গোপালগঞ্জের সংঘাত: এনসিপি ও আওয়ামী লীগ কর্মীরা উভয়ই দায়ী; ‘মুজিববাদ মুর্দাবাদ’ স্লোগান উসকে দেয় পরিস্থিতি.. | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

গোপালগঞ্জের সংঘাত: এনসিপি ও আওয়ামী লীগ কর্মীরা উভয়ই দায়ী; ‘মুজিববাদ মুর্দাবাদ’ স্লোগান উসকে দেয় পরিস্থিতি..

আই নিউজ বিডি ডেস্ক  avatar   
আই নিউজ বিডি ডেস্ক
গোপালগঞ্জের সংঘাত: এনসিপি ও আওয়ামী লীগ কর্মীরা উভয়ই দায়ী; ‘মুজিববাদ মুর্দাবাদ’ স্লোগান উসকে দেয় পরিস্থিতি..
গোপালগঞ্জের সংঘাত: এনসিপি ও আওয়ামী লীগ কর্মীরা উভয়ই দায়ী; ‘মুজিববাদ মুর্দাবাদ’ স্লোগান উসকে দেয় পরিস্থিতি..
ছবি: সংগৃহীত
তদন্ত কমিশনের সদস্য সাজ্জাদ সিদ্দিকী বলেন, "এই যে নাম পরিবর্তন করাটা মনে হয়েছে গোপালগঞ্জবাসীর ভুল বোঝাবুঝি-উসকানি হিসেবে কাজ করেছে।"..

গত ১৬ জুলাই গোপালগঞ্জে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সমাবেশ ঘিরে যে ব্যাপক সংঘর্ষ ও পাঁচজনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছিল, তার জন্য এনসিপি এবং আওয়ামী লীগের স্থানীয় কর্মী ও সমর্থক—উভয় পক্ষই দায়ী। সরকার গঠিত বিচার বিভাগীয় তদন্তে এমন তথ্যই উঠে এসেছে। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুই পক্ষের অনড় অবস্থান, গুজব ও উসকানি এবং মাঠের বাস্তবতার সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্যের সমন্বয়ের অভাবই পরিস্থিতিকে অনিবার্য সংঘাতে ঠেলে দিয়েছিল।

সাবেক বিচারপতিকে প্রধান করে গঠিত ছয় সদস্যের তদন্ত কমিশন গত সেপ্টেম্বরের শেষে তাদের প্রতিবেদন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছে। যদিও প্রতিবেদনটি এখনো জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি, তবে কমিশনের সদস্য এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সাজ্জাদ সিদ্দিকী বিবিসি বাংলাকে এই অনুসন্ধানের মূল তথ্যগুলো জানিয়েছেন।

১. এনসিপি’র কৌশলগত ভুল: ‘মার্চ টু গোপালগঞ্জ’

সংঘর্ষের প্রাথমিক কারণ হিসেবে এনসিপি’র কৌশলগত ভুল এবং তাদের বক্তব্যের নেতিবাচক প্রভাবকে চিহ্নিত করা হয়েছে।

  • নাম পরিবর্তন: প্রাথমিকভাবে এনসিপির ‘সারা দেশে সমাবেশ’ কর্মসূচি গোপালগঞ্জে এসে যখন ‘মার্চ টু গোপালগঞ্জ’ নামে পরিবর্তিত হয়, তখন থেকেই সংকট বাড়ে।

তদন্ত কমিশনের সদস্য সাজ্জাদ সিদ্দিকী বলেন, "এই যে নাম পরিবর্তন করাটা মনে হয়েছে গোপালগঞ্জবাসীর ভুল বোঝাবুঝি-উসকানি হিসেবে কাজ করেছে।"

  • উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হামলা: কর্মসূচিকে প্রতিহত করার চেষ্টা হিসেবেই সমাবেশের আগের দিন ও ওইদিন সকালে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের গাড়ি ও ওসির গাড়িতে হামলা এবং ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।

২. আওয়ামী লীগ সমর্থক ও ‘ট্রাইবালিজম’-এর অনড়তা

অন্যদিকে, গোপালগঞ্জের স্থানীয়দের বিশেষ মানসিকতা এবং আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকদের পরিবর্তিত বাস্তবতা মেনে নিতে না পারা পরিস্থিতিকে আরও অলঙ্ঘনীয় করে তোলে।

  • ট্রাইবালিজম: সাজ্জাদ সিদ্দিকী বলেন, "গোপালগঞ্জবাসীর বিশেষ এক ধরনের ট্রাইবালিজম এবং আওয়ামী লীগ কর্মী-সমর্থকদের পাঁচ আগস্ট পরবর্তী সারা দেশের পরিবর্তিত বাস্তবতা মেনে না নেওয়া—এই দুটো বিষয় আসলে কনফ্লিক্টটাকে কিংবা এই যে কার্নেজ যেটা হলো, এটাকে একেবারে ইনএভিটেবল (অলঙ্ঘনীয়) করে তুলেছিল।"

  • ‘আমরা করবই, করতে দেব না’: একপক্ষ (এনসিপি) সমাবেশ ‘করবেই’ এবং অন্যপক্ষ (আওয়ামী লীগ কর্মী-সমর্থক) তা ‘করতে দেবে না’—এই দুই পক্ষের বিপরীতমুখী অনড়তাই সংঘাতের পথ তৈরি করে।

সংঘাতকে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যেতে দুটি বিষয় অনুঘটকের কাজ করে:

১. শেখ মুজিবের সমাধি ভাঙার গুজব

গোপালগঞ্জে যাওয়ার আগেই স্থানীয় এলাকাবাসীর মধ্যে গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, এনসিপির নেতৃত্বে শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধি ভাঙা হতে পারে। এই গুজব স্থানীয়দেরকে বিক্ষুব্ধ করে তোলে।

২. ‘মুজিববাদ মুর্দাবাদ’ স্লোগান

এনসিপির সমাবেশের শেষ পর্যায়ে ‘মুজিববাদ মুর্দাবাদ’ স্লোগানটি স্থানীয় বাসিন্দাদের ভুল বোঝা এবং অজ্ঞতাকে উসকে দেয়।

কমিশনের সদস্য সাজ্জাদ সিদ্দিকী বলেন, "বিফোর এন্ডিং দ্যা প্রোগ্রাম, যেটা ছিল ‘মুজিববাদ মুর্দাবাদ’, এই মুজিববাদ মুর্দাবাদ ডিক্টাম একাডেমিকভাবে আমরা যেভাবে রিড করি, গ্রাম ও মফস্বলের সাধারণ মানুষ কিন্তু সেভাবে রিড করে নাই।"

সাধারণ মানুষের কাছে এই স্লোগানের ব্যাখ্যা এমনভাবে পৌঁছায় যে, তারা হয়তো শেখ মুজিবের মাজারে আক্রমণ করতে যাচ্ছে। এই ভুল ধারণার প্রেক্ষিতে মসজিদে ঘোষণা করে গণজমায়েত করা হয় এবং এনসিপি নেতাকর্মীদের উপর আক্রমণ করা হয়। কমিশনের মতে, এই সংঘাত ছিল উভয় পক্ষের দোষে ‘অবশ্যম্ভাবী’।

তদন্ত কমিশন এই সংঘাতের নেপথ্যে স্থানীয় প্রশাসন, আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং গোয়েন্দা সংস্থাসহ রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যোগাযোগ ও সমন্বয়ের ঘাটতি খুঁজে পেয়েছে। মাঠের পরিস্থিতি অনুযায়ী যথাসময়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সিদ্ধান্তহীনতা এই সংঘাতের অনিবার্য পরিণতি ছিল।

  • রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা: কমিশন নির্ভরযোগ্য গণমাধ্যম, ছবি ও ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখেছে যে, সংঘাতের সময় যাদের অ্যাকশনে আসতে দেখা গেছে, তাদের বেশিরভাগেরই রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। দলীয় লোকজনের নেতৃত্বেই স্থানীয় লোকজন সমবেত হয়ে এনসিপি নেতাকর্মীদের ওপর আক্রমণ করে।

গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, কমিশন গুলির ঘটনাটি তদন্ত করেনি। গুলিবিদ্ধ হয়ে যে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে, কার গুলিতে তাদের মৃত্যু হয়েছে, সেই বিষয়টি তদন্ত কমিশনের টিওআর (কার্যপরিধি)-এর মধ্যে ছিল না।

কমিশন তাদের তদন্ত প্রতিবেদনে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা এড়াতে ৮-১০টি সুনির্দিষ্ট সুপারিশ এবং পাঁচটি করণীয় তুলে ধরেছে। যদিও সরকার এখনও প্রতিবেদনটি জনসমক্ষে প্রকাশ করেনি, তবে এই সুপারিশগুলো জাতীয় ঐক্যের স্বার্থে সংঘাত মোকাবিলার নতুন পথ তৈরি করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator