- সালাউদ্দিন আকবর , ঢাকা
সরকারের বাজেট এবং বিরোধী দলের ছায়া বাজেটের মধ্যে মূল পার্থক্য হলো আইনি বাধ্যবাধকতা এবং প্রণয়নকারী কর্তৃপক্ষ। সরকার যেমন চলমান প্রকল্পের আয় ও রাজস্বের ওপর ভিত্তি করে বাজেট দেয়, বিরোধী দলও তেমনি সুনির্দিষ্ট কিছু প্রামাণ্য উৎসের ওপর ভিত্তি করেই ছায়া বাজেট তৈরি করে। এই কারণেই সম্প্রতি বিরোধীদলীয় উপনেতা একে একটি পূর্ণাঙ্গ 'জনবান্ধব বাজেট' বলে আখ্যা দিয়েছেন। এটি কোনো 'ভৌতিক' বা কাল্পনিক পরিকল্পনা নয়, বরং সরকারের সমান্তরাল একটি বিকল্প অর্থনৈতিক রূপরেখা।
নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:
১. 'দৃশ্যমান রাজস্ব' বনাম 'সম্ভাবনার অর্থনীতি' (করের বোঝা লাঘব ও পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধার)
সরকার চলমান ট্যাক্স, ভ্যাট এবং বৈদেশিক ঋণকে আয়ের মূল উৎস হিসেবে দেখায়। অন্যদিকে, বিরোধী দল বা ছায়া বাজেট প্রণেতারা রাজস্ব ফাঁকি রোধ, খেলাপি ঋণ উদ্ধার, অপচয় বন্ধ এবং দেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার মাধ্যমে যে বিশাল অর্থ সাশ্রয় হতে পারে, সেটিকে আয়ের প্রধান উৎস হিসেবে গণ্য করে। তারা দেখায় যে, বর্তমান কাঠামোর ভেতরেই দুর্নীতি কমালে সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত কর বা ভ্যাটের বোঝা না চাপিয়েও কত হাজার কোটি টাকা বাড়তি উদ্বৃত্ত রাখা সম্ভব, যা সাধারণ নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তের পকেটে সরাসরি স্বস্তি ফেরাবে।
২. 'আমলাতান্ত্রিক ফাইল' বনাম 'স্বতন্ত্র গবেষকদের থিংক-ট্যাংক'
সরকারি বাজেট তৈরি হয় বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও এনবিআর (NBR)-এর ফাইলের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে। আর ছায়া বাজেট তৈরি হয় দেশের শীর্ষস্থানীয় স্বাধীন অর্থনীতিবিদ, পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট এবং দলীয় থিংক-ট্যাংকের গবেষণার ওপর ভর করে। তারা দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির প্রকৃত তথ্য (যেমন: মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব) বিশ্লেষণ করে এই হিসাব দাঁড় করায় বলেই বিরোধীদলীয় উপনেতা একে গণমানুষের আকাঙ্ক্ষার প্রতিচ্ছবি বা 'জনবান্ধব' বলে অভিহিত করেছেন।
৩. সাধারণ মানুষের পকেটে স্বস্তি: চাকরিজীবী ও কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি
সরকারি ও বেসরকারি খাতের নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনযাত্রার মান বাড়াতে এই ছায়া বাজেটে একটি বড় ও যুগান্তকারী প্রস্তাব রাখা হয়েছে। মেগা প্রজেক্টের পেছনে অর্থ না উড়িয়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে প্রাধান্য দিয়ে ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য ১০০ শতাংশ এবং ১ম থেকে ৯ম গ্রেডের কর্মকর্তাদের জন্য ৮০ শতাংশ পর্যন্ত বেতন বা সুযোগ-সুবিধা বাস্তবায়নের জোরালো সুপারিশ করা হয়েছে।
৪. 'মানবিক পুঁজিতে বিনিয়োগ' বনাম 'ফাঁপা প্রবৃদ্ধি'
সরকার যেখানে বড় অবকাঠামো বা মেগা প্রজেক্টের দিকে বেশি টাকা বরাদ্দ দেয়, ছায়া বাজেট সেখানে স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং সামাজিক নিরাপত্তা খাতের মতো মানবিক পুঁজিতে বিনিয়োগের উৎস খোঁজে। প্রবৃদ্ধিকেন্দ্রিক ফাঁপা বুলি বাদ দিয়ে জনগণের মৌলিক চাহিদাগুলোকে প্রাধান্য দিয়ে সুনির্দিষ্ট এই বরাদ্দগুলো রাখা হয়েছে:
- সম্পূর্ণ বিনামূল্যে মাতৃত্বকালীন চিকিৎসাসেবা: গর্ভবতী মা ও নবজাতকের সুরক্ষায় সন্তান সম্ভাবনার শুরু থেকে সকল মায়ের জন্য প্রথম দুই বছর সম্পূর্ণ বিনামূল্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণ।
- শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাত: ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মেধা বিকাশে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১ লাখ ২৫ হাজার ৫৭৫ কোটি টাকা বরাদ্দ।
- সামাজিক নিরাপত্তা ও কল্যাণ: গরিব, দুস্থ ও পিছিয়ে পড়া মানুষের জীবনমান উন্নয়নে সরাসরি ভাতার আওতায় ৪৮ হাজার ১৫০ কোটি টাকা।
- জনস্বাস্থ্য: সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে স্বাস্থ্য খাতে ৪৫-২৪০ কোটি টাকা (অথবা ৪৫,২৪০ কোটি টাকা) বরাদ্দের প্রস্তাব।
- কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা: প্রান্তিক কৃষক ও উৎপাদন সচল রেখে নিত্যপ্রয়োজনীয় চাল, ডাল ও পণ্যের বাজারমূল্য সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখতে কৃষি খাতে ৫১ হাজার ৬৭০ কোটি টাকা।
৫. এটা কি 'ভৌতিক'? নাকি 'ভবিষ্যতের দর্পণ'?
ছায়া বাজেটকে 'ভৌতিক' বলার কোনো সুযোগ নেই। কারণ এটি মূলত একটি পলিসি পেপার বা নীতিগত দলিল। এর উদ্দেশ্য টাকা খরচ করা নয়, বরং সরকারকে এটি দেখানো যে—একই পরিমাণ সম্পদ দিয়ে সুশাসন, জবাবদিহিতা ও ন্যায়ভিত্তিক সম্পদ বণ্টনের মাধ্যমে আরও স্বচ্ছ ও জনকল্যাণমূলক উপায়ে দেশ চালানো সম্ভব। এটি মূলত বিরোধী দলের রাষ্ট্র পরিচালনার যোগ্যতার একটি আগাম মহড়া, যা তাদের দৃষ্টিতে একটি প্রকৃত জনবান্ধব অর্থনৈতিক কাঠামোর প্রতিচ্ছবি।
কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।