জাতীয় সংসদ এখন যেন এক ‘ইসলামী ব্যাংক ময়দান’। বিগত সংসদ নির্বাচনে ইসলামী ব্যাংকের পল্লী উন্নয়ন প্রকল্প (আরডিএস) থেকে নির্দিষ্ট দলের পক্ষে ১১ হাজার কোটি টাকা ছড়ানোর যে বিস্ফোরক অভিযোগ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ তুলেছেন, তার জবাবে রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে তীব্র বাকযুদ্ধ। সরকারের এই চাঞ্চল্যকর দাবির বিপরীতে সম্পূর্ণ ভিন্ন সুর ও পাল্টা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। গতকালের পুরো সংসদ অধিবেশন যেন এই এক ইসলামী ব্যাংক ইস্যুতেই সরগরম ছিল।
১১ হাজার কোটির নির্বাচনী সমীকরণ ও ‘বেহেশতের’ প্রলোভন
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইসলামী ব্যাংকের আরডিএস প্রকল্পের আওতায় গত নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মোট ২২ হাজার কোটি টাকা বিতরণ করা হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে রহস্যজনক লেনদেনটি ঘটে ৫ আগস্টের পরবর্তী সময়ে, যখন নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার জন্য বিতরণ করা হয় প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা।
এই অর্থ বিতরণের ক্ষেত্রে এক অভিনব ও মনস্তাত্ত্বিক কৌশল ব্যবহারের অভিযোগ এনে মন্ত্রী বলেন, গ্রামীণ অঞ্চলের সাধারণ নারী ভোটারদের টার্গেট করে জনপ্রতি ১০ হাজার টাকা করে বিতরণ করা হয়েছিল। অর্থ বিতরণের পাশাপাশি ভোটারদের ধর্মীয় অনুভূতিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে তৃণমূলের নারীদের সরাসরি বলা হয়েছিল— 'কুরআনের দল' কিংবা নির্দিষ্ট প্রতীক ‘দাঁড়িপাল্লা’ মার্কায় ভোট না দিলে তারা বেহেশতে যেতে পারবেন না।
‘প্রমাণ দেখান, মেডেল দেব’: আমীরের প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্যের পর তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমীর। সরকারের এই অভিযোগকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত দাবি করে তিনি বলেন, “ইসলামী ব্যাংক থেকে নির্বাচনের উদ্দেশ্যে কোনো টাকা নির্দিষ্ট কোনো দলকে দেওয়া হয়েছে—এ কথার যদি কোনো আনুষ্ঠানিক বা দালিলিক প্রমাণ সরকার দেখাতে পারে, তবে আমি উনাকে (স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে) মেডেল দেব।”
একই সঙ্গে ব্যাংকের কোটি কোটি গ্রাহকের আস্থা ও আমানত রক্ষার প্রশ্নে দৃঢ় অবস্থান নিয়ে আমীর ঘোষণা করেন, “এই ব্যাংকের সাধারণ মানুষের আমানত ও মর্যাদা রক্ষার্থে যেকোনো ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সর্বপ্রথম আমি নিজের বুক পেতে দেব।” জামায়াত নেতৃত্বের দাবি, ব্যাংকটিকে রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত করে এর গ্রাহক ভিত্তি ধসিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
‘পাচারকৃত টাকা না এনে লুটপাটের আয়োজন’: নায়েবে আমীরের ক্ষোভ
সংসদে হওয়া এই আলোচনাকে সরকারের ব্যর্থতা আড়ালের চেষ্টা হিসেবে দেখছেন দলের নায়েবে আমীর ডা. আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের। তিনি বর্তমান সরকারের অর্থনৈতিক নীতি ও সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, “বিগত বছরগুলোতে দেশ থেকে যে লাখো কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়ে গেছে, এই সরকার তা উদ্ধার করার কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে পারছে না। উল্টো, দেশের সফল আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে মিথ্যা অভিযোগে অভিযুক্ত করে নতুন করে লুটে নেওয়ার বন্দোবস্ত করা হচ্ছে।”
মালিকানা বিতর্ক ও জনমনে প্রশ্ন
যদিও ব্যাংক কর্তৃপক্ষের দাবি— এই প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে জামায়াতে ইসলামী বা নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর মালিকানাধীন নয়, বরং এটি একটি পেশাদার ব্যাংকিং নিয়মে পরিচালিত হচ্ছে। তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বিস্ফোরক বক্তব্য এবং তার বিপরীতে জামায়াতের তীব্র প্রতিবাদের পর ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ আর্থিক শৃঙ্খলা এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থাকার দাবি বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সংসদ যেভাবে ‘ইসলামী ব্যাংক বিতর্কে’ সরগরম হয়ে উঠেছে, তাতে সাধারণ আমানতকারীদের মধ্যে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক উদ্বেগ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। রাজনৈতিক কাদা ছোড়াছুড়ির ঊর্ধ্বে উঠে দেশের সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতের তারল্য ও পেশাদারিত্ব বজায় রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।