২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানকে শুধু একটি সরকার পরিবর্তনের ঘটনা হিসেবে দেখলে ভুল হবে; এটি ছিল রাষ্ট্রের চরিত্র পরিবর্তনের দাবি থেকে উঠে আসা এক প্রজন্মের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ।
তরুণরা মূলত একটি কর্তৃত্ববাদী ও এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল, যেখানে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, মতপ্রকাশের সংকোচন এবং রাজনৈতিক বহুত্ববাদের সংকট স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। এই প্রেক্ষাপটে তাদের আন্দোলন ছিল এক ধরনের গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের দাবি।
হাসিনা সরকারের পতন এবং তার দেশত্যাগ এই আন্দোলনের একটি দৃশ্যমান সাফল্য হলেও, রাষ্ট্রব্যবস্থা পরিবর্তন একটি দীর্ঘমেয়াদি ও জটিল প্রক্রিয়া। রাজনৈতিক তত্ত্বের ভাষায়, এটি রেজিম চেঞ্জ” থেকে “সিস্টেমিক ট্রান্সফরমেশন”-এ রূপান্তরের পথ-যা কখনোই তাৎক্ষণিকভাবে সম্পন্ন হয় না।
একটি শাসকগোষ্ঠী অপসারণ করা তুলনামূলকভাবে সহজ, কিন্তু প্রশাসনিক কাঠামো, রাজনৈতিক সংস্কৃতি, বিচারব্যবস্থা এবং ক্ষমতার ভারসাম্য পুনর্গঠন করা সময়সাপেক্ষ।
তরুণদের মধ্যে যে হতাশা দেখা যাচ্ছে, সেটি রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে তাদের প্রত্যাশার সংঘাত থেকে উদ্ভূত। বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে এমন ‘ডিসইলিউশনমেন্ট’ প্রায়ই দেখা যায়।
কারণ আন্দোলনের সময় যে আদর্শিক ঐক্য গড়ে ওঠে, ক্ষমতা পুনর্বিন্যাসের সময়ে তা ভেঙে গিয়ে নানা স্বার্থ, মতপার্থক্য এবং বাস্তব সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হয়।
তবে এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-রাজনৈতিক পরিবর্তন একটি প্রক্রিয়া, কোনো একক ঘটনা নয়। এই প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ, চাপ সৃষ্টি, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার কাজ অব্যাহত রাখতে হয়। একইসঙ্গে সংগঠনভিত্তিক রাজনীতিতে শৃঙ্খলা ও ঐক্যের প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কর্মীদের সংগঠনের প্রতি আস্থা রাখা, দলীয় সিদ্ধান্ত মান্য করা এবং উর্ধ্বতন নেতৃত্বের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা একজন দায়িত্বশীল কর্মীর মৌলিক কর্তব্য। কারণ সুসংগঠিত কাঠামো ছাড়া কোনো আন্দোলনের অর্জন টেকসই হয় না।
সুতরাং, বর্তমান বাস্তবতায় হতাশ না হয়ে এটিকে একটি রূপান্তরকাল হিসেবে দেখা প্রয়োজন। সময়, সংগঠন, শৃঙ্খলা এবং ধারাবাহিক রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার মাধ্যমেই কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন বাস্তবায়িত হতে পারে। এখানেই তরুণদের ভূমিকা শেষ নয়; বরং এখান থেকেই তাদের রাজনৈতিক পরিপক্বতার প্রকৃত পরীক্ষা শুরু।