বরিশাল-১ (গৌরনদী-আগৈলঝাড়া) আসনে এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক দৃশ্যের সৃষ্টি হয়েছে। যেখানে বাবা জামায়াতে ইসলামীর ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীকের মনোনীত প্রার্থী, সেখানেই তার বড় ছেলে প্রকাশ্য জনসভায় বিএনপি মনোনীত ‘ধানের শীষ’ প্রতীকের পক্ষে ভোট চেয়েছেন। জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে গৌরনদীতে বিএনপির জনসভায় জামায়াত প্রার্থীর ছেলের এই অবস্থান পুরো নির্বাচনি এলাকায় তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। বাবা-ছেলের এই প্রকাশ্য রাজনৈতিক মতবিরোধ এবং তাদের ফেসবুক স্ট্যাটাস নিয়ে এখন আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বইছে।
জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে গত ৭ নভেম্বর সরকারি গৌরনদী পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে বিএনপির একটি জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। এই সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব (আন্তর্জাতিক) হুমায়ুন কবির।
-
জামায়াতের প্রার্থী: এই আসনে জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী হলেন জেলা শূরা সদস্য মাওলানা হাফেজ কামরুল ইসলাম (দাঁড়িপাল্লা প্রতীক)।
-
ছেলের পরিচয়: বাবার রাজনৈতিক মতাদর্শের বিপরীত স্রোতে হেঁটেছেন তার বড় ছেলে আরাফাত বিল্লাহ খান, যিনি কেন্দ্রীয় যুবদলের সহ-শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক এবং সাবেক কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক।
-
ধানের শীষের পক্ষে ভোট: জনসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে আরাফাত বিল্লাহ খান সরাসরি বিএনপির প্রার্থী এম জহিরউদ্দিন স্বপনের পক্ষে ভোট চান। তিনি বলেন,
"অদক্ষ পাইলট দিয়ে যদি প্লেন চালানো হয়, তাহলে আপনারা সেই প্লেনের যাত্রী হবেন? জহির উদ্দিন স্বপন ভাই বিগত দুইবার এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। ভাই দক্ষ স্বপন ভাইকে আপনারা ধানের শীষে ভোট দিয়ে বিজয়ী করবেন।"
ছেলের এই বক্তব্যের পরপরই বাবা মাওলানা হাফেজ কামরুল ইসলাম এবং ছেলে আরাফাত বিল্লাহ খান উভয়েই তাদের ফেসবুক আইডি থেকে দুটি পরস্পরবিরোধী কিন্তু আবেগপূর্ণ স্ট্যাটাস দেন, যা এলাকায় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
জামায়াত প্রার্থী হাফেজ কামরুল ইসলাম নিজেকে ‘ব্যর্থ পিতা’ হিসেবে ঘোষণা করে পুত্রের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার কথা জানান। যদিও পরে তিনি এই সংবাদকে মিথ্যা বলে দাবি করেন, কিন্তু তার ফেসবুকের স্ট্যাটাসটি ছিল নিম্নরূপ:
"আমার বড় ছেলে আরাফাতকে শিবির করার জন্য অনেক বুঝিয়েছি অনেক চাপ সৃষ্টি করেছি আমি ব্যর্থ হয়েছি। তাকে দিয়ে শিবির করাতে পারিনি। আমি একজন ব্যর্থ পিতা। আমার বড় ছেলের সঙ্গে আমি সম্পর্ক ছিন্ন করলাম জামায়াতে ইসলামীর নমিনির বিরুদ্ধে বক্তব্য দেওয়ার জন্য।"
পিতার স্ট্যাটাসের জবাবে কেন্দ্রীয় যুবদল নেতা আরাফাত বিল্লাহ খান ‘বাবা দিবস’ উপলক্ষে একটি স্মৃতিচারণমূলক ও আবেগঘন স্ট্যাটাস দেন। তার স্ট্যাটাসটি ছিল রাজনৈতিক মতভেদ ছাপিয়ে পিতার প্রতি সন্তানের গভীর ভালোবাসা প্রকাশ:
"ছবিটি আমার জীবনের একটি ইতিহাস হয়ে থাকবে। আমার বাবা ও আমি এক মাসের ব্যবধানে রাজনৈতিক মামলায় বরিশাল কারাগারে বন্দি ছিলাম।... একবার এক হাজিরার দিন পকেটের অবস্থা এমন খারাপ যে বরিশাল শহর থেকে যে গৌরনদী যাব সে টাকাও নেই। হঠাৎ করে কোর্ট চত্বরে আব্বুর সঙ্গে দেখা।... হ্যান্ডশেক করলাম তখন দেখি হাতের মুঠোয় এক হাজার টাকা। সেই টাকাটা শুধু আমার বিপদ উত্তরণ করেনি বরং বুঝিয়ে দিয়েছে যে বাবাদের টেলিপ্যাথি এতটাই প্রকট যে সন্তানের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অপ্রকাশিত মনবাসনাও বাবাদের রাডারে ধরা পড়ে। ভালো থাকুন পৃথিবীর সকল বাবা, বটবৃক্ষ হয়ে থাকুন সকল সন্তানের জন্য। শুভ বাবা দিবস।"
গণমাধ্যমে পুত্রকে ত্যাজ্যপুত্র করার সংবাদ প্রকাশিত হলে জামায়াত মনোনীত প্রার্থী মাওলানা হাফেজ কামরুল ইসলাম পরে যুগান্তরকে একটি আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেন।
-
সংবাদকে মিথ্যা দাবি: তিনি পুত্রকে ত্যাজ্যপুত্র করার সংবাদকে সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দেন এবং তীব্র নিন্দা জানান।
-
গণতান্ত্রিক অধিকারের স্বীকৃতি: তিনি বলেন, "গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রত্যেক মানুষের বাকস্বাধীনতা ও রাজনীতি করার অধিকার রয়েছে।" তিনি উল্লেখ করেন যে, দেশে অনেক পরিবারেই পিতা-পুত্র ও ভাই-বোনেরা ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত।
-
নির্বাচনি প্রস্তুতি: তিনি নিশ্চিত করেন যে, তার ছেলে বিএনপির কেন্দ্রীয় রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকলেও, তিনি নিজে জামায়াতের নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে নির্বাচনি মাঠে সক্রিয়ভাবে কাজ করছেন এবং এই আসনে জামায়াতের ৭০ হাজারেরও বেশি নেতাকর্মী রয়েছে।
বরিশাল-১ আসনের এই ঘটনাটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে পারিবারিক ও আদর্শিক সংঘাতের একটি বিরল উদাহরণ।
-
ঐতিহাসিক জোটের প্রতিফলন: যদিও বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক জোটের সম্পর্ক ছিল, কিন্তু আদর্শিক দূরত্ব এবং সাংগঠনিক ভিন্নতা এই ঘটনায় স্পষ্ট। আরাফাত বিল্লাহ খান হয়তো যুবদলের রাজনীতিতে যুক্ত থাকার কারণে জোটের বৃহত্তর স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে ধানের শীষের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
-
নতুন প্রজন্মের ভিন্ন পথ: এই ঘটনায় দেখা যায় যে, নতুন প্রজন্ম রাজনীতিতে পরিবার প্রধানের চাপ সত্ত্বেও নিজস্ব রাজনৈতিক পথ বেছে নিতে দ্বিধা করছে না, যা বাংলাদেশের বহুধা বিভক্ত রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে প্রতিফলিত করে।
-
রাজনৈতিক পরিপক্কতা: পুত্রের আবেগঘন স্ট্যাটাসটি দেখায় যে, রাজনৈতিক মতপার্থক্য যতই তীব্র হোক, পারিবারিক বন্ধন ও পিতার প্রতি ভালোবাসা অটুট। অন্যদিকে, প্রার্থীর শেষ বিবৃতিটি কৌশলগতভাবে ‘গণতান্ত্রিক অধিকার’ এবং ‘মিথ্যা সংবাদ’-এর নিন্দা করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছে।
এই বিতর্ক বরিশাল-১ আসনে নির্বাচনী হাওয়াকে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে এবং ভোটের মাঠে বাবা-পুত্রের এই টানাপোড়েন ভোটারদের সিদ্ধান্তে কেমন প্রভাব ফেলে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।