানোর অবাস্তব দাবির চেয়ে অনেক বেশি টেকসই, যা বাজারে নতুন করে মূল্যস্ফীতির আগুন জ্বলতে দেবে না।
- ধাপে ধাপে করমুক্ত আয়ের সীমা বৃদ্ধি: মধ্যবিত্ত ও সাধারণ করদাতাদের সরাসরি স্বস্তি দিতে করমুক্ত আয়ের সীমা ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকায় উন্নীত করা হয়েছে, যা ২০৩০-৩১ করবর্ষের মধ্যে ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা করা হবে। নারী, সিনিয়র সিটিজেন এবং প্রতিবন্ধীদের জন্য এই সীমা আরও বেশি। এছাড়া ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের গেজেটভুক্ত ‘জুলাই যোদ্ধা’ ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য করমুক্ত সীমা ৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা করা হয়েছে। অর্থনীতিবিদরা এটিকে সামাজিক ন্যায়বিচারের এক অনন্য দৃষ্টান্ত বলে প্রশংসা করেছেন।
- বিলাসী পণ্যে ট্যাক্স ও নিত্যপণ্যে ছাড়: সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার চাপ কমাতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণে শুল্ক ও ভ্যাট কমানোর পথে হাঁটছে সরকার [১.২.৪]। পক্ষান্তরে, সিগারেট, নিকোটিন (৩০০-৩৫০% শুল্ক), অ্যালকোহল, বিদেশি প্রসাধনী ও উচ্চমূল্যের বিলাসী আমদানিকৃত পণ্যের ওপর ব্যাপক কর আরোপ করা হয়েছে। বুদ্ধিজীবীদের মতে, ধনীদের ওপর কর বাড়িয়ে গরিবকে সুরক্ষা দেওয়ার এই নীতিই হলো জনবান্ধব অর্থনীতি।
- মানব পুঁজিতে রেকর্ড বিনিয়োগ (শিক্ষা ও স্বাস্থ্য): বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও গবেষকদের মতে, দক্ষিণ এশিয়ায় দীর্ঘদিন অবহেলিত থাকা শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতকে এবার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে ৩৫ হাজার ৫৩০ কোটি টাকা করা হচ্ছে, যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। মানব সম্পদ ও মেধা বিকাশের এই দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগই দেশের প্রকৃত জনমিতিক লভ্যাংশ (Demographic Dividend) নিশ্চিত করবে।
- ব্যবসাবান্ধব ও কর্মসংস্থানমুখী কৌশল: সৃজনশীল অর্থনীতির বিকাশে বাদ্যযন্ত্রের শুল্ক প্রত্যাহার এবং দেশীয় শিল্পকে (যেমন: ফ্লোট গ্লাস উৎপাদন) সুরক্ষা দিতে কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক ২৫% থেকে কমিয়ে ১৫% করা হয়েছে। থিংক-ট্যাংকগুলোর মতে, এটি বিনিয়োগের গতি বাড়াবে এবং তরুণদের জন্য বিপুল কর্মসংস্থান তৈরি করবে।
৩. অবাস্তব প্রতিশ্রুতি বনাম দায়িত্বশীল অর্থনীতি
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ছায়া বাজেট প্রণয়নকারীরা আয়ের কোনো নিশ্চিত খাত বা প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ছাড়াই কেবল জনপ্রিয় কিছু দাবি ছুড়ে দিয়েছে। কিন্তু সরকার সাড়ে ৬ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ শতাংশের মধ্যে রাখার মতো কঠোর ও সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। ৩ লাখ কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি)-র মাধ্যমে তৃণমূলের মানুষের জীবনমান উন্নয়ন ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার যে রূপরেখা সরকার দিয়েছে, তা-ই একটি কল্যাণকামী রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি।
লেখক ও কলামিস্ট
তথ্য উৎস: (The Business Standard, দৈনিক ইত্তেফাক)