স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) বরগুনা কার্যালয়ের প্রায় ৮৫ কোটি টাকার সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের টেন্ডার কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে অপপ্রচার, বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো এবং এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্ল্যাকমেইলিংয়ের অভিযোগ উঠেছে এক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধির বিরুদ্ধে!
ওপেন টেন্ডারিং মেথড (ওটিএম) ও ই-জিপি পদ্ধতিতে অনুষ্ঠিত এ টেন্ডারে বরগুনাসহ দেশের বিভিন্ন জেলার শতাধিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। সরকারি ক্রয় বিধিমালা-২০২৫ অনুসরণ করে কারিগরি ও আর্থিক মূল্যায়ন শেষে সর্বনিম্ন দরদাতাদের কার্যাদেশ দেওয়া হয়।
তবে টেন্ডার কার্যক্রম শেষ হওয়ার পর আমতলী ও তালতলী উপজেলার প্রায় ২৭ কোটি টাকা মূল্যের চারটি টেন্ডার নিয়ে অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ তুলে এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলীসহ বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দেন তালতলীর বাসিন্দা ওমর আব্দুল্লাহ শাহীন। তিনি নিজেকে প্রয়াত বিএনপি মহাসচিব খন্দকার দেলোয়ার হোসেনের সাবেক সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) এবং বরগুনা জেলা বিএনপির সাবেক সদস্য হিসেবে পরিচয় দিয়ে থাকেন। এছাড়াও তিনি নিজেকে বিএনপি নেতা হিসেবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শুরু করে সব জায়গায় পরিচয় দেন। নিজের সোশ্যাল মিডিয়া একাউন্টগুলোতে নেটিজেনদের বিদ্রূপ কমেন্ট আসছে যে তিনি মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন হতে পারেন!
শাহিনের অভিযোগে বলা হয়, এলজিইডি বরগুনার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মেহেদী হাসান খান, জ্যেষ্ঠ সহকারী প্রকৌশলী শ্যামল কুমার গাইন ও সহকারী প্রকৌশলী রাজিব শাহ রাজনৈতিক প্রভাব ও ব্যক্তিগত সম্পর্কের মাধ্যমে নির্দিষ্ট কিছু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিয়েছেন। কাজ পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এম এ লুৎফুল কবির ট্রেডার্স, এমএস নুর কনস্ট্রাকশন, লেলিন-দীপ (জয়েন্ট ভেঞ্চার) এবং নিশিত বসু ট্রেডার্সের নাম উল্লেখ করা হয়।
তবে এলজিইডি সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, অভিযোগের পর বিষয়টি কেন্দ্রীয়ভাবে পুনঃযাচাই করা হয়। বরগুনা জেলা কার্যালয় থেকে সংশ্লিষ্ট চারটি টেন্ডারের নথি এলজিইডির কেন্দ্রীয় প্রকিউরমেন্ট বিভাগে পাঠানো হলে সেখানে পুনর্মূল্যায়ন শেষে কোনো ধরনের দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি বা বিধিমালা লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে যোগ্য বিবেচিত প্রতিষ্ঠানগুলোর অনুকূলে কার্যাদেশ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, অভিযোগকারী ওমর আব্দুল্লাহ শাহীন নিজেও ওই টেন্ডার কার্যক্রমে অংশ নিয়েছিলেন। তার নিয়ন্ত্রণাধীন “শাহরিস ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন” নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিতে বিভিন্ন পর্যায়ে তদবিরের অভিযোগও রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, টেন্ডার শুরুর আগেই তিনি নির্বাহী প্রকৌশলীর সঙ্গে যোগাযোগ করে নিজের পছন্দের প্রতিষ্ঠানের বাইরে অন্য কাউকে কাজ না দেওয়ার জন্য বারবার অনুরোধ জানান।
আমাদের হাতে আসা কয়েকটি স্ক্রিনশট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, টেন্ডারে কাজ না পাওয়ার পর থেকেই তিনি বিভিন্ন ফেসবুক পোস্ট ও লাইভে এলজিইডি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অপতথ্য প্রচার শুরু করেন। অভিযোগ রয়েছে, “এআই” প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি করা বিভ্রান্তিকর ছবি ও কনটেন্টের মাধ্যমে কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আর্থিক লেনদেন ও দুর্নীতির অভিযোগ ছড়ানো হয়!
এলজিইডির একাধিক কর্মকর্তা জানান, ই-জিপি সিস্টেম ও সরকারি ক্রয় নীতিমালা অনুযায়ী অভিযোগকারীর প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স, অভিজ্ঞতা ও কারিগরি সক্ষমতায় ঘাটতি থাকায় প্রতিষ্ঠানটি কার্যাদেশ পায়নি। এরপর থেকেই তিনি বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা শুরু করেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ওমর আব্দুল্লাহ শাহীন বলেন, “গত ১৭ বছর আমাদের দলের নেতাকর্মীরা অনেক মামলা-হামলার শিকার হয়েছেন। তাদের মামলা পরিচালনা ও সহযোগিতার জন্য আমি নির্বাহী প্রকৌশলীর কাছে কাজগুলো চেয়েছিলাম।”
একই টেন্ডারে অংশ নেওয়া ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এম এ লুৎফুল কবির ট্রেডার্সের প্রতিনিধি মো. সিরাজ বলেন, “আমরা নিয়ম মেনেই টেন্ডারে অংশ নিয়েছি। কারিগরি ও আর্থিক মূল্যায়নে যোগ্য বিবেচিত হওয়ায় কাজ পেয়েছি। এখানে কোনো ধরনের অনিয়ম বা প্রভাবের সুযোগ নেই।”
আল-মামুন এন্টারপ্রাইজের প্রতিনিধি মো. রাজন বলেন, “আমরাও একই টেন্ডারে অংশ নিয়েছিলাম। প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ায় কাজ পাইনি! এখন ই-জিপিতে সম্পন্ন হওয়া টেন্ডার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলা হাস্যকর। এখানে অনিয়মের সুযোগ নেই।”